মুসলিম উম্মাহর আধুনিক সঙ্কটগুলোর অন্যতম হলো, আল্লাহর কিতাব ও আল্লাহর কাউন বা জগতকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হিসেবে কল্পনা করা। একদিকে রাখা হয়েছে কুরআন, ওহি, হেদায়েত, আখিরাত ও ধর্মীয় জ্ঞানকে, অন্যদিকে রাখা হয়েছে প্রকৃতি, মহাবিশ্ব, ইতিহাস, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মানবসভ্যতার অভিজ্ঞতাকে। এই বিচ্ছেদ কেবল শিক্ষাগত নয়, এটি মূলত একটি গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক ও সভ্যতাগত সঙ্কট।
আল কুরআন পৃথিবীকে কখনো ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুজগত হিসেবে উপস্থাপন করেনি; বরং কুরআনের ভাষায় প্রকৃতি নিজেই এক বিশাল আয়াত। আকাশ, নক্ষত্র, সমুদ্র, বৃষ্টি, পাহাড়, উদ্ভিদ, প্রাণী, দিন-রাত্রির পরিবর্তন, এমনকি মানুষের ইতিহাস- সব কিছুই আয়াত। অর্থাৎ, সৃষ্টিজগত কোনো নির্বাক পদার্থ নয়। মহাবিশ্ব আল্লাহর নিদর্শনগুলোর উন্মুক্ত মহাগ্রন্থ। তাই ইসলামী চেতনায় আয়াতুত তানজিল বা ওহির আয়াত এবং আয়াতুত তাকবিন বা সৃষ্টির আয়াত পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের ব্যাখ্যাকারী। আল্লাহর বাণী ও আল্লাহর সৃষ্টি একই সত্যের দুই প্রকাশ মাত্র।
মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে এই সমন্বিত চেতনা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। মুসলিম বিজ্ঞানীদের কাছে প্রকৃতি কেবল ব্যবহারযোগ্য সম্পদ ছিল না; বরং তা ছিল তাওহিদের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিস্তার। ইবনুল হাইসাম যখন আলোকবিজ্ঞানের গবেষণা করছিলেন, আল বিরুনি যখন পৃথিবীর পরিমাপ নিয়ে কাজ করছিলেন কিংবা ইবনে খালদুন যখন সামাজিক বিজ্ঞানের আকার দিচ্ছিলেন, তখন তারা নিজেদেরকে ধর্মের বাইরে দেখেননি। জগতের জ্ঞানকে তারা কোনো সেক্যুলার জ্ঞানচর্চা মনে করেননি। তারা বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্বের নিয়ম আবিষ্কার করা মানে আল্লাহর সুন্নাহ ও হিকমাহকে অনুধাবন করা। তাদের কাছে গবেষণা ছিল ইবাদতেরই একটি রূপ।
ইমাম আবু হামিদ গাজ্জালি জ্ঞানকে দ্বিখণ্ডিত করেননি। যদিও পরে তাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাস্তবে তিনি জ্ঞানের নৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠন করতে চেয়েছিলেন। ইবনে রুশদ যুক্তি ও ওহির মধ্যে মৌলিক সামঞ্জস্যের কথা বলেছেন। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি শরিয়াহ, ইতিহাস, সমাজ ও মানবপ্রকৃতিকে একই সমন্বিত বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখেছেন।
কিন্তু আধুনিক যুগে এসে মুসলিম চেতনায় গভীর ভাঙন তৈরি হয়। উপনিবেশবাদ, আধুনিক ইউরোপীয় জ্ঞানতত্ত্ব এবং সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাবে মুসলিম সমাজ ধীরে ধীরে জ্ঞানকে দুই পরস্পরবিরোধিতায় বিভক্ত করে ফেলে।
মাগরেবি দুনিয়ায় জ্ঞান-বিচ্ছেদের পেছনে একটি মৌলিক দার্শনিক সমস্যা হলো জ্ঞানের অস্তিত্বতাত্ত্বিক বিভাজন। আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বে জ্ঞানকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে, রিলিজিয়াস নলেজ ও সেক্যুলার নলেজ। কিন্তু ইসলামী চিন্তায় জ্ঞান কখনোই দ্বৈত অস্তিত্ব বহন করেনি। জ্ঞান ছিল একক সত্যের বিভিন্ন স্তরের উপলব্ধি। ফলে যখন জ্ঞানকে দুই আলাদা অস্তিত্বে ভাগ করা হয়, তখন আসলে বাস্তবতাকেই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। যা ইসলামী তাওহিদি বিশ্বদৃষ্টির সাথে সাংঘর্ষিক।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এপিস্টেমিক অথরিটি শিফট। অর্থাৎ, জ্ঞানের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কোথায় থাকবে, সেই রূপান্তর। ক্লাসিক্যাল ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞানের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ছিল ওহি এবং ওহি-বিভাসিত আকল ও তুরাসের জমায়েত কাঠামোর মধ্যে। কিন্তু আধুনিক যুগে সেই কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হয়েছে। কর্তৃত্ব এখন অভিজ্ঞতাবাদ, পরিমাপযোগ্যতা এবং পরীক্ষাগার-নির্ভর বিজ্ঞানের হাতে। এর ফলে সত্য নির্ধারণের মানদণ্ড পরিবর্তিত হয়েছে। কি সত্য? এই প্রশ্নের উত্তর আর ওহি-আকলের সমন্বয়ে নির্ধারিত হচ্ছে না; বরং কেবল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বৈজ্ঞানিকতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এর সাথে যুক্ত হয় মেটাফিজিক্যাল ডিসকানেকশন, অর্থাৎ- দুনিয়া ও জিন্দেগির অন্তর্নিহিত অর্থ হারিয়ে যাওয়া। আধুনিক বিজ্ঞানে প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা হয় কার্যকারণ (causality) দিয়ে, কিন্তু উদ্দেশ্য (teleology) প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। অথচ ইসলামী বিশ্বদৃষ্টিতে প্রতিটি কারণের পেছনে আছে হিকমাহ এবং প্রতিটি ঘটনাই একটি উদ্দেশ্যমূলক নকশার অংশ। ফলে প্রকৃতি অর্থপূর্ণ সত্তা থেকে নিরর্থক যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়েছে।
আরেকটি গভীর সঙ্কট হলো লস অব ইন্টেগ্রেটিভ অন্তলোজি বা মানবসত্তার একক ধারণার ভাঙন। ইসলামী দৃষ্টিতে মানুষ একসাথে আত্মা, বুদ্ধি ও শরীরের সমন্বিত সত্তা। যার জ্ঞান, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা পরস্পর যুক্ত। কিন্তু আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষকে আলাদা আলাদা ফাংশনে ভাগ করা হয়েছে। বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, ধর্মীয় ব্যক্তি, প্রশাসক- প্রতিটি পরিচয় আলাদা, কোনো সমন্বিত ইনসান ধারণা নেই। ফলে ব্যক্তি নিজেই খণ্ডিত হয়ে পড়েছে।
একই সাথে ঘটেছে ইনস্টিটিউশনাল এপিস্টেমিক সেগ্রিগেশন। যার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞান-জগত তৈরি করেছে। মাদরাসা ধর্মীয় জ্ঞানের দুর্গে পরিণত হয়েছে, আর বিশ্ববিদ্যালয় ধর্মহীন জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। এর ফলে জ্ঞানচর্চার ভাষা, পদ্ধতি ও লক্ষ্যও সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে।
এর মধ্য দিয়ে আজ উম্মাহের সভ্যতাগত সম্মিলিত স্মৃতির কাঠামো ফাটলে জেরবার। মুসলিম সভ্যতা নিজস্ব জ্ঞান-পরম্পরা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, আরো হচ্ছে। ক্লাসিক্যাল যুগে জ্ঞানচর্চা ছিল একটি ধারাবাহিক ঐতিহ্যের অংশ। যেখানে শিক্ষক-শিষ্য সম্পর্ক, ইজাজাহ, তাজকিয়া এবং দীর্ঘকালীন সোহবত জ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। আধুনিক ব্যবস্থায় এই ধারাবাহিকতা ভেঙে গিয়ে জ্ঞান হয়ে উঠেছে দ্রুত অর্জনযোগ্য, পরীক্ষাভিত্তিক এবং বাজার-নির্ভর একটি পণ্য।
ফলে মুসলিম সমাজে তৈরি হয়েছে বিপজ্জনক পরিস্থিতি। সম্মানজনক কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারণত এমন শিক্ষিত শ্রেণী তৈরি হয়, যারা হয়তো ধর্মীয় ভাষায় দক্ষ কিন্তু সভ্যতার বাস্তব প্রশ্নে অক্ষম। নয়তো প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ কিন্তু অস্তিত্বগত ও নৈতিকভাবে শূন্য।
এই বিচ্ছিন্নকরণের আরেকটি বিপজ্জনক ফল হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে অনেক মুসলিম ঈমানের হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব , ম্যাথমেটিক্স বা মহাকাশবিদ্যাকে অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয়, যেন এগুলো কুরআনের বিপরীত বাস্তবতা। ফলে একদিকে জন্ম নেয় প্রতিরক্ষামূলক বিচ্ছিন্ন মানসিকতা, অন্যদিকে জন্ম নেয় ধর্মবিচ্ছিন্ন বৈজ্ঞানিক মানসিকতা। আধুনিক মুসলিম সমাজের বড় ব্যর্থতা হলো, সে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে; কিন্তু প্রকৃতি ও জ্ঞানের দর্শন নিয়ে গভীর চিন্তা করছে না। ফলে মুসলিম বিশ্ব প্রযুক্তির ভোক্তা হয়েছে, নির্মাতা নয়। তথ্যের ব্যবহারকারী হয়েছে; কিন্তু জ্ঞানের সভ্যতাগত ভাষ্যকার হতে পারেনি।
কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষ আল্লাহর খলিফা। সে ইবাদতকারী। সে জগতকে বুঝতে, চিনতে ও ন্যায়ভিত্তিকভাবে নির্মাণ করতে জিম্মাদারিপ্রাপ্ত সত্তা। তাই প্রকৃত ইসলামী সভ্যতায় গবেষণাগার ও মসজিদ, সৃষ্টিজগত ও তাফসির, প্রযুক্তি ও তাজকিয়ার মধ্যে কোনো মৌলিক দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে তখনই, যখন মুসলিম সমাজ ওয়াহদাত ফিল উলুম বা জ্ঞানগুলোর ঐক্যবদ্ধতাকে হারিয়ে ফেলেছে, জ্ঞানকে পরস্পরবিরোধী বিচ্ছিন্ন ধারায় বিভক্ত করেছে।
আজ মুসলিম পুনর্জাগরণের প্রশ্নটি কেবল রাষ্ট্র, অর্থনীতি বা রাজনৈতিক শক্তির বিষয় নয়। এটি কেন্দ্রীয়ভাবে নিজামুল-মারিফাহ বা জ্ঞানব্যবস্থার পুনর্গঠনের প্রশ্নও। কারণ, কোনো সভ্যতার প্রকৃত পতন শুরু হয় তখনই, যখন তার জ্ঞানের কেন্দ্রচেতনা ভেঙে যায়। বাহ্যিক দুর্বলতা তার পরিণাম মাত্র; মূল বিপর্যয় ঘটে অন্তর্গত বিশ্বদৃষ্টিতে।
এর পুনর্গঠনের শর্ত হলো জগত ও ওহির মিথ্যা দ্বৈধতা অতিক্রম করা এবং ওয়াহদাত ফিল-উলুম বা জ্ঞানের তাওহিদি ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা। কিন্তু এই পুনর্গঠন স্লোগান, আবেগ বা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াশীলতা দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন গভীর সভ্যতাগত তাজদিদ- তথা একটি পুনর্নির্মাণ-প্রক্রিয়া।
প্রথমত, প্রয়োজন ইসলাহুল মাফাহিম বা জ্ঞানের মৌলিক ধারণাগুলোর সংস্কার। মুসলিম সমাজকে পুনরায় উপলব্ধি করতে হবে, ওহি ও কাউন পরস্পর বিচ্ছিন্ন দুই জগৎ নয়। সৃষ্টিজগত কোনো ধর্মহীন অঞ্চল নয়; বরং তা আল্লাহর সুন্নাহর উন্মুক্ত কিতাব। বিজ্ঞান তাই ওহির বিকল্প নয়; বরং তাকবিনি আয়াত (সৃষ্টিগত নিদর্শন) পাঠের একটি মাধ্যম। একই সাথে দ্বীনি জ্ঞানকেও কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত বা আনুষ্ঠানিক শরয়ি বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাকে এমন এক ইলমে উমরান বা জীবনজ্ঞানে রূপান্তর করতে হবে, যা সভ্যতা নির্মাণ করে, ইতিহাসকে রূপ দেয় এবং ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক বিন্যাস সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন ওয়াহদাতুত-তারবিয়াহ বা শিক্ষা ও দীক্ষা প্রক্রিয়ার ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা। মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার কৃত্রিম প্রাচীর ভেঙে দিতে হবে। কারণ এই বিভাজন মূলত আধুনিক জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচ্ছেদের প্রতিফলন। ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞান কখনো কম্পার্টমেন্টালাইজড ছিল না। সাধারণত ফকিহ ইতিহাসও জানতেন, মুহাদ্দিস ভাষাতত্ত্ব জানতেন, চিকিৎসক দর্শন জানতেন, আর দার্শনিক তাফসিরের আলো থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। অতএব নতুন শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন হতে হবে, যেখানে কুরআন, হিকমাহ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সমাজতত্ত্ব ও নৈতিকতা পরস্পরের সাথে সংলাপে থাকবে। কারণ বিচ্ছিন্ন জ্ঞান বিচ্ছিন্ন মানুষ তৈরি করে। সমন্বিত জ্ঞান সমন্বিত ইনসান ও সমন্বিত সভ্যতা গড়ে তোলে।
তৃতীয়ত, প্রয়োজন ইস্তিরদাদুল-মা’না- অস্তিত্বের অর্থ পুনরুদ্ধার। ইসলামী বিশ্বদৃষ্টিতে জগত কেবল ব্যবহারযোগ্য রিসোর্স নয়; এটি আমানত, শাহাদাত ও তাসবিহের ক্ষেত্র। পাহাড়, বৃক্ষ, নক্ষত্র, জলধারা এক মহাজাগতিক জিকরের অংশ। তাই বিজ্ঞান যদি আখলাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা শক্তি উৎপাদন করবে; কিন্তু হিকমাহ উৎপাদন করবে না। প্রযুক্তি তখন মানুষের খিদমতের পরিবর্তে মানুষের ওপর জবরদস্তি বিস্তারের যন্ত্রে পরিণত হবে। ফলে উন্নতি থাকবে, কিন্তু সাকিনাহ (প্রশান্তি) থাকবে না, ক্ষমতা থাকবে; কিন্তু ন্যায় থাকবে না, তথ্য থাকবে; কিন্তু অর্থ থাকবে না।
চতুর্থত, প্রয়োজন তারবিয়াতুল ইনসান বা সমন্বিত মানবগঠন প্রক্রিয়া। শিক্ষা কেবল পেশাগত দক্ষতা উৎপাদনের যন্ত্র নয়। শিক্ষা হচ্ছে মানুষকে আহসানু তাকউইমের (সর্বোত্তম রূপবাস্তব) মর্যাদায় উন্নীত করার প্রক্রিয়া। ইসলামী সভ্যতায় আদব ছিল জ্ঞানের কলব। কারণ আদব মানুষকে শেখায় কোন জিনিস কোথায় স্থাপন করতে হয়। তাই এমন মানুষ গড়তে হবে, যার মধ্যে আকল, রুহ, খেয়াল, নৈতিকতা ও সভ্যতাগত দায়িত্ববোধ একসাথে বিকশিত হবে। যে জগতকে বদলাতে চাইবে; কিন্তু নিজের নফসকে ভুলে যাবে না।
পঞ্চমত, প্রয়োজন উলামাউল উমরান ওয়াল হিকমাহ বা জীবনদক্ষ ও প্রজ্ঞাবিদ উলামা। তারা হবেন এমন বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণী, যারা তুরাসে প্রোথিত থাকবেন; কিন্তু সমকাল থেকেও বিচ্ছিন্ন হবেন না। যারা শাস্ত্রীয় ইমামদের ভাষা বুঝবেন, আবার আধুনিক সভ্যতার জটিলতাও অনুধাবন করবেন। কারণ, মুসলিম পুনর্জাগরণ কেবল প্রযুক্তি আমদানি করে সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন জ্ঞানের নিজস্ব তাফসির, নিজস্ব দর্শন এবং নিজস্ব সভ্যতাগত ভাষ্য নির্মাণ। যে উম্মাহ নিজের জ্ঞানকে অন্যের ভাষায় বুঝতে বাধ্য হয়, সে শেষ পর্যন্ত নিজের বাস্তবতাকেও অন্যের চোখে দেখতে শুরু করে।
ষষ্ঠত, প্রয়োজন তাখাইয়ুলু আখলাকিল হাদারি তথা সভ্যতাগত নৈতিক কল্পনাশক্তির পুনর্জাগরণ। মুসলিম সমাজকে আবারও বুঝে নিতে হবে, জ্ঞান পেশা নয়, আমানতও। গবেষণা ক্যারিয়ার নয়, খিলাফাহর দায়িত্বও। প্রযুক্তি আধিপত্যের উপায় নয়, আদল প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। ইবাদত কেবলই ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতা নয়, সভ্যতা নির্মাণের অন্তর্গত শক্তিও।
ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিতে সত্য এক। সেই একক সত্যের বহুমাত্রিক তাজাল্লিই হলো ওহি, প্রকৃতি, ইতিহাস, মানবচেতনা ও সভ্যতার প্রবাহ। যখন এই সত্য খণ্ডিত হয়, তখন মানুষও খণ্ডিত হয়, জ্ঞানও খণ্ডিত হয়, সভ্যতাও ভেঙে পড়ে। আর যখন এই সত্য পুনরায় তাওহিদের নূরে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন মসজিদ ও গবেষণাগার, তাফসির ও প্রযুক্তি, ইবাদত ও জীবনদক্ষতা পরস্পরের হাত ধরে। সব কিছু আবার একই রব্বানি নক্ষত্রপুঞ্জের অধীনে ফিরে আসে।
লেখক : কবি, গবেষক



