চেতনার অপব্যবহার ও গণতন্ত্রের সঙ্কট

নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; বরং একটি দায়িত্ব। জনগণ যে আশা ও আকাক্সক্ষা নিয়ে তাদের এই দায়িত্ব দিয়েছে, তা পূরণ করতে হলে তাদের হতে হবে সতর্ক, সংযমী এবং দূরদর্শী। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক এবং মানবিক রাষ্ট্র গঠনের পথেই এগিয়ে যেতে হবে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু সময় এসেছে, যখন নেতার স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধ বা বিপ্লবের চেতনা, আদর্শ- এসবকে ইতিবাচক শক্তি হিসেবে ব্যবহার না করে বরং রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে অপব্যবহার করা হয়েছে। ‘মৌলবাদ’, ‘উগ্রবাদ’, ‘সাম্প্রদায়িকতা’- এই শব্দগুলো এক দিকে যেমন বাস্তব হুমকির ইঙ্গিত বহন করে, অন্য দিকে অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন, জনমত বিভ্রান্ত এবং ভিন্নমতকে স্তব্ধ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে রাজনীতি তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে একধরনের নোংরা খেলায় পরিণত হয়েছে, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে সাধারণ জনগণ।

বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি, কিভাবে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে রাষ্ট্রযন্ত্র ও কিছু সুবিধাবাদী মহল জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। একটি পক্ষকে ‘দেশপ্রেমিক’ আর অন্য পক্ষকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা ‘চরমপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করার এই অপকৌশল কেবল রাজনৈতিক বিভাজনই বাড়ায়নি; বরং সমাজের ভেতরে গভীর অবিশ্বাস ও বিদ্বেষের বীজ বপন করেছে। মিডিয়ার একটি অংশ এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে জনমতকে প্রভাবিত করেছে- যেখানে সত্যের চেয়ে বয়ান বা ‘ন্যারেটিভ’ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে বাস্তবতা আড়ালে থেকে গেছে, আর জনগণ একধরনের কৃত্রিম বাস্তবতায় হাবুডুবু খেয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে ‘স্বপ্ন’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, ‘বিপ্লবের আদর্শ’- এসব শব্দের একটি গভীর ঐতিহাসিক ও নৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। এগুলো কেবল স্লোগান নয়; এগুলো জাতির আত্মপরিচয়ের অংশ, সংগ্রামের স্মারক এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা। এই মহৎ ধারণাগুলোকে তার প্রকৃত অর্থ থেকে বিচ্যুত করে সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে অপব্যবহার করা হয়েছে। ফলে যে চেতনা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কথা ছিল, সেটিই বিভাজনের হাতিয়ার হয়েছে।

‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বা ‘বিপ্লবের আদর্শ’কে একচেটিয়া মালিকানার মতো উপস্থাপন করার প্রবণতা একটি বড় সমস্যা। কোনো একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী যখন নিজেকে এই চেতনার একমাত্র ধারক ও বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন অন্য সব মত, অন্য সব ইতিহাস-ব্যাখ্যা, এমনকি ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানও ‘অবৈধ’ বা ‘অদেশপ্রেমিক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এর ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আর নীতির ভিত্তিতে হয় নয়; বরং তা পরিণত হয় পরিচয় ও লেবেলের লড়াইয়ে। এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদকে দুর্বল করে এবং জাতীয় ঐক্যের ভিত নড়বড়ে করে দেয়।

‘মৌলবাদ’, ‘উগ্রবাদ’ ও ‘সাম্প্রদায়িকতা’- এসব শব্দের অপব্যবহার একটি কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বাস্তবিক অর্থে এসব হুমকি যে নেই, তা নয়; কিন্তু সমস্যাটি হলো, কখনো কখনো এই টার্মগুলোকে এতটাই বিস্তৃত ও অস্পষ্টভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যে, ভিন্নমত পোষণকারী যে কারো বিরুদ্ধে দাগিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে দু’টি ক্ষতি হয়, এক দিকে নিরপরাধ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিপীড়নের শিকার হয়, অন্য দিকে প্রকৃত উগ্রবাদ বা সহিংসতার উৎসগুলো আড়ালে থেকে যায়। শব্দগুলোর অতিরিক্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহার তার প্রকৃত গুরুত্বকেই ক্ষুণ্ন করে।

এই ভাষাগত ও বর্ণনাগত কৌশলের সাথে যুক্ত হয়েছে একটি ‘ন্যারেটিভ নির্মাণের রাজনীতি’। এখানে বাস্তবতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কিভাবে ঘটনাকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিছু মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী মহল- সচেতনভাবে বা অজান্তে এই ন্যারেটিভ তৈরির প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে থাকে। একটি ঘটনার একাধিক দিক থাকতে পারে; কিন্তু যখন শুধু একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে বারবার প্রচার করা হয়, তখন সেটিই ‘সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। এতে জনগণের চিন্তাভাবনা প্রভাবিত হয় এবং তারা ধীরে ধীরে একটি সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘ভয়ের রাজনীতি’ গড়ে ওঠে। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জানে যে, ভিন্নমত প্রকাশ করলে তাকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘মৌলবাদী’ বা ‘উগ্রবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে, তখন সে নিজে ভীত, কুণ্ঠিত থাকে। এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে একধরনের আত্মসমর্পণে পরিণত হয়। ফলে সমাজে সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশ সঙ্কুচিত হয়ে যায়।

