আইন পাসের পর সংসদে তর্ক-বিতর্ক

সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বলীয়ান সরকারি দল বিএনপি ভবিষ্যতে সংসদীয় রীতি কতটা অনুসরণ করবে তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে। কারণ, বিল পাসের পর আলোচনার উদাহরণ জনমনে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। ওই সংসদে অত্যন্ত স্বল্পতম সময়ে রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য আমূল বদলে ফেলার মতো বিল পাস করে নজির সৃষ্টি করা হয়েছিল। যার মাধ্যমে এই ভূ-খণ্ডের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার কবর রচিত হয়েছিল। পঁচাত্তরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা আবার ফিরতে পেরেছে

জাতীয় সংসদ বা আইনসভা দেশের শাসনব্যবস্থার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের একটি । সংসদের মুখ্য কাজই আইন প্রণয়ন, যাতে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়। সহজভাবে বলা যায়, আইনসভা দেশের নিয়ম-কানুন তৈরি এবং নিয়ন্ত্রণ করে। সংসদের মূল কাজগুলোর অন্যতম হলো— আইন প্রণয়ন, নতুন আইন তৈরি এবং প্রয়োজনে পুরনো আইন সংশোধন বা বাতিল করা। সেই সাথে সরকারের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বাজেট অনুমোদন করা। দেশের আয়-ব্যয়ের হিসাব (বাজেট) পরীক্ষা ও অনুমোদন দেয়া। জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা, জনসমস্যা ও চাহিদা আইনসভায় তুলে ধরা। নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখা। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নীতিতে অংশগ্রহণ করা। এ ছাড়া সরকার দেশে সুশাসন নিশ্চিত করছে কি-না, তা নিবিড়ভাবে নজরদারি করে থাকে।

আইনসভার প্রথম ও প্রধান কাজ দেশ পরিচালনায় সময়োপযোগী বিধি-বিধান প্রণয়ন করা। এটি সংসদের মৌলিক কাজের প্রধানতম একটি। তাই আইন প্রণয়নের আগে তর্ক-বিতর্ক বা আলোচনা সংসদীয় গণতন্ত্রে সাধারণত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এর মূল উদ্দেশ্য, প্রস্তাবিত আইনের ত্রুটি-বিচ্যুতি অপনোদন করে সেটি জনকল্যাণমুখী করা। সংসদে কোনো আইন পাসের আগে বিষয়টির উপর সংসদ সদস্যরা তাদের সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন। সে জন্য আইন পাসের আগে পক্ষে-বিপক্ষে প্রাণবন্ত বিতর্ক হয়। আলোচনার মাধ্যমে প্রস্তাবিত বিল দেশের সংবিধান এবং বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি-না তা বিস্তারিত যাচাই করা সহজ হয়। সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা পক্ষে-বিপক্ষে নিজস্ব যুক্তি উপস্থাপন করে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিলের বিচার-বিশ্লেষণ করেন। সংসদে তর্ক-বিতর্কের অবকাশ না থাকলে এই প্রক্রিয়ায় ছেদ পড়ে।

সংসদে কার্যকর আলোচনাই বিলের কোনো ধারায় অস্পষ্টতা বা ত্রুটি আছে কি-না তা সহজে শনাক্ত করা যায়। বিরোধী দলের সদস্যরা বিলটি সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা তুলে ধরেন। জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের দাবি তোলেন। বিতর্কের মাধ্যমে সংশোধনের প্রস্তাব দেন। ফলে আইনটি কার্যকরে কোনো জটিলতা তৈরি না হয়।

আইন পাসের আগে কার্যকর বিতর্ক হলে সরকারের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ রোধ সহজ হয়। আইন প্রণয়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। এ জন্য বিতর্ক হওয়া সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। সংসদীয় গণতন্ত্রে তর্ক-বিতর্ক সংসদীয় রীতিতে অপরিহার্য অনুষঙ্গ। তবে কিছু ক্ষেত্রে জরুরি পরিস্থিতিতে সীমিত বা সংক্ষিপ্ত বিতর্কেরও নজির আছে। লক্ষণীয়, আইন পাসের আগে বিতর্ক বাধ্যতামূলক না হলেও এটি গণতান্ত্রিক ও কার্যকর আইন প্রণয়নে অবশ্য প্রয়োজনীয়। তর্ক-বিতর্কের নিয়ম রাখা হয়েছে মূলত আইনকে আরো ভালো, কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতে। এর কয়েকটি কার্যকারণ আছে :

