বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা রক্ষার নামে বেত দিয়ে আঘাত বা শারীরিক ও মানসিক শাস্তির চর্চা পুরনো সমস্যা। সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার ধরন, মনস্তত্ত্ব এবং মানবাধিকারের ধারণা বদলেছে। কিন্তু এই ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ নির্মূল হয়নি। এতে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য- জ্ঞানার্জন, মানবিকতা ও সৃজনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে।
সরকারিভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধরনের শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ। কিন্তু কিছু মাদরাসা ও স্কুলে এখনো বেত দিয়ে আঘাত করা হয়। পড়া না পারা, দেরি করে আসা বা সামান্য শৃঙ্খলা ভাঙার মতো কারণে শিক্ষার্থীদের কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হয়। কখনো কখনো এই শাস্তি মানবিকতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। এতে অনেক শিশুর আত্মহত্যা বা নিহত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
বেত দিয়ে আঘাত করলে শিক্ষার্থীদের শরীরে আঘাত লাগে, তার চেয়েও বেশি আঘাত লাগে মনে। অপমান, ভয়, লজ্জা- এসব অনুভূতি শিশুর আত্মমর্যাদার ক্ষতি হয়। তারা নিজেদের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, শিক্ষায় আগ্রহ কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের অযোগ্য মনে করতে শুরু করে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বারবার শাস্তির মুখোমুখি হওয়া শিশুরা দীর্ঘ মেয়াদে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এমনকি সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই চাপে চরম সিদ্ধান্ত নেয়ার দিকেও চলে যেতে পারে।
শিক্ষা যেখানে অনুপ্রেরণার উৎস হওয়া উচিত, সেখানে শিক্ষার্থীরা ভয় পেলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই বিকৃত হয়ে যায়। তারা প্রশ্ন করতে ভয় পায়, ভুল স্বীকার করতে লজ্জা পায়। সৃজনশীল চিন্তা দমন করে রাখে। ফলে তারা কেবল মুখস্থনির্ভর হয়, প্রকৃত জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়। এই সংস্কৃতি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিক্ষক তখন আর পথপ্রদর্শক থাকেন না, ভয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ান। এতে শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে না, দূরত্ব ও অবিশ্বাস তৈরি হয়।
সমস্যাটির বড় কারণ হলো সমাজের একটি অংশের দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক এখনো মনে করেন, ‘মার না খেলে শিক্ষার্থীরা শিখবে না’। কিন্তু শাসন ও সহিংসতা এক নয়। শাসনের নামে সহিংসতা করলে সংশোধনের বদলে ক্ষতি হয়।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় শিক্ষাব্যবস্থায়, বিশেষ করে উপমহাদেশের টোল, পাঠশালা ও মাদরাসাগুলোতে শৃঙ্খলা রাখার প্রধান উপায় ছিল বেত দিয়ে আঘাত। শিক্ষকের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যকে গুরুত্ব দেয়া হতো তখন। শাস্তিকে সেই আনুগত্য নিশ্চিত করার মাধ্যম হিসেবে ধরা হতো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলেও স্কুলগুলোতে বেত দিয়ে আঘাত করা হতো।
এমনকি অনেক স্কুলে কিভাবে আঘাত করা হবে, তার নিয়মকানুনও প্রচলিত ছিল। এসব নিয়মের মধ্যে থাকত- কতবার আঘাত করা যাবে, শরীরের কোন অংশে আঘাত করা যাবে। প্রচলিত ধারণা ছিল- ‘Spare the rod, spoil the child’ অর্থাৎ ‘বেত্রাঘাত না করলে শিশু নষ্ট হয়ে যায়’। এ ধারণা থেকে বিশ্বাস করা হতো, শারীরিক শাস্তি শিশুদের শৃঙ্খলাবোধ, ভদ্রতা ও অধ্যবসায় শেখায়। ফলে শিক্ষকরা নিজেদের দায়িত্বের অংশ হিসেবেই শাস্তি প্রয়োগ করতেন।
অতীতের এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য বা মানবাধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। শিক্ষা ছিল বেশি কর্তৃত্বনির্ভর, যেখানে প্রশ্ন বা ভিন্নমতের সুযোগ সীমিত ছিল। শাস্তির ভয় শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে রাখত। তবে সেই ভয় সৃজনশীলতা ও স্বাধীন চিন্তাকে আটকে রাখত। ফলে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ধীরে ধীরে শারীরিক শাস্তিকে ত্যাগ করে ইতিবাচক ও মানবিক পদ্ধতির দিকে এগিয়ে গেছে।
