পার্বত্য চট্টগ্রামে একাত্তরের প্রক্সি ওয়ার

পার্বত্য চট্টগ্রাম অপারেশনে মুজিব বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে এসে একাত্তরের ১২ নভেম্বর থেকে পরবর্তী ২৮ দিনে অন্তত ৪৯ জন তিব্বতি কমান্ডো মারা যান (ভিন্নমতে ৫৬ জন) এবং ১৯০ জন আহত হন।’ (পৃষ্ঠা ১০৯) তবে মুজিব বাহিনীর কতজন সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম দখলের লড়াইয়ে নিহত বা আহত হয়েছেন তা নিয়ে কোনো তথ্য চোখে পড়ে না। স্বাধীনতার পর মুজিব বাহিনীর নেতৃবৃন্দ ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লড়াইয়ে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েন যে ওই বিষয়ে হয়তো নজর দেয়ার সময় পাননি। এ বিষয়ে আলতাফ পারভেজের অভিমত হচ্ছে, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিব্বতি কমান্ডোদের এইরূপ ভূমিকা সম্পর্কে কেবল বাংলাদেশে নয় ভারতীয় জনসমাজেও সব ধরনের আলোচনা চেপে যাওয়া হয়

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারত ও পাকিস্তান যখন সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার উপক্রম সে সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে শুরু হয় এক নজিরবিহীন প্রক্সি ওয়ার। ওই প্রক্সি ওয়ারের বিবদমান দু’টি পক্ষের একটি ছিল চীনের প্রশিক্ষিত এবং পাকিস্তানের সমর্থনপুষ্ট মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং অন্যটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যপুষ্ট এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW এর তত্ত্বাবধানে গঠিত তিব্বতি Special Frontier Force (এসএফএফ) ও মুজিব বাহিনী।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান, যিনি এস এস উবান হিসেবে সমধিক পরিচিত, তার Phantoms of Chittagong: The ‘Fifth Arm ‘ in Bangladesh বইয়ে মিজোদের সম্পর্কে লিখেছেন, ‘২২ অক্টোবর ১৯৬১-তে মিজোরামে মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এমএনএফ) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হলো। এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট শ্রী লালডেংগা এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট শ্রী লালনুম্মাভিয়া ভ্রমণের যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া এবং ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে যাওয়ার অভিযোগে ১৯৬৩ সনে গ্রেফতার হলেন। তাদেরকে অবশ্য দু’মাস পর মুক্তি দেয়া হলো ভারতের আপসকামী নীতির কারণে।

এমএনএফের এক প্রতিনিধিদল শ্রী লালডেংগার নেতৃত্বে ১৯৬৫ সনের ৩০ অক্টোবর আসামের গৌহাটিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করল। তারা এক স্বাধীন মিজোরাম রাষ্ট্র গঠনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং তাকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার মতো সক্ষম করতে বার্মার চীন পাহাড়গুলো ছাড়াও সংলগ্ন মিজো জনগণ অধ্যুষিত ভারতীয় এলাকা নতুন রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত করার জন্য জোর দাবি জানালেন। প্রধানমন্ত্রী ধৈর্যের সাথে তাদের কথা শুনে বলেছিলেন, পরে তিনি এ ব্যাপারে তাদের সাথে যোগাযোগ করবেন।

এই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে অহিংস পন্থা অবলম্বনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সত্ত্বেও শ্রী লালডেংগা এবং তার পার্টি গেরিলাদল গঠন করে এবং পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের সাথে যোগসাজশে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতীয় সীমান্তের ঠিক অপর পারে তাদের অনেক ঘাঁটি গড়ে তোলে। এসব নিরাপদ ঘাঁটি থেকে এবং সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও চীনা ইনস্ট্রাক্টরদের অধীনে প্রাপ্ত গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তানের সমর্থনপুষ্ট হয়ে তারা ভারতীয় অঞ্চল মিজোরামে হাঙ্গামা চালিয়ে যেতে লাগল।’ (পৃষ্ঠা ৬৬)

‘মিজোদের অসন্তোষের কারণ বিবেচনা করলে দেখা যাবে, ভারতের বিরুদ্ধে তাদের ক্রোধের বেশ অনেক কারণই যথার্থ। পাশ্চাত্য জীবন ও সভ্যতার মিথ্যা মূল্যবোধ ছাড়া ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাদেরকে আর কিছু দেয়নি। এ ছাড়া মিশনারিরা পরিশীলিত মিজো খ্রিষ্টান সমাজের সাথে দেশের বাদবাকি অংশের বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চিন্তাধারা সম্বন্ধে হীন নিন্দাবাদের মাধ্যমে। ভারতীয়রাও এর চেয়ে ভালো কিছু করেনি। করার মধ্যে তারা তাদেরকে জাদুঘরে প্রদর্শনের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং কেবল তাদের লোকনৃত্যকে অন্যদের সামনে তুলে ধরেছে। তাদের ক্ষুধা দূর করার উদ্দেশ্যে তাদের কৃষির উন্নয়ন ঘটানোর বা এমনকি ক্ষুদ্র মাপের শিল্প কারখানা স্থাপনের জন্যও তেমন চেষ্টা করেনি। ক্ষুদ্র শিল্প কারখানার জন্য মিজোরা ভালো কারিগর হতে পারে। গোটা রাজ্যে নাম করার মতো কোনো যন্ত্রপাতি নেই। রাজধানী আইজলের সাথে বাদবাকি ভারতের যোগাযোগের প্রধান মহাসড়কটি ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই। সেখানে হাসপাতাল ও স্কুলের দারুণ অভাব।’ (পৃষ্ঠা ৬৭)

‘মিজোদের মধ্যে অসন্তোষ বেশ ভালো রকম ছড়িয়েছিল এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের নিরাপদ ঘাঁটিগুলো পাকিস্তান ও চীনের দ্বারা প্রয়োজনীয় সামগ্রীতে এমন পরিপূর্ণ হয়ে থাকত যে এই বৈরী ভূমিতে যেকোনো ভারতীয় অনুপ্রবেশ তারা প্রতিরোধ করতে পারত।

এই মিজোরা পাকিস্তান প্যারা-মিলিটারি ফোর্সেসের বেতনভুক ছিল। তারা চীনাদের দ্বারা গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। পাকিস্তান তাদেরকে সজ্জিত ও পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে মোতায়েন করেছিল।’ (পৃষ্ঠা ৬৮)

মিজোদের সে সময়কার অবস্থা সম্পর্কে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ব্যক্তিগত সচিব ফারুক আজিজ খান তার ‘বসন্ত ১৯৭১’ বইয়ে ভয়াবহ তথ্য দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার কারণে মিজোরাম প্রদেশের সব গ্রামবাসীকে হয় সেনাবাহিনী, না-হয় বিএসএফ শিবিরের আশপাশে বাস করতে হয়। বছরে ৩৬৫ দিনই সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সান্ধ্য আইন জারি হয়ে যায়। তার মানে হলো, সূর্যাস্তের পর শুধু কারফিউ প্রাসধারী ও মিজো বিদ্রোহীরাই ঘরের বাইরে অবাধ চলাফেরা সুযোগ পায়।’

উল্লেখ্য, ভারত সরকারই গ্রামবাসীদেরকে জোর করে সেনা ছাউনির আশপাশের সরকার কর্তৃক নির্ধারিত আশ্রয় শিবিরে বসবাস করতে বাধ্য করে।

এসএসএফের প্রথম ইন্সপেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জেনারেল উবান তার বাহিনী সম্পর্কে লিখেছেন, ‘অক্টোবর ১৯৬২’-এর চীনা আক্রমণের পর শিগগিরই দুর্গম উত্তরের পাহাড়ের উপজাতীয়দের মধ্য থেকে স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স গড়ে তোলা হয়েছিল। শ্রী বিএন মল্লিক তাঁর ‘দি চাইনিজ বিট্রেয়াল, মাই ইয়ারস উইথ নেহরু’ নামের বইয়ে এই ফোর্সের কথা উল্লেখ করেন। মূলত এই সীমান্ত-জনদের কাজ ছিল চীনারা যদি কখনো আবার ভারতের ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে তাহলে তাদের লাইনের পেছনে থেকে গেরিলা যুদ্ধ করে চীনাদের বিরুদ্ধে গোটা লড়াইয়ে সাহায্য করা।

এ লোকগুলো দৈহিকভাবে অত্যন্ত শক্ত-সমর্থ এবং একেবারেই ভয়শূন্য। পুনর্জন্মে বিশ্বাসী এই লোকগুলো মৃত্যুকে বিবেচনা করে ভবিষ্যতের এক শ্রেয়তর জীবনের সিং-দরোজা হিসেবে। এটা তাদেরকে প্রায়ই বেপরোয়া করে তোলে। তাদের তীক্ষè দৃষ্টিশক্তি এবং বিপদের প্রতি সহজাত প্রতিক্রিয়ার কারণে তারা গেরিলা প্রশিক্ষণের জন্য অনন্য। তারা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ভালোবাসে এবং শিগগিরই অব্যর্থ লক্ষ্যভেদী হয়ে ওঠে। একটা জিনিস তারা খুব অপছন্দ করে তা হলো তাদের অস্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। তারা তাদের হালকা মেশিনগান সাথে নিয়ে ঘুমাতে পছন্দ করে এবং সেগুলো রেগুলার কোয়ার্টার-গার্ডে নিরাপদ জিম্মায় রাখার ব্যাপারটা তারা বুঝতেই পারে না। এমনকি অনেকে ইউনিট কোয়ার্টার-গার্ডে অস্ত্র জমা রাখতে বললে অপমানিত বোধ করতে পারে এবং সন্দেহ শুরু করতে পারে যে কর্তৃপক্ষ হয়তো তাদেরকে বিশ্বাস করছে না। তাদের দম অফুরান, সেইসাথে তাদের অসাধারণ দৈহিক শ্রম সহ্য করার ক্ষমতা যোগ হওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের থেকে অনেক উঁচু স্থানে লড়াই করার জন্য তারা আদর্শ যোদ্ধা।

তারা আরোপিত শৃঙ্খলার বশ হতে চায় না। এটাও বোঝা গিয়েছিল যে তাদেরকে আর্মি বা পুলিশ অ্যাক্টের অধীনে আনলে তাদের স্বাধীন উদ্যোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুণগুলোই ভোঁতা হয়ে যাবে। অথচ এগুলোই দেশপ্রেমিক গেরিলার প্রাণস্বরূপ। সুতরাং সিদ্ধান্ত হয়েছিল, এই স্বেচ্ছাসেবক ফোর্সটি একটি সিভিলিয়ান ফোর্স হিসেবে সংগঠিত হয়ে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালকের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। ওই সময় ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালক ছিলেন শ্রী বিএন মল্লিক। ঠিক হলো তাদের প্রশিক্ষণের এবং শান্তি ও যুদ্ধকালে তাদের মোতায়েনের ভার অর্পণ করা হবে এমন এক সৈনিকের ওপর যিনি তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারবেন এবং প্রয়োজনের সময় তাদেরকে লড়াইয়ে নামাতে পারবেন, কঠিন আর্মি কোডের সাহায্য ছাড়া, যে কোডে কর্তব্য এড়ানো এবং বিবিধ অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।’

কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার নিগড়ের বাইরে রেখে একটা বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে RAW চেয়েছিল এমন একটি বাহিনী যা প্রয়োজনে নৃশংসতার আশ্রয় নিতে কুণ্ঠিত হবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশের পর এসএফএফ ও মুজিব বাহিনী নৃশংসতার পরিচয় রাখে। লেখক ও ইতিহাসবিদ শরবিন্দু শেখর চাকমা তার ‘মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম’ বইয়ে এদের নৃশংসতার উল্লেখ করেছেন। তাদের হাতে বেশ কিছু উপজাতীয় নিহত হয়, কিছু নারী ধর্ষিতা হয় এবং অনেক বাড়িঘর আগুনে ভস্মীভূত হয়।

তবে এসএস উবান যে বিষয়টি তার বইয়ে লেখেননি তা হলো, ওই বাহিনী গঠনে মার্কিন সহায়তা। সিআইএ তাদের প্রশিক্ষণের জন্য দেরাদুনে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো করে দিয়েছিল, দিয়েছিল প্রশিক্ষণ সামগ্রী ও বিপুল অর্থ।

মুজিবনগর সরকারের ক্যাবিনেট সচিব ও পরবর্তীতে বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা এইচটি ইমাম তার ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১’ বইয়ে ভারত-মার্কিন গোপন সামরিক আঁতাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘১৯৬২ সালের পর বেশ কয়েক বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ সামরিক আঁতাত ছিল। সময়টা ছিল আমেরিকা-চীনের চরম বৈরী-সম্পর্কের। আমেরিকা গোপনে ভারতের সাহায্যে এগিয়ে আসে। সৃষ্টি হয় বড় বড় সামরিক স্থাপনা, সেনা ছাউনি, বিমানঘাঁটি। আসতে থাকে আমেরিকান উপদেষ্টা, প্রকৌশল, সামরিক সাজ-সরঞ্জাম। এরই ফলশ্রুতি ছিল ভারতের মাউন্টেন ডিভিশনের সৃষ্টি। চীনের পশ্চিম-দক্ষিণাঞ্চলে, বিশেষ করে তিব্বত এবং সিংকিয়াং প্রদেশে গণবাহিনীর ঘাঁটি, তৎপরতা, আণবিক গবেষণা স্থাপনা ইত্যাদি সম্পর্কে গোপনে তথ্য সংগ্রহের জন্য ভারত সে-সময় আমেরিকানদের ভালো বন্ধু ছিল। সামরিক সহযোগিতা তারই ফল।’

এসএসএফের পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিযান সম্পর্কে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ তার ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী : ইতিহাসের পুনর্পাঠ’ বইয়ে লিখেছেন, ‘সিআইএ’র সহায়তায় ব্যাপক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হলেও অপ্রচলিত সামর্থ্যরে এই গেরিলা দলের শক্তি কখনোই যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত ছিল না। কখনোই চীনে ঢোকার সুযোগ পায়নি তারা। সে কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত এই বাহিনীর শক্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। যেহেতু এসএফএফ ভারতীয় নিয়মিত বাহিনীর অধীনস্থ ছিল না এবং এটা ‘ভারতের স্বার্থে’র জন্য নয়, ‘তিব্বতের স্বার্থে’ সৃষ্ট, সে কারণে প্রথম দিকে এসএফএফের নেতৃস্থানীয় তিব্বতি যোদ্ধারা বাংলাদেশে আসতে অনিচ্ছুক ছিলেন। পরে ‘র’ প্রধান আর এন কাও হিমাচলের ধর্মশালায় গিয়ে প্রবাসী তিব্বতি সরকারকে চাপ দিয়ে এ বিষয়ে রাজি করান। এ সময় ইন্দিরাগান্ধী তিব্বতি গেরিলাদের বাংলাদেশে পাঠানোর আগে দালাইলামার সাথেও কথা বলেন। প্রথমত, শক্তি পরীক্ষা এবং দ্বিতীয়ত, এই বাহিনীকে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে মিজো ও নাগা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উচ্ছেদের লক্ষ্যে তিব্বতি কমান্ডোদের প্রায় তিন হাজার সদস্যকে মুজিব বাহিনীর পাশাপাশি ১৯৭১ সালের নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে মিজোরামের দেমাগিরি দিয়ে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢোকানো হয়। এই অপারেশনের প্রতীকী নাম ছিল ‘মাউন্ট ঈগল’।