সংসদে কোনো বিল নিয়ে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে চুলচেরা বিশ্লেষণ হলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হয়। আইনসভার সদস্যরা নিজ নিজ যুক্তি তুলে ধরলে একটি প্রস্তাবের ভালো-মন্দ দিক স্পষ্ট হয়। ভুল ও দুর্বলতা ধরার সুযোগ থাকে, যা পরে সংশোধনের অবকাশ থাকে।

সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের পক্ষে কথা বলেন। বিতর্কের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মতামত পরোক্ষভাবে উঠে আসে। ফলে জনস্বার্থ রক্ষা পায়। শুধু তাই নয়, তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার কমিয়ে আনা সহজ হয়। যদি বিতর্ক না থাকে, তাহলে সরকার গোষ্ঠীস্বার্থে সহজে আইন পাসের সুযোগ নেয়। বিতর্ক ত্রুটিপূর্ণ আইন পাসের ঝুঁকি কমায়। তা ছাড়া তর্ক-বিতর্ক গণতন্ত্র চর্চার একটি অংশ। গঠনমূলক যুক্তিতর্কে গণতন্ত্রের চর্চা মসৃণ হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভিন্নমত গুরুত্ব পায়।

আইন পাসের আগে সংসদে তর্ক-বিতর্ক না হলে বেশ কিছু গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায় :

১. বিলের ওপর প্রয়োজনীয় সময় নিয়ে আলোচনা না হলে আইনের দুর্বলতা ধরা পড়ে না। যুক্তি-তর্কের অনুপস্থিতিতে এমন আইন পাস হতে পারে যা জনগণের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একবার ভুল বা ক্ষতিকর আইন প্রণীত হলে নাগরিক জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনে। যা আর সহসা পূরণ হওয়ার নয়।

২. যুক্তি-তর্কের অনুপস্থিতিতে একটি দল বা গোষ্ঠী নিজ স্বার্থে আইন বানাতে পারে; যা একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত। যেখানে জনস্বার্থের প্রতিফলন ঘটে না।

৩. নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কথা বলার সুযোগ না পেলে নাগরিক সমস্যা ও চাহিদা অনুযায়ী আইন প্রণয়ন না-ও হতে পারে। পরিণতিতে জনস্বার্থ উপেক্ষিত হয়।

৪. বিতর্কের অভাবে আইনটি কেন আনা হচ্ছে বা এর প্রভাব কী, তা পরিষ্কার হয় না। ফলস্বরূপ সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কমে যায়।

৫. পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়া আইন পাস হলে তা প্রয়োগে সমস্যা হয়। বারবার সংশোধনের প্রয়োজন পড়ে। আইনটি কম কার্যকর হতে পারে।

৬. মতপ্রকাশ ও ভিন্নমত শোনার সুযোগ না থাকলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। বাস্তবতা হলো— তর্ক-বিতর্ক ছাড়া আইন মানসম্পন্ন না-ও হতে পারে। এ ছাড়া কম গ্রহণযোগ্য এবং কখনো ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। এতে আখেরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

উপরে উল্লিখিত কথা বলার উদ্দেশ্য, সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বয়সসীমা তুলে দিয়ে আইন পাস করা হয়েছে। সংসদে এ দু’টি বিল পাসের আগে কোনো আলোচনা হয়নি। পাসের পর অনির্ধারিত আলোচনার সময় সরকার বলছে, এতে অভিজ্ঞ লোক নিয়োগ সহজ হবে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজবাস্তবতায় কিছু সম্ভাব্য ক্ষতির দিক নিয়ে যৌক্তিক উদ্বেগ আছে বৈকি।

বয়সসীমা তুলে দিলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে পদে বসানোর সুযোগ তৈরি হয়। এমন শঙ্কা বিরোধী দল ও বিশ্লেষকদের। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জবাবদিহি কমে যেতে পারে। যেহেতু নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অধীনে আছে স্টক মার্কেট ও বীমা খাত। আর্থিক খাতের এই দু’টি জায়গা খুব সংবেদনশীল।

আমরা দেখেছি, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের প্রথম দফায় দেশের শেয়ার মার্কেটে সরকারের পরোক্ষ মদদে গুটি কয় ব্যক্তি কিভাবে লুটপাট করেছেন। এতে হাজারো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হয়ে পথের ফকির হয়েছেন। ঠিক একইভাবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে; তখন ২০১০ সালে দেশে শেয়ারমার্কেটে ভয়াবহ লুটপাট সংঘটিত হয়। তাই বিএসইসিতে যদি নিয়োগে স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে ভুল সিদ্ধান্ত, বাজারে অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি বাড়তে পারে। অন্যদিকে বয়সসীমা না থাকলে একজন ব্যক্তি দীর্ঘ সময় পদে থাকতে পারেন। এতে নতুন নেতৃত্ব আসার সুযোগ কমে যাবে। একই চিন্তাধারা দীর্ঘদিন প্রভাব ফেলে। দক্ষতা সত্ত্বেও তরুণদের সুযোগ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। বয়সসীমা না থাকলে পুরনো ব্যক্তিরা বারবার নিয়োগ পেতে পারেন। ব্যক্তিকেন্দ্রিক আইন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এ পরিবর্তন কি নীতিগত, নাকি ‘বিশেষ কাউকে’ নিয়োগ দিতে? যদি আইন ব্যক্তির জন্য প্রণয়ন করা হয়, তাহলে এর প্রতি জন-আস্থা কমে যায়। পরিণতিতে আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়ে। যেহেতু বিএসইসি ও আইডিআরএ দেশের পুঁজিবাজার ও বীমা খাত নিয়ন্ত্রণ করে; এখানে দুর্বল বা পক্ষপাতদুষ্ট নেতৃত্ব এলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায়। বাজারে অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দিতে পারে। তবে এ কথাও ঠিক, ভারসাম্যপূর্ণ মনোভাব বজায় রাখতে পারলে অভিজ্ঞদের কাজে লাগানোর একটি ইতিবাচক দিকও আইন দু’টিতে নিহিত আছে। তাই অনেক দেশে বয়সসীমা নেই। তবে সমস্যা তখন হয়— যখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও যোগ্যতার ভিত্তি দুর্বল হয়। আইন দু’টির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি— নিয়োগপ্রক্রিয়া রাজনৈতিক বা ব্যক্তিনির্ভর হলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদ্য সমাপ্ত প্রথম অধিবেশনের শেষ দিনে দু’টি বিল পাস হওয়ার পর অনির্ধারিত আলোচনা হয়েছে। বিল দু’টি উত্থাপনের পর পাসের আগেই এ নিয়ে আলোচনার কথা। সত্যি বটে, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আলোচনায় কেউ নোটিশ করেননি। শুধু একজন স্বতন্ত্র সদস্য এ বিষয়ে নোটিশ দেন। বিল পাসের পর অনির্ধারিত বিতর্ক হয়। যার আদৌ প্রয়োজন ছিল না। কারণ, যা হওয়ার হয়ে গেছে; বরং এ বিতর্কে ব্যয় হওয়া সময়ে সংসদ চালানোর যে বিপুল অর্থের সংশ্লিষ্টতা তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকার নিছক অপচয় ছাড়া কিছু নয়। তবে এ কথা ঠিক, বর্তমান সংসদে সরকারি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। যার জোরে যেকোনো বিল পাস করিয়ে নেয়া ক্ষমতাসীনদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল।

অনির্ধারিত আলোচনায় দু’টি নিয়ন্ত্রক সংস্থায় শীর্ষ নির্বাহী নিয়োগে বয়সের সীমা তুলে দেয়ার পরিণতি কী হতে পারে, সে কথা বিরোধী দলের নেতা ও অন্য সদস্যরা বলেছেন। সরকারি দল দক্ষ, যোগ্য ও দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগের স্বার্থে আইন দু’টি প্রণয়নের কথা বললেও, এ নিয়ে তারা যে আন্তরিক নন, তা উদাহরণসহ দেখিয়েছেন বিরোধী সদস্যরা। এখানে সম্প্রতি রাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের কথা উঠে এসেছে।

দুশ্চিন্তার বিষয়— সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বলীয়ান সরকারি দল বিএনপি ভবিষ্যতে সংসদীয় রীতি কতটা অনুসরণ করবে তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে। কারণ, বিল পাসের পর আলোচনার উদাহরণ জনমনে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। ওই সংসদে অত্যন্ত স্বল্পতম সময়ে রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য আমূল বদলে ফেলার মতো বিল পাস করে নজির সৃষ্টি করা হয়েছিল। যার মাধ্যমে এই ভূ-খণ্ডের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার কবর রচিত হয়েছিল। পঁচাত্তরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা আবার ফিরতে পেরেছে।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]