এই ধরনের রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে জনগণের মধ্যে আস্থার সঙ্কট তৈরি করে। তারা বুঝতে শুরু করে, রাজনৈতিক ভাষা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি ফাঁক রয়েছে। এই ফাঁক যত বাড়ে, ততই রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক দুর্বল করে। রাষ্ট্রের জন্য এটি বড় ক্ষতির কারণ হয়। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন বা প্রতিষ্ঠান দিয়ে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে বিশ্বাস, সততা এবং পারস্পরিক সম্মানের ওপর। যখন সেই ভিত্তিগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তখন পুরো কাঠামোই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে- এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ কী? প্রথমত, রাজনৈতিক ভাষার প্রতি দায়িত্বশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। যে শব্দগুলো জাতীয় ইতিহাস ও চেতনার সাথে জড়িত, সেগুলোকে হালকাভাবে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, ‘লেবেলিং’ বা তকমা দেয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে বিতর্কের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের ভূমিকা হতে হবে আরো পেশাদার ও নিরপেক্ষ- তাদের কাজ হবে সত্য অনুসন্ধান করা, কোনো পক্ষের হয়ে বয়ান তৈরি করা নয়।

জনগণের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি সচেতন ও সমালোচনামূলক চিন্তাশীল সমাজই পারে এই ধরনের নোংরা রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। যখন মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে, তথ্য যাচাই করতে শেখে এবং কোনো বর্ণনাকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে নিজস্ব বিশ্লেষণ তৈরি করে তখনই গণতন্ত্র প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক যাত্রাপথে এই অভিজ্ঞতাগুলো একটি বড় শিক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। যদি আমরা এই ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে একটি আরো পরিণত, দায়িত্বশীল এবং নৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারব। তখন ‘স্বপ্ন’ ও ‘চেতনা’ হবে সত্যিকার অর্থে জনগণের শক্তি, কোনো গোষ্ঠীর হাতিয়ার নয়। তবে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে জনগণ নিজেদের শক্তি ও প্রত্যয়ের মাধ্যমে একটি রক্তাক্ত কিন্তু সফল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা অত্যন্ত স্পষ্ট- তারা আর বিভাজন, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি দেখতে চায় না; তারা চায় সুস্থ, দায়িত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- বিশ্বাস পুনর্গঠন। জনগণের সাথে রাষ্ট্রের যে আস্থার সম্পর্ক বিগত সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেটি পুনরুদ্ধার করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসনের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি। আইন যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত না হয়; বরং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয় এটি নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ। একই সাথে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ভিন্নমতকে দমন না করে বরং তাকে সম্মান জানানো এবং যুক্তির মাধ্যমে মোকাবেলা করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি একমত হওয়ায় নয়; বরং ভিন্নমতের সহাবস্থানে নিহিত। বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী সমাজ সবখানেই একটি মুক্ত ও দায়িত্বশীল বিতর্কের পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে কেউ ভয়ের কারণে নয়; বরং বিবেকের তাগিদে কথা বলতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করে নির্মূল করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। মতপার্থক্য থাকবে- এটিই স্বাভাবিক; কিন্তু সেই পার্থক্য যেন সহিংসতা বা ঘৃণায় রূপ না নেয়, সেটিই নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া ‘মৌলবাদ’ বা ‘উগ্রবাদ’ শব্দগুলোর যথাযথ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বাস্তব হুমকি থাকলে তা মোকাবেলা করতে হবে কঠোরভাবে; কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা মতকে দমন করার জন্য এসব শব্দের অপব্যবহার করা যাবে না। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় ঐক্য। ধর্ম, ভাষা, মতাদর্শ এসব বৈচিত্র্যের মধ্যেও একটি সাধারণ পরিচয় গড়ে তুলতে হবে, যা হবে ‘বাংলাদেশী’ পরিচয়। এই পরিচয়ের ভিত্তি হবে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গণতন্ত্র, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান ও আস্থা।

নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; বরং একটি দায়িত্ব। জনগণ যে আশা ও আকাক্সক্ষা নিয়ে তাদের এই দায়িত্ব দিয়েছে, তা পূরণ করতে হলে তাদের হতে হবে সতর্ক, সংযমী এবং দূরদর্শী। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক এবং মানবিক রাষ্ট্র গঠনের পথেই এগিয়ে যেতে হবে।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]