প্রথমে তিব্বতি যোদ্ধাদের উত্তর প্রদেশ থেকে বিমানে করে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে গাড়িতে করে নেয়া হতো মিজোরামের দেমাগিরিতে। তারপর তারা বিভিন্ন পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রবেশ করে। এই সফল অভিযানে এসএফএফের হাতে নিজেদের গেরিলা অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে মিজো ও নাগারা পরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে আপসমূলক চুক্তি করতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে উবানের এই স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার্সদের অন্যতম অধিনায়ক (সিআইএ প্রশিক্ষিত) Dhondup Gyatotsang মারা গিয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম অপারেশনে এসএফএফের তিনটি ইউনিট অংশ নেয়। প্রত্যেকটির নেতৃত্বে ছিলেন একজন তিব্বতি (যাকে বলা হতো Dapon বা ব্রিগেডিয়ার) এবং একজন ভারতীয় কর্নেল। Dhondup Gyatotsang ছিলেন এমনই একজন Dapon, যিনি তিব্বতি গেরিলাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অন্যতম সুপরিচিত যোদ্ধা ছিলেন। এইরূপ আরেকজন Dapon ছিলেন Ratuk Ngawang. ২০১১ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চল্লিশ বছরপূর্তি উপলক্ষে ৮৪ বছর বয়সে প্রকাশিত তার এক সাক্ষাৎকারে তিনি মুজিববাহিনী সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, They later acted as our guides and contact persons during the war though they did not actually fight with us.

Though it us who fought the real war and suffered the casualties, all the credit has later been given to the Mujib Bahinis (because the Tibetan Force was involved under the guise of the Mujib Bahinis).

পার্বত্য চট্টগ্রাম অপারেশনে মুজিব বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে এসে একাত্তরের ১২ নভেম্বর থেকে পরবর্তী ২৮ দিনে অন্তত ৪৯ জন তিব্বতি কমান্ডো মারা যান (ভিন্নমতে ৫৬ জন) এবং ১৯০ জন আহত হন।’ (পৃষ্ঠা ১০৯)

তবে মুজিব বাহিনীর কতজন সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম দখলের লড়াইয়ে নিহত বা আহত হয়েছেন তা নিয়ে কোনো তথ্য চোখে পড়ে না। স্বাধীনতার পর মুজিব বাহিনীর নেতৃবৃন্দ ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লড়াইয়ে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েন যে ওই বিষয়ে হয়তো নজর দেয়ার সময় পাননি। এ বিষয়ে আলতাফ পারভেজের অভিমত হচ্ছে, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিব্বতি কমান্ডোদের এইরূপ ভূমিকা সম্পর্কে কেবল বাংলাদেশে নয় ভারতীয় জনসমাজেও সব ধরনের আলোচনা চেপে যাওয়া হয়। এটাকে ‘মোস্ট সিক্রেট’ বিষয় হিসেবে দেখা হয় সেখানে। যে কারণে, ভারত বাংলাদেশের যুদ্ধে সাহসী ভূমিকার জন্য উবানের এসএফএফ বাহিনীর ৫৮০ জন সদস্যকে কোনো ধরনের পদক দিয়ে নয়- নগদ অর্থ দিয়ে বিশেষভাবে সম্মানিত করেছে। তিব্বতি এসএফএফের পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিযান উদযাপন করতে ওই সময় ‘র’ প্রধান আর এন কাও স্বয়ং সেখানে চলে এসেছিলেন। এভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও গোপন সামরিক অভিযানের এক মৃগয়াক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল।’ (পৃষ্ঠা ১১০)