১৯৭৯ সালে প্রথম দেশ হিসেবে সুইডেন শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নয়, পরিবারেও শিশুদের ওপর শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। এর পরপরই নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালি, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা- প্রায় সব দেশই বেত দিয়ে আঘাত নিষিদ্ধ করে। এসব দেশে শিশুদের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে মানবিক ও অংশগ্রহণমূলক করে তোলা হয়েছে।
এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের পেছনে জাতিসঙ্ঘের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৯ সালে গৃহীত Convention on the Rights of the Child শিশুদের অধিকার রক্ষায় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সনদে বলা হয়েছে- শিশুদের শারীরিক বা মানসিক কোনো ধরনের সহিংসতা, নির্যাতন বা অপমানজনক আচরণ থেকে সুরক্ষা দেয়া প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো বাধ্য হয় তাদের জাতীয় আইন ও নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে।
এছাড়া জাতিসঙ্ঘের শিশু অধিকার কমিটি ‘General Comment No. 8’-এর মাধ্যমে ঘোষণা করে, বেত দিয়ে আঘাতসহ সব ধরনের শারীরিক শাস্তি শিশুদের মর্যাদার পরিপন্থী। তা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা উচিত। এই অবস্থান বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারকদের জন্য শক্তিশালী নৈতিক ও আইনি নির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে।
জাতিসঙ্ঘের আরেক অবদান হলো এর বিভিন্ন সংস্থা বিশেষ করে UNICEF-এর মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি, গবেষণা পরিচালনা এবং সরকারগুলোকে কারিগরি সহায়তা দেয়া। এসব উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে শিশুদের প্রতি সহিংসতার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বেড়েছে। বিকল্প ইতিবাচক শৃঙ্খলা পদ্ধতির প্রসার হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মন বুঝতে হবে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা রক্ষায় শাস্তি দেয়ার পেছনে প্রধানত দু’টি বিষয় কাজ করে। একটি হলো প্রচলিত সামাজিক ধারণা, অন্যটি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব। অনেক শিক্ষক বিশ্বাস করেন, কঠোর শাসন ছাড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান বলছে, ভয় নয়; সহমর্মিতা, অনুপ্রেরণা ও ইতিবাচক যোগাযোগ শিক্ষার প্রকৃত ভিত্তি। এ কারণে শিক্ষকদের মানসিকতা পরিবর্তন জরুরি। শিক্ষাদর্শন, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক শৃঙ্খলার কৌশল সম্পর্কে শিক্ষকদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তারা শিখতে পারেন কিভাবে শাস্তি না দিয়ে উৎসাহ ও পরামর্শ দিয়ে শিক্ষার্থীদের আচরণ সংশোধন করা যায়। শিশুদের মন বোঝাও শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একটি শিশুর আচরণ অনেক সময় তার পারিবারিক অবস্থা, মানসিক চাপ বা ব্যক্তিগত সমস্যার প্রতিফলন হতে পারে। প্রশিক্ষিত শিক্ষক এসব দিক বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে শিক্ষার্থীর প্রতি সহানুভূতি বাড়ে। কমে আসে শাস্তিমূলক মনোভাব। শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর সম্পর্ক আরো আন্তরিক ও বিশ্বাসভিত্তিক হয়।
একই সাথে প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের ব্যক্তিগত দক্ষতাও উন্নত করতে পারে। প্রশিক্ষণ তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য ও পেশাগত আচরণ ঠিক রাখার কৌশল শেখায়। এতে কঠিন পরিস্থিতিতেও সংযত থাকা সম্ভব হয়।
করণীয়
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। শারীরিক ও মানসিক শাস্তির বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। শাস্তির পরিবর্তে ইতিবাচক পদ্ধতি যেমন- কাউন্সেলিং, প্রণোদনা, সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভুল বুঝতে শেখে, ভয় পায় না। আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শিশুমনস্তত্ত্ব বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়; মানুষের মানসিক, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশের ভিত্তি। সেখানে ভয়, সহিংসতা ও অপমানের স্থান নেই।
লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা



