বিশ্ব কাশ্মিরকে যেভাবে চেনে, বাংলাদেশকে সেভাবে চেনে না। এই অজ্ঞতা আকস্মিক নয়। কাশ্মিরকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় দৃশ্যমান দখলদারিত্বের মাধ্যমে- সৈন্য, কারফিউ ও জরুরি আইনের উপস্থিতিতে। বিপরীতে, ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশকে শাসন করা হয়েছে অনেক নীরবে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আরো কার্যকর পদ্ধতিতে- রাজনৈতিক সমন্বয়, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, নিরাপত্তার অজুহাতে ভিন্ন মত দমন এবং নিয়ন্ত্রিত নীরবতার মাধ্যমে। ভারত থেকে যা বন্ধুত্ব হিসেবে উপস্থাপিত হয়, ঢাকার অনেক মানুষের কাছে তা প্রায়ই আধিপত্যের অনুভূতি তৈরি করে।
একাধিকবার তুরস্ক ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় আমি তুর্কি সমাজকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। চায়ের দোকান বা মসজিদের বারান্দায় বসে প্রবীণদের আলোচনায় প্রায়ই কাশ্মির বা গাজা নিয়ে কথা শুনেছি। মানুষ সহজেই মুসলমানদের দুর্ভোগ চিনতে পারে, যখন তা পরিচিতরূপে আসে- দখল, শরণার্থী শিবির, চেকপয়েন্ট বা অবরোধের মাধ্যমে। কখনো তারা আমার দেশ বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চায়। সাধারণ প্রশ্নগুলো হয়, ‘বাংলাদেশ কি মুসলিম দেশ? মানুষ কি শান্তিতে থাকে?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ, বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। কিন্তু সেখানে মুসলমানরাও বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার, কাশ্মিরের মতো, কখনো তারও বাইরে।’ যখন বলি যে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯১ শতাংশ মুসলিম, যা আনুপাতিকভাবে তুরস্কের কাছাকাছি, তখন অনেকেই অবাক হয়। তখন প্রশ্ন ওঠে, কীভাবে এমন দমন সম্ভব?
নিপীড়ন সবসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ বনাম সংখ্যালঘু দ্বন্দ্বের মাধ্যমে আসে না। কখনো এটি আসে এমন একটি রাষ্ট্র থেকে, যা ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ এবং আঞ্চলিক জোটকে ব্যবহার করে ক্ষমতা ধরে রাখতে শিখেছে। বাংলাদেশে দমন-পীড়ন মুসলমানদের একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে নয়; বরং একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক শক্তি হিসেবে লক্ষ্যবস্তু হয়েছে; বিশেষত যখন তারা ভারতের প্রভাবের সমালোচনা করে বা তার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত কোনো শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবে সার্বভৌমত্ব অনেক সময় শর্তসাপেক্ষ থেকেছে। ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক হিসেবে উপস্থাপন করে, আর বাংলাদেশের সরকারগুলো ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে তার পুনরাবৃত্তি করে। যখন কোনো সরকার স্পষ্টভাবে ভারতপন্থী হয়, তখন দমন-পীড়নকে স্থিতিশীলতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। আর যখন সেই সমন্বয় দুর্বল হয়, তখন ‘চরমপন্থা’ শব্দটি সামনে আসে। এটি এক ধরনের নব্য-ঔপনিবেশিক প্রভাব, যেখানে ঔপনিবেশিক পতাকা নেই; কিন্তু নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করার পেছনে যে বাস্তবতা, তা কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সঙ্কটের প্রতিফলন। প্রায় চার হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্ত, যেখানে প্রতিদিন মানুষের চলাচল, জীবিকা, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের নীতির জটিল সংঘর্ষ ঘটে। এই সীমান্তে প্রাণহানির প্রধান কারণ কোনো ঘোষিত যুদ্ধ নয়; বরং তথাকথিত ‘সীমান্ত নিরাপত্তা অভিযান’। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) প্রায়ই চোরাচালান প্রতিরোধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো বা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের যুক্তি দেখিয়ে গুলি চালায়। কিন্তু বাস্তবে নিহতদের বড় একটি অংশই নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষ, যাদের অনেকেই স্থানীয় কৃষক, গরু ব্যবসায়ী, দিনমজুর বা সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ বাসিন্দা। তারা সীমান্তের কাঁটাতারের কাছে বা কখনো সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করার সময় গুলির শিকার হন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৯৬৩ জন বাংলাদেশী এই সীমান্তে নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর ৩০ থেকে ৩৫ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিছু বছর এই সংখ্যা আরো বেশি হয়েছে, বিশেষ করে যখন সীমান্তে কঠোর নজরদারি বা রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিচার প্রক্রিয়া হয় না বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তেমন কোনো কার্যকর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয় না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, যদি দুই দেশ নিজেদের ‘বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী’ হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে কেন সীমান্তে এ ধরনের সহিংসতা চলবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি, শক্তি প্রয়োগের অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং জবাবদিহির অভাবই পরিস্থিতিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
সীমান্তবর্তী এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সঙ্কট আরো জটিল করে তোলে। অনেক মানুষ জীবিকার তাগিদে সীমান্তবর্তী অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। গরু পাচার, ছোটখাটো বাণিজ্য বা সীমান্ত পারাপার তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রের কঠোর নিরাপত্তা নীতি যখন এই বাস্তবতার সাথে সংঘর্ষে আসে, তখন সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া, সীমান্তে `shoot-to-kill’ বা হত্যার জন্যই গুলি করার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগের কারণ। যদিও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এমন নীতি স্বীকার করে না, তবে ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যায়, মাঠপর্যায়ে এ ধরনের কৌশল কার্যকর রয়েছে। ফলে সীমান্তে আইন প্রয়োগের বদলে প্রায়ই তা প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগে রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। গণমাধ্যমে কিছু দিন আলোচনার পর বিষয়টি চাপা পড়ে যায়, কূটনৈতিক পর্যায়ে সামান্য প্রতিবাদ ছাড়া বড় কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। এতে করে এক ধরনের ‘impunit’ বা দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে অপরাধ ঘটলেও তার কোনো কার্যকর পরিণতি হয় না। এই বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন যৌথ উদ্যোগ, স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া, মানবাধিকারভিত্তিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সীমান্তকে সঙ্ঘাতের ক্ষেত্র নয়; বরং সহযোগিতা ও মানবিক সহাবস্থানের জায়গায় রূপান্তরিত করতে না পারলে এই প্রাণহানির চক্র অব্যাহত থাকবে। অতএব, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের এই সমস্যা কেবল নিরাপত্তার ইস্যু নয়; এটি মানবাধিকার, কূটনীতি এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের একটি গভীর সঙ্কট, যা সমাধানের জন্য উভয়পক্ষেরই দায়িত্বশীল ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
গত ১৫ বছরে এই প্রবণতা আরো তীব্র হয়েছে। বিরোধী রাজনীতি, বিশেষত দৃশ্যমানভাবে ধর্মীয় বা রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো শুধু প্রান্তিকই নয়, নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আবরার ফাহাদ, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, ভারতের সাথে একটি পানিবণ্টন চুক্তির সমালোচনা করার পর ছাত্রলীগের সদস্যদের হাতে নিহত হন। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হন। সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান বারবার কারাবরণ করেন এবং তার পত্রিকা ‘আমার দেশ’ বন্ধ করে দেয়া হয়। জামায়াতে ইসলামী, যা ভারতের প্রভাবের সমালোচনায় অন্যতম সক্রিয় দল, প্রায় ভেঙে ফেলা হয়; শত শত কার্যালয় ধ্বংস করা হয়, শীর্ষ নেতাদের বিতর্কিত বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং হাজার হাজার কর্মী গ্রেফতার হন। এটি আর স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ছিল না, এটি ছিল মুছে ফেলার প্রচেষ্টা।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর শুরু হয় একটি নতুন বর্ণনার লড়াই। ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে চরমপন্থীদের হাতে পড়া রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসকে তার বৈশ্বিক খ্যাতি সত্ত্বেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। কিন্তু দেশের ভেতরে এই বর্ণনা পুরোপুরি মেলে না। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহিংসতা বা নীতিগত পরিবর্তনের কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুরা আগের চেয়ে নিরাপদ অনুভব করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করেছে- তুরস্ক ও চীনের সাথে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। এতে ভারতের কৌশলগত মহলে অস্বস্তি দেখা গেছে, যা এই সম্পর্কের একটি অন্তর্নিহিত সীমার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রায় দুই কোটি নতুন ভোটার অংশগ্রহণ করে। এই নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য ছিল না; এটি ছিল সার্বভৌমত্ব, আত্মপরিচয় এবং বহিরাগত প্রভাবের সীমা নির্ধারণের প্রশ্ন। যুবসমাজের স্লোগানগুলো- স্বাধীনতা, জনগণের ক্ষমতা এবং আত্মনির্ভরতার দাবি- এই বৃহত্তর মনোভাবের প্রতিফলন। এগুলো কেবল আবেগ নয়; বরং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, নীরবতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সংক্ষিপ্ত প্রকাশ। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রতি সমালোচনামূলক মনোভাবকে শুধু বিরোধিতা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোর প্রতি প্রতিক্রিয়া- একটি ব্যবস্থার মূল্যায়ন, যা বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই শুধু বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নির্ভর করবে না; বরং রক্ত, নীরবতা এবং স্মৃতিতে গঠিত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করবে, যা আগামী প্রজন্মের রাষ্ট্রচিন্তা ও নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করবে। ভারতের চানক্য কৌশলের কাছে অবনত না হয়ে আমাদের দেশের স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দিয়ে সরকারের সামনে এগোতে হবে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক



