মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও বিস্মৃত স্মৃতি

সাক্ষীদের পূর্বতন অসংলগ্ন জবানবন্দীগুলোর ওপর ভিত্তি করে জেরা করা বিবাদিপক্ষের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, যা তারা সত্য উদ্ঘাটনের অন্যতম ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এই সুযোগ না থাকায় ৪০ বছরেরও বেশি পুরনো সাক্ষ্যগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, ফলে অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা সাক্ষ্যও গ্রহণ করা হয়েছে, যেগুলোর বিরুদ্ধে বিবাদি পক্ষ পূর্বের অসঙ্গত বক্তব্য তুলে ধরে জেরা করতে পারেনি। ফলস্বরূপ, এই প্রক্রিয়ায় দেয়া প্রায় সব দণ্ডাদেশ ও সাজাই এখন আইনিভাবে অনিরাপদ ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া যখন চার দশক পর শুরু হয়, তখন ‘স্মৃতির নির্ভরযোগ্যতা’ নিয়ে এক গুরুতর প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের অধীনে ২০১০ সালে যখন জামায়াত নেতাদের বিচার শুরু হয়, তখন দেখা যায় যে এদের অনেকের নাম ১৯৭২ সালের ‘দালাল আইনে’র তালিকায় ছিল না। সেই সময় তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো মামলাও দায়ের করা হয়নি। এখানে তৈরি হয় এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন- ঘটনা যখন টাটকা এবং তথ্য-প্রমাণ যখন হাতের নাগালে, ঠিক তখন যদি এ গুরুতর অভিযোগগুলো নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য না হয়ে থাকে, তবে কয়েক যুগ পর কোন জাদুবলে সেগুলো এমন অকাট্য নিশ্চয়তা নিয়ে আবির্ভূত হলো? বিবাদীপক্ষের অবস্থান থেকে দেখলে এটি স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, এ অভিযোগগুলোর সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তি ঘটনার অনেক পরে কৃত্রিমভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। সময়ের দীর্ঘ প্রলম্বিত পথ সত্যকে উন্মোচিত করার পরিবর্তে বরং এমন এক শূন্যস্থান তৈরি করে দিয়েছে, যেখানে বিভিন্ন বয়ান বা আখ্যান ইচ্ছামতো জোড়া দেয়া হয়েছে। ঘষামাজা করা হয়েছে। পরিশেষে ‘প্রমাণ’ হিসেবে হাজির করা হয়েছে।

পূর্ব তিমুরের দিলি জেলা আদালতের স্পেশাল প্যানেল (জাতিসঙ্ঘ গঠিত একটি হাইব্রিড ট্রাইব্যুনাল) প্রদত্ত ‘প্রসিকিউটর বনাম ফ্লোরেনসিও তাকাকি’র মতো রায়গুলো এমন এক সঙ্কটের স্বরূপ উন্মোচন করেছে, যা আমরা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) প্রতি পদে অনুভব করছিলাম। তাকাকি মামলার রায়ে আদালত সাক্ষীদের সাক্ষ্যকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা বলে সাব্যস্ত করেনি; বরং দীর্ঘ সময় এবং জেরার মুখে স্মৃতির নিজস্ব বিন্যাস কিভাবে বদলে যেতে থাকে, আদালত সেই মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কটটি ফুটিয়ে তুলেছেন। সাক্ষীদের জবানবন্দিতে যে বৈপরীত্য ফুটে উঠছিল, তা কেবল তাদের অসাধুতার ফল ছিল না; বরং আদালতকক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার জটিল প্রক্রিয়া তাদের স্মৃতিকে অবচেতনে পুনর্গঠিত করে ফেলছিল। বর্ণনাগুলো পরিবর্তিত হয়েছে, কোথাও নতুন বিবরণ যুক্ত হয়েছে। আবার কোথাও কিছু বাদ পড়েছে; এবং যা একটি সরল বর্ণনা হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা প্রায়ই অসঙ্গতির এক সমষ্টিতে পরিণত হয়েছে। যেখান থেকে প্রতিটি পক্ষ নিজেদের মামলার পক্ষে সুবিধাজনক অংশ তুলে নিতে পেরেছে।

ঠিক একই ধারার প্রতিফলন আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লক্ষ করেছি। সাক্ষীদের অনেকে ছিলেন বয়োবৃদ্ধ, যারা কয়েক দশক আগের ঘটনাবলি প্রথমবারের মতো কোনো আনুষ্ঠানিক পরিবেশে বর্ণনা করছিলেন। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি ছিল, এ আখ্যান বা বয়ানগুলো যেভাবে তদন্তের গতিপ্রকৃতির সাথে নিজেদের সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলছিল, মনে হচ্ছিল যেন, তদন্ত যে পথে এগোচ্ছে, সাক্ষীদের স্মৃতিও ঠিক সেই ছাঁচে নিজেদের ঢেলে দিচ্ছে।

তাকাকি মামলায় আদালত বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, কয়েক মাস ধরে ৪০ জনেরও বেশি সাক্ষী অভিযুক্তের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি। তার গ্রেফতারের পর হঠাৎ করে তাকে ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে এমন সব জবানবন্দী আসতে শুরু করে; যেখানে তাকে ঘটনার মূল চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল; পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, আদালত নিজেই স্বীকার করতে বাধ্য হন, সাক্ষীদের যদি (উদ্দেশ্যমূলকভাবে) জেরা করা না হতো, তবে এসব অভিযোগের কোনো অস্তিত্ব থাকত না।

এমন পরিস্থিতিতে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না যে, স্মৃতি কেবল অতীতের নিস্পৃহ লিপিকার নয়; বরং তা পারিপার্শ্বিক প্ররোচনা ও পরিস্থিতির পিষ্টে সাড়া দিয়ে নিজের রূপ বদলে নেয়। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের মামলায় বিবাদী পক্ষ (ডিফেন্স) অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ‘তাকাকি’ মামলার সেই রায়টির ওপর নির্ভর করেছিল। একই সাথে একে আইনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল। আমরা আদালতে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি, সোহাগপুর বিধবাপল্লীর গণহত্যার অভিযোগে যেসব সাক্ষ্য দেয়া হয়েছে, সেগুলোর ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। সেই সাথে বিচারিক মানদণ্ডে সেগুলো কোনোভাবে অকাট্য বা নির্ভরযোগ্য নয়।

প্রাথমিকভাবে প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের কেউ তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সোহাগপুর হত্যাকাণ্ডে মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে কোনো উল্লেখ করেননি। এমনকি সাংবাদিক ও গবেষকদের কাছে দেয়া তাদের আগের বিবরণগুলোতেও এই একই সাক্ষীরা জনাব মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ওই গণহত্যার সাথে যুক্ত করেননি। এসব বিবরণ বই আকারে ট্রাইব্যুনালেও জমা দেয়া হয়েছিল। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরবর্তীকালে এই একই সাক্ষীদের কয়েকজন ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দিতে মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে সোহাগপুর হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আক্রমণকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট ছিল যে, সোহাগপুর হত্যাকাণ্ডে মোহাম্মদ কামারুজ্জমানের সংশ্লিষ্টতার এ তথাকথিত স্মৃতিগুলো ঘটনার ৪০ বছর পর তদন্তকারীদের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় সুনিপুণভাবে তৈরি করা হয়েছে।

ঠিক এই প্রেক্ষাপটে ট্রাইব্যুনালে জেরা করার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধগুলো এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় আপিল বিভাগ রুলিং দিয়েছিলেন, কোনো সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে যে জবানবন্দি দিচ্ছেন, তার সাথে যদি সাংবাদিক বা গবেষকদের কাছে দেয়া তার আগের বক্তব্যের কোনো বৈপরীত্য থাকে, তবে তার ওপর ভিত্তি করে সাক্ষীকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না। এর ফলে সোহাগপুর মামলায় সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষীদের দেয়া সেই আগের বক্তব্যগুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে, যেগুলোতে তারা কামারুজ্জামান সাহেবের নাম উল্লেখ করেননি। আইনি সীমাবদ্ধতায় এ বিশাল অসঙ্গতিকে আমরা আর আত্মপক্ষ সমর্থনের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারিনি। যখন কোনো সাক্ষীর পূর্বতন অসংলগ্ন বক্তব্যগুলো তার সামনে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয় না, তখন তার বয়ানের এ সুচতুর বিবর্তন বা রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। ফলস্বরূপ, আদালতের সামনে ঘটনাবলির কেবল একটি সুবিন্যস্ত ও পরিমার্জিত রূপ উপস্থাপিত হয়, যা থেকে সাক্ষীর আগের সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং বক্তব্যের অসঙ্গতিগুলো কৌশলে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। সাক্ষীদের পূর্বতন অসংলগ্ন জবানবন্দীগুলো তথ্যপ্রমাণ থেকে খারিজ করে দেয়ায় ট্রাইব্যুনাল এবং আপিল বিভাগ- উভয় আদালতের পক্ষে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করা এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পথটি অনেক বেশি সুগম হয়ে গিয়েছিল।

এ বিষয়ে বেশ কিছু উচ্চতর একাডেমিক গবেষণাও হয়েছে। বিশেষ করে সাক্ষীদের স্মৃতির ওপর আলেকজান্ডার জাহারের বিশ্লেষণ আমাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অভিজ্ঞতার এক হুবহু প্রতিচ্ছবি। জাহার এটি বোঝাতে চেয়েছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারগুলো প্রধানত মানুষের স্মৃতির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, যে স্মৃতিগুলো প্রায়শই এক দশক বা তারও বেশি সময় আগের। কিন্তু মানুষের স্মৃতি কোনো নির্জীব সংগ্রহশালা নয় যে, তা উদ্ধার করার আগ পর্যন্ত চুপচাপ অপেক্ষা করবে। স্মৃতি দ্রুত ফিকে হয়ে যায়, সময়ের সাথে সাথে নিজের রূপ বদলায়। সেই সাথে আলোচনা, পুনরাবৃত্তি ও প্রত্যাশার চাপে ক্রমাগত প্রভাবিত হয়। ফলে ট্রাইব্যুনালগুলো যাকে ‘সাক্ষ্যপ্রমাণ’ হিসেবে উপস্থাপন করে, তা আসলে স্মৃতির আদি রূপ নয়; বরং তা জবানবন্দী, সাক্ষাৎকার এবং আদালতের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে পুনর্নির্মিত এক কৃত্রিম বয়ান। একজন সাক্ষী যখন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ান, ততক্ষণে তার বয়ানটি অসংখ্য স্তরের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়ে যায়, যার প্রতিটি সংস্করণ আগেরটি থেকে কিছুটা ভিন্ন। কিন্তু এই ভিন্নতাকে অবিশ্বস্ততার লক্ষণ হিসেবে দেখার পরিবর্তে, আদালত প্রায়ই সময়ের ব্যবধান, মানসিক চাপ কিংবা ট্রমার দোহাই দিয়ে সেগুলোকে আড়াল করে ফেলেন। জাহারের মতে, এ ধরনের অজুহাত কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নয়, বরং বিচারিক দায় এড়ানোর এক সহজ পথ মাত্র।

আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো- স্মৃতি শুধু সময়ের সাথে ক্ষয় হয় না, বরং তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি গড়ে ওঠে ও পরিবর্তিত হয়। সাক্ষীরা একে অপরের সাথে কথা বলেন, বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ ছাড়া সচেতন বা অচেতনভাবে তারা বুঝে যান তাদের কাছ থেকে কী ধরনের বক্তব্য প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সময়ের বিবর্তনে একটি সামষ্টিক বয়ান তৈরি হয়ে যায়, যা শুনতে অত্যন্ত বাস্তব ও নির্ভরযোগ্য মনে হলেও মূল ঘটনার সাথে তার সম্পর্ক থাকে অতি সামান্য। সুতরাং, সাক্ষীদের পূর্বতন অসংলগ্ন জবানবন্দীগুলোর ওপর ভিত্তি করে জেরা করা বিবাদীপক্ষের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, যা তারা সত্য উদ্ঘাটনের অন্যতম ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এই সুযোগ না থাকায় ৪০ বছরেরও বেশি পুরনো সাক্ষ্যগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, ফলে অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা সাক্ষ্যও গ্রহণ করা হয়েছে, যেগুলোর বিরুদ্ধে বিবাদি পক্ষ পূর্বের অসঙ্গত বক্তব্য তুলে ধরে জেরা করতে পারেনি। ফলস্বরূপ, এই প্রক্রিয়ায় দেয়া প্রায় সব দণ্ডাদেশ ও সাজাই এখন আইনিভাবে অনিরাপদ ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি