২০২৬ সালের ১৩-১৪ মে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর এটি ছিল এ অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম নির্বাচন। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন একটি স্বাধীন সংস্থা, যা আইনজীবীদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। সেই সাথে বছরের পর বছর ধরে উচ্চ আদালতের স্বাধীনতা রক্ষা ও এর সপক্ষের আন্দোলনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আর এ জন্য নির্বাচনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এবারের নির্বাচনে কোনো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায়, প্রত্যাশিতভাবে ‘নীল প্যানেলের’ ব্যানারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সমর্থিত প্রার্থীরা একচ্ছত্র জয় লাভ করেন। ঐতিহাসিকভাবে ‘সাদা প্যানেল’ হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আওয়ামী লীগের এবারের নির্বাচনী দৃশ্যপট থেকে অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো; দলটির অনেক সমর্থক ভোট দেয়া থেকে বিরত ছিলেন। কারণ মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় তাদের পছন্দের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ ছিল না। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ভোটারদের সামনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অনুমোদিত প্রার্থীদের নিয়ে গঠিত একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘সবুজ প্যানেল’-কে সামনে নিয়ে আসা হয়, নির্বাচনের ফলে যার অবস্থান ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। আজকের নিবন্ধে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের এ নির্বাচনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব।
বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের একটি ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। যুগে যুগে এই বারকে নেতৃত্ব দিয়েছেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, টি এইচ খান ও সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদের মতো দিকপাল আইনজীবীরা। এ ছাড়া বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী, কামালউদ্দিন হোসেন এবং আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের মতো অনন্য ব্যক্তিত্বরা এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আইনজীবীদের স্বার্থ এবং বিচার বিভাগের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই বার অ্যাসোসিয়েশন একটি একক ও ঐক্যবদ্ধ সংস্থা হিসেবে কাজ করত। তবে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর, বার ধীরে ধীরে রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে বিভক্ত হতে শুরু করে। দলীয় ব্যানারে সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেয়ার আইনি বাধা এড়াতে, আওয়ামী লীগ ও তার অনুসারীরা নিজেদের ‘সাদা প্যানেল’ এবং বিএনপি ও তার সহযোগী দলগুলো (জামায়াতসহ) ‘নীল প্যানেল’-এর ব্যানারে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি ও জামায়াত আইনজীবী ফোরামে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নির্বাচন করেছে, যার ফলে বারের রাজনীতিতে তাদের অভিন্ন স্বার্থের অংশীদার হিসেবে দেখা হতো। ফলে ‘নীল প্যানেল’-এর পরিচয় কেবল বিএনপির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা সমভাবে জামায়াতেরও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছিল।
জুলাই বিপ্লবের পর দেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে। এর ধারাবাহিকতায়, আসন্ন বার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ৯০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪২ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন। বারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাতিল হওয়া প্রার্থীরা সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ সিদ্ধান্তের পর সংশ্লিষ্ট প্রার্থী এবং তাদের অনুসারীদের পক্ষ থেকে ব্যাপক বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানানো হয়। তবে বঞ্চিত প্রার্থীদের এই প্রতিবাদের পক্ষে বারের সাধারণ সদস্যদের কাছ থেকে তেমন কোনো সমর্থন মেলেনি। জুলাই বিপ্লব চলাকালীন আওয়ামী লীগের দমনপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি আইনজীবীদের মানসপটে এতটা ছিল যে, ওই আমলের সুবিধাভোগী আইনজীবীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিলেন না। এভাবে সাদা প্যানেলকে সম্পূর্ণ বাইরে রেখে বারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
আওয়ামী লীগের ‘সাদা প্যানেল’ বিদায় নেয়ার পর, বারের নির্বাচনী ময়দানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় আইনজীবীদের একটি নতুন মোর্চার উত্থান ঘটে। তারা নিজেদের প্যানেলের নামকরণ করেন ‘সবুজ প্যানেল’। প্যানেলের নাম ও রঙ পছন্দ করার বিষয়টি ছিল একপ্রকার কৌশলগত ভুল; কারণ এটি অবচেতনভাবে এ প্যানেল থেকে দাঁড় করানো অনেক প্রার্থীর আপেক্ষিক অনভিজ্ঞতা বা কাঁচা পরিপক্বতার বার্তা ফুটিয়ে তুলেছিল। সবুজ প্যানেল মনোনীত ১৪ প্রার্থীর মধ্যে মাত্র তিন বা চারজন সুপ্রিম কোর্টে মোটামুটি পরিচিত বা প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী ছিলেন। মনোনীত প্রার্থীদের বেশির ভাগ আইনজীবী কিংবা অধিকারকর্মী- কোনো পরিচয় নিয়ে বারের রাজনীতিতে নিজেদের মেলে ধরতে পারেননি। বিশেষ করে, সবুজ প্যানেলের সভাপতি পদপ্রার্থী ছিলেন তুলনামূলকভাবে অপরিচিত এবং নীল প্যানেলের হেভিওয়েট প্রার্থী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের তুলনায় ছিলেন বেশ দুর্বল। ব্যারিস্টার খোকন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের রাজনীতির একজন প্রবীণ ও ঝানু ব্যক্তিত্ব, যিনি এর আগেও একাধিকবার বারের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বারের রাজনীতিতে তিনি সবসময় এক প্রভাবশালী নাম, যিনি একই সাথে জাতীয় রাজনীতি ও আইনি অঙ্গন- উভয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে আসছেন। এমনকি অতীতে আওয়ামী লীগের পূর্ণ আধিপত্যের বছরগুলোতেও তাকে একজন অত্যন্ত শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যার বিরুদ্ধে ‘সাদা প্যানেল’-এর প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে রীতিমতো হিমশিম খেতেন। একই চিত্র দেখা যায় সম্পাদক পদেও। সবুজ প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থীও নীল প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থীর সাথে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত, বিএনপি-সমর্থিত ‘নীল প্যানেল’-এর বিপরীতে সবুজ প্যানেল কোনো নির্ভরযোগ্য কিংবা শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়।
অবশ্য, নির্বাচনের আগে বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত আইনজীবীদের মধ্যে অতীতের মতো আবারো একক ‘নীল প্যানেল’-এর অধীনে যৌথভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। উভয় শিবিরের আইনজীবীদের বড় একটি অংশ মনে করেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি হবে সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত। এমনকি আইনজীবীদের নিজস্ব ফোরামে এ নিয়ে একটি প্রাথমিক বোঝাপড়াও তৈরি হয়েছিল। তবে মাঠপর্যায়ের বোঝাপড়া শেষ পর্যন্ত নাকচ করে দেয় জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব। জামায়াতের ভেতরে একটি অংশ মনে করেছিল যে, আলাদা ব্যানারে এককভাবে লড়াই করলে বারের রাজনীতিতে নিজেদের শক্তি আরো উঁচুতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব; কিন্তু রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে জামায়াত তাদের নিজস্ব জনসমর্থন ও সাংগঠনিক ক্ষমতা আকাশচুম্বী মনে করেছিল। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তারা নিজেদের বিএনপির একটি প্রকৃত বিকল্প দল হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেন। তবে নির্বাচনের ফল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার জানান দিয়েছে।
১৪ মে ২০২৬ তারিখ রাতে যখন নির্বাচনের ফল প্রকাশ পেতে শুরু করে, তখন এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জামায়াত সমর্থিত ‘সবুজ প্যানেল’ একটি বিপর্যয়কর পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে। এ প্যানেল থেকে মাত্র একজন সদস্য প্রার্থী বারের কার্যনির্বাহী কমিটিতে জয়লাভ করতে সক্ষম হন, আর বাকি প্রায় সব প্রার্থী বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। বাস্তবতা হলো, সবুজ প্যানেলের বেশ কয়েকজন প্রার্থীকে খেসারত দিতে হয়েছে স্রেফ এই নতুন ব্যানারটি ব্যবহার করার কারণে। তাদের মধ্যে অনেকে হয়তো বারের কার্যনির্বাহী কমিটিতে অনায়াসে নির্বাচিত হতে পারতেন, যদি তারা আগের মতো বিএনপি সমর্থিত ‘নীল প্যানেল’-এর প্রার্থী হিসেবে ব্যালটে লড়তেন। ভোটের পরিসংখ্যান পরিষ্কার জানান দিচ্ছে যে, স্বয়ং জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব কর্মী-সমর্থকদের একটি বড় অংশ এই সবুজ প্যানেলকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এর প্রধান কারণ ছিল- মনোনীত প্রার্থীদের বেশির ভাগ বারের পরিচিত কর্মী বা সুপ্রতিষ্ঠিত আইনজীবী ছিলেন না। তার ওপর, সাধারণ জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা বছরের পর বছর ধরে ‘নীল প্যানেল’-এ ভোট দিতে অভ্যস্ত এবং স্রেফ দলীয় আবেগে অন্ধ হয়ে তারা সেই দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাননি; বিশেষত যখন বিকল্প হিসেবে সবুজ প্যানেল থেকে অত্যন্ত দুর্বল প্রার্থী দাঁড় করানো হয়েছিল। ভোটের এ চূড়ান্ত ফল বারের সাধারণ আইনজীবীদের কাছে এ সত্য উন্মোচিত করেছে যে, সুপ্রিম কোর্ট বারের প্রতিটি আসনে কার্যকরভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো যোগ্য প্রার্থীর অভাব রয়েছে জামায়াত-সমর্থিত সবুজ প্যানেলে। বারের রাজনীতিতে জামায়াতের কয়েকজন যোগ্য ও সম্মানিত আইনজীবী থাকলেও, পুরো প্যানেলজুড়ে জয়ের মতো যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীর বড় ঘাটতি আছে। বিশেষ করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মতো হেভিওয়েট পদগুলোতে শক্তিশালী প্রার্থী দেয়ার মতো পর্যাপ্ত বিকল্প তাদের হাতে ছিল না।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের এ নির্বাচনকে মূলত একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করেছে। অথচ এই বার কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের বর্ধিত অংশ হিসেবে কাজ করতে কিংবা দলীয় ভিত্তিতে বিভক্ত হওয়ার জন্য গঠিত হয়নি। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা। অতীতে রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এই বার একটি অভিন্ন নেতৃত্বের অধীনে ঐক্যবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছিল। জামায়াত এবং তার ‘সবুজ প্যানেল’ এটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে যে, ২০২৬ সালের নির্বাচনটি বছরের পর বছর ধরে চলা তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের অবসান ঘটিয়ে বারকে আবারো ঐক্যবদ্ধ করার একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করতে পারত। উল্টো এককভাবে লড়ার এ সিদ্ধান্ত বারের মধ্যকার বিদ্যমান বিভাজনকে আরো গভীর করেছে। এর চেয়েও বড় কথা, বিএনপি-সমর্থিত ‘নীল প্যানেল’-এর এ বিপুল বিজয় দলটির নীতিনির্ধারকদের মনে এ আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছে যে, বারের নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে জামায়াত বা তাদের ‘সবুজ প্যানেল’-এর ভোটব্যাংকের ওপর ভরসা করার কোনো দরকার তাদের নেই। এ কারণে আশঙ্কা জাগে যে, ২০২৬ সালের বার নির্বাচন হয়তো কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়; বরং সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের ঐক্যবদ্ধ চরিত্রের ধীর ভাঙনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়ে থাকবে।হ
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি



