রাষ্ট্র কেন দুর্নীতিতে ডুবে যায়, মুক্তির পথ কী

রাষ্ট্রকে ন্যায্যভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে শুধু সৎ মানুষের প্রার্থনা যথেষ্ট নয়; নীতিনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। এমন প্রতিষ্ঠান যা ক্ষমতাবানকে ভয় পাবে না। এমন আইন যা গরিব-ধনী সবার ওপর সমানভাবে প্রয়োগ হবে। এমন সমাজ যেখানে দুর্নীতিবাজকে সফল নয়, লজ্জার মানুষ হিসেবে দেখা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুক্তি তাই কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। একটি সামাজিক অঙ্গীকার। একটি নৈতিক সংগ্রাম। প্রশ্ন হলো— আমরা কি শুধু দুর্নীতিকে ঘৃণা করব, নাকি দুর্নীতির সুবিধা নেয়ার সংস্কৃতিকেও প্রত্যাখ্যান করব? যে দিন নাগরিক, রাজনীতি ও রাষ্ট্র— তিন জায়গা থেকে এ প্রত্যাখ্যান শুরু হবে, সে দিন থেকে মুক্তির পথ খুলতে শুরু করবে

দুর্নীতি আমাদের সমাজে আজ মরণব্যাধি হয়ে ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। কিভাবে সবখানে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে, সে সম্পর্কে তত্ত্ব-তালাশ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভোটের সংস্কৃতি, ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি, দুর্বল বিচারব্যবস্থা, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, আইনের শাসন, সাধারণ মানুষের মানসিকতা এবং সবশেষে, বেরিয়ে আসার বাস্তব পথ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

তিনটি বিশ্বসংস্থা কী বলে
বিশ্বব্যাংক বলে, একটি দেশে শাসন মানে— ক্ষমতা কিভাবে ব্যবহার হয়। সরকার কিভাবে বেছে নেয়া হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করে কি না, এই তিনটি বিষয়ের সমষ্টি।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর একটি থিংক ট্যাংক ও নীতি পরামর্শ সংস্থা ওইসিডি বলে— দুর্নীতি মানে শুধু ঘুষ নয়; এটি একটি গভীর সমস্যা যা মানুষের বিশ্বাস, জবাবদিহি, গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক ন্যায্যতাকে ধ্বংস করে দেয়।

ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপের মতে— স্বচ্ছতা হলো সরকারি তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে খোলামেলা, সময়মতো এবং বোধগম্যভাবে পৌঁছানো— এটিই জবাবদিহির শুরু।

এ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে— বাংলাদেশে যারা ক্ষমতায় আছেন বা আসতে চান, তাদের মধ্যে কতজন এ বিষয়গুলো নিয়ে সত্যিকার অর্থে ভাবেন?

দুর্নীতি কিভাবে একটি রাষ্ট্রে শিকড় গাড়ে
দুর্নীতি কোনো রাষ্ট্রে হঠাৎ করে জন্ম নেয় না। এটি এক দিনে তৈরি হওয়া কোনো রোগও নয়; বরং দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক অভ্যাস, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, বিচারহীনতা, নাগরিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মধ্য দিয়ে দুর্নীতি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের শরীরে ঢুকে পড়ে। একসময় দেখা যায়, দুর্নীতি আর ব্যতিক্রম থাকে না— হয়ে ওঠে নিয়ম। তখন সৎ মানুষ দুর্বল হয়ে পড়েন। অসৎ ব্যক্তিরা শক্তিশালী হয়। সাধারণ নাগরিক ন্যায়বিচার পাওয়ার বদলে ক্ষমতাবানের দরজায় ঘুরতে বাধ্য হন।

দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার দুর্বল হয়। যোগ্যতা অপমানিত হয়। প্রশাসন দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হয়। ব্যবসাবাণিজ্যে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। আর রাষ্ট্রের প্রতি জনআস্থা নষ্ট হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত নাগরিকরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন— আইন সবার জন্য সমান নয়; যার ক্ষমতা আছে তার জন্য এক, আর ক্ষমতাহীনের জন্য আরেক আইন।

দোষ কি শুধু ব্যক্তির, নাকি পুরো ব্যবস্থার
আমরা অনেকসময় দুর্নীতির আলোচনা করতে গিয়ে কয়েকজন দুর্নীতিবাজ নেতা বা কর্মকর্তার কথা বলি। অবশ্যই ব্যক্তি দায়ী। কিন্তু শুধু ব্যক্তি বদলালে দুর্নীতি কমে না, যদি সেই ব্যক্তিকে দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া ব্যবস্থাটি অক্ষত থাকে।

একটি রাষ্ট্র তখনই গভীরভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, যখন ক্ষমতাসীনদের ওপর আদালত, সংসদ, নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অর্থাৎ— কেউ ক্ষমতায় গিয়ে জানেন যে, অন্যায় করলেও বিচার হবে না, প্রশাসন তাকে ঠেকাবে না, আদালত স্বাধীনভাবে দাঁড়াবে না। আসলে দুর্নীতি শুধু ঘুষ নেয়া বা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা নয়। ক্ষমতাকে নিজের লাভে ব্যবহার করা। নিজের লোককে চাকরি দেয়া। নিজের গোষ্ঠীকে সরকারি প্রকল্পে সুবিধা দেয়া। আইনকে নিজের ইচ্ছামতো প্রয়োগ করা— এসব দুর্নীতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

ভোটের সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত স্বার্থের রাজনীতি
গণতন্ত্রে ভোট হওয়ার কথা নীতি, আদর্শ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে। কিন্তু যেখানে রাজনৈতিক সংস্কৃতি দুর্বল, সেখানে ভোট অনেকসময় নীতি দিয়ে নয়, ব্যক্তিগত লাভের প্রত্যাশায় নির্ধারিত হয়। এমনকি একজন প্রার্থী দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ বা ক্ষমতার অপব্যবহারকারী— এ কথা জেনেও অনেকে তাকে ভোট দেন। কেন দেন? কারণ ভোটারের মনে তখন একটি বাস্তব কিন্তু বিপজ্জনক হিসাব কাজ করে। তিনি ভাবেন, ‘সৎ মানুষ নিয়ম মেনে চলবেন; তাকে দিয়ে অন্যায় সুপারিশ করানো যাবে না। কিন্তু অসৎ ও প্রভাবশালী মানুষ নিয়ম ভাঙতে অভ্যস্ত; তাকে দিয়ে চাকরি, বদলি, মামলা, জমি, টেন্ডার, লাইসেন্স বা প্রশাসনিক সুবিধা বাগিয়ে নেয়া সহজ হবে।’ অর্থাৎ— ভোটার দুর্নীতিবাজকে শুধু সহ্য করছেন না; অনেকসময় নিজের সম্ভাব্য সুবিধায় তাকে দরকারি মানুষ হিসেবেও দেখছেন। এখানে সবচেয়ে বড় বিপদ— দুর্নীতি তখন শুধু নেতার মধ্যে নয়, ভোটারের প্রত্যাশা, হিসাব-নিকাশ ও রাজনৈতিক পছন্দের মধ্যেও ঢুকে পড়ে। তখন রাজনীতি হয়ে ওঠে সুবিধা বণ্টনের বাজার। যে প্রার্থী বেশি সুবিধা দিতে পারবেন, যিনি প্রশাসন ও আদালতকে নিজের পক্ষে টানতে পারবেন, তিনি বেশি গ্রহণযোগ্য।

তবে মানুষকে পুরোপুরি দোষ দেয়া যায় না। অনেকসময় রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পথগুলো বন্ধ হলে মানুষকে অনৈতিক পথ খুঁজতে হয়। যদি ন্যায্য কাজও ঘুষ ছাড়া না হয়, যদি আইনি অধিকারও সুপারিশ ছাড়া না মেলে— তাহলে মানুষ একসময় ভাবেন, নিয়ম মেনে কিছু পাওয়া যাবে না। এভাবে দুর্নীতি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে ঢুকে পড়ে।

যখন বিচার ও প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে
একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড তার বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্থা, গণমাধ্যম ইত্যাদি। রাষ্ট্র তখনই সুস্থ থাকে, যখন এসব প্রতিষ্ঠান কোনো দলের নয়; বরং সংবিধান ও আইনের অধীনে কাজ করে। দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে এর উল্টোটা ঘটে। বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়। পুলিশ আইন রক্ষার বদলে ক্ষমতা রক্ষার যন্ত্র হয়। দুর্নীতি দমন সংস্থা বিরোধী দমনের অস্ত্র হয়ে যায়। তখন দুর্নীতিবাজকে ধরার দায়িত্ব যাদের, তারাই যদি দুর্নীতিবাজের নিয়ন্ত্রণে থাকেন— বিচার হবে কিভাবে? কাগজে আইনের শাসন থাকে। বাস্তবে চলে প্রভাবের শাসন।

পশ্চিমা দেশে দুর্নীতি নেই, এ কথা ঠিক নয়। পার্থক্য হলো— সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে শক্ত। ক্ষমতাসীনরা আদালতকে সহজে ফোন করে রায় বদলাতে পারেন না। গণমাধ্যম প্রশ্ন করে, সংসদীয় কমিটি তদন্ত করে, আদালত স্বাধীনভাবে রায় দেয়। এ কারণে সেসব দেশে দুর্নীতির সুযোগ কম।

ক্ষমতা যখন এক হাতে— বিপদ তখন বেশি
দুর্নীতির আরেক বড় কারণ, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ। যখন সব সিদ্ধান্ত এক ব্যক্তি, এক পরিবার বা এক দলের হাতে চলে যায়, তখন জবাবদিহি থাকে না।

গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য শুধু নির্বাচন নয়— ক্ষমতার বিভাজন। সংসদ সরকারকে প্রশ্ন করবে। আদালত সংবিধান রক্ষা এবং ন্যায়বিচার করবে। গণমাধ্যম সত্য প্রকাশ করবে। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠান যদি এক কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের ভেতর ভারসাম্য থাকে না।

ভয়ের রাজনীতিও দুর্নীতি টিকিয়ে রাখে। সরকারি কর্মচারী যদি সত্য বললে বদলির ভয় পান, সাংবাদিক যদি রিপোর্ট করলে মামলার ভয় পান, বিচারক যদি স্বাধীন রায় দিতে ভয় পান— তাহলে সত্য হারিয়ে যায়। যেখানে সত্য বলা যায় না, সেখানে দুর্নীতি অন্ধকারে নয়, প্রকাশ্যে বেড়ে ওঠে।

শুধু আইন করলে কি হবে
দুর্নীতি দমনে আইন দরকার; তবে শুধু আইনই যথেষ্ট নয়। অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে দুর্নীতি দমন আইন আছে, কমিশন আছে, শাস্তির বিধান আছে; বাস্তবে সেগুলো কাজ করে না। কারণ আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান স্বাধীন ও নৈতিকভাবে শক্তিশালী।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি বড় ভুল হলো শুধু শাস্তির ওপর নির্ভর করা। কয়েকজনকে শাস্তি দিলেও যদি দুর্নীতির সুযোগ অক্ষত থাকে, নতুন দুর্নীতিবাজ তৈরি হবে। তাই প্রয়োজন— সুযোগ কমানো। স্বচ্ছতা বাড়ানো। সিদ্ধান্ত গ্রহণকে নথিভুক্ত করা। সরকারি ব্যয় জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা। নিয়োগ ও টেন্ডার ব্যবস্থায় প্রযুক্তি ও স্বাধীন নজরদারি আনা। সেই সাথে যে ব্যক্তি দুর্নীতির অভিযোগ করেন তাকে সুরক্ষা দেয়া।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে আসল লড়াই হলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে সৎ থাকা লাভজনক। অসৎ হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক দুর্বল রাষ্ট্রে উল্টোটা ঘটে— সৎ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন, অসৎ ব্যক্তি পুরস্কৃত হন।

মুক্তির পথ কি আছে
মুক্তির পথ অবশ্যই আছে। তা সহজ নয়। দ্রুতও নয়। শুধু একজন নেতা বা একটি দলের ওপর নির্ভরশীলও নয়। এর জন্য রাষ্ট্রীয় সংস্কার যেমন প্রয়োজন, তেমনি নাগরিক সংস্কৃতির পরিবর্তনও দরকার।

প্রথমত, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। বিচারক নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি— এসব প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। এক কথায়, প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা সরাতে হবে। আদালত যদি ক্ষমতার বাইরে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে কোনো দুর্নীতিবাজই সত্যিকারের ভয় পাবে না।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচনব্যবস্থা বিশ্বাসযোগ্য করা। ভোটে যদি জনগণের স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিফলন না হয়, তাহলে রাষ্ট্রে জবাবদিহি থাকে না। নির্বাচনী অর্থায়ন, প্রার্থী মনোনয়ন, ভোট গ্রহণ— সবকিছুতে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা দরকার।

তৃতীয়ত, প্রশাসন ও পুলিশকে দলীয় প্রভাব থেকে বের করা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কোনো দলের কর্মী নয়, রাষ্ট্রের কর্মচারী হিসেবে কাজ করতে হবে। বদলি, পদোন্নতি, নিয়োগ— এসব যদি যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে না হয়, তাহলে প্রশাসন দুর্নীতির কেন্দ্র হয়ে থাকবে।

চতুর্থত, সরকারি ব্যয় ও সিদ্ধান্তকে জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা। বড় প্রকল্প, টেন্ডার, ঋণ, করছাড়— এসব বিষয়ে তথ্য সহজে পাওয়া না গেলে দুর্নীতি লুকিয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় অর্থ জনগণের; তাই নাগরিকদের জানার অধিকার আছে সেই টাকা কোথায় কিভাবে খরচ হচ্ছে।

পঞ্চমত, রাজনৈতিক দলের ভেতর গণতন্ত্র আনা। মনোনয়ন যদি অর্থ, আত্মীয়তা বা পেশিশক্তির ভিত্তিতে হয়, তাহলে সৎ ও যোগ্যরা রাজনীতিতে আসতে ভয় পাবেন। দলের ভেতরে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা ছাড়া রাজনীতি শুদ্ধ হবে না।

ষষ্ঠত, নাগরিকদের ভোটের ধারণা বদলানো। ভোট মানে ব্যক্তিগত সুবিধা নয়; ভোট রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ। যে ভোটার দুর্নীতিবাজকে জেনেও ভোট দেন, তিনি সাধারণত ভাবেন— ‘প্রার্থী অসৎ, কিন্তু আমার কাজে লাগবে।’ এ চিন্তা বিপজ্জনক। এতে ভোটার নীতিকে নয়, প্রভাবকে মূল্য দেন; যোগ্যতা নয়, সুপারিশের ক্ষমতাকে আমলে নেন; আইনের শাসন নয়, ব্যক্তিগত সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেন। কিন্তু আজ যে দুর্নীতিবাজ আমার ছোট কাজটি করে দেবে, কাল সেই একই ব্যক্তি রাষ্ট্রের বড় ক্ষতি করবে। বিচারব্যবস্থা দুর্বল করবে। প্রশাসন দলীয়করণ করবে। এ ছাড়া আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দেবে। তাই দুর্নীতিবাজকে ভোট দেয়া শুধু একজন খারাপ মানুষকে নির্বাচিত করা নয়; এটি অন্যায় ব্যবস্থাকে নিজের হাতে শক্তিশালী করা।

সপ্তমত, নাগরিক শিক্ষা দরকার— রাষ্ট্র কী। অধিকার কী। দায়িত্ব কী। করের টাকা কিভাবে জনগণের সম্পদ। আইন সবার জন্য সমান হওয়া কেন জরুরি— এসব বিষয় পরিবার, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম ও সমাজে আলোচিত হতে হবে। দুর্নীতিকে চালাকি, প্রভাবকে যোগ্যতা, অন্যায় সুবিধাকে সফলতা— এ সংস্কৃতি ভাঙতে হবে।

আশার জায়গা কোথায়?
অনেকে বলেন, দুর্নীতি এত গভীরে ঢুকে গেছে যে, মুক্তির উপায় নেই। এই হতাশা বোঝা যায়; কিন্তু তা পুরো সত্য নয়। ইতিহাসে অনেক দেশ দুর্বল প্রতিষ্ঠান, সামরিক শাসন, দলীয় দখল— এসবের মধ্য থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়েছে। রাতারাতি বদলায়নি; কিন্তু নাগরিক চাপ, রাজনৈতিক সংস্কার, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও ধারাবাহিক জবাবদিহির মাধ্যমে পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশে একটি সুযোগ এসেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। এসব নিয়ে একধরনের ঐকমত্যও হয়েছিল। জুলাই সনদে সবাই স্বাক্ষর করেছিলেন; কিন্তু সেগুলো রাজনৈতিক সরকারের হাতে ছেড়ে দেয়ায় সেটি এখন অঘোষিত হিমগারে চলে গেছে।

আশার জায়গা হলো— মানুষ ন্যায়-অন্যায় বুঝতে পারেন। ন্যায়বিচার চান। সাধারণ নাগরিক চান তার সন্তান যোগ্যতায় চাকরি পাক। আদালতে গিয়ে বিচার পাক। হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পাক। থানায় গিয়ে নিরাপত্তা পাক। এই আকাঙ্ক্ষাই পরিবর্তনের ভিত্তি। কিন্তু এ আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে হবে। শুধু আড্ডায় ক্ষোভ প্রকাশ করলে হবে না— ভোটে, সংগঠনে, নাগরিক দাবিতে, গণমাধ্যমে, আদালতে; সব জায়গায় জবাবদিহির দাবি তুলতে হবে। বলতে হবে— দেশ কারো বাপ-দাদার সম্পত্তি নয়। ক্ষমতা কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র জনগণের।

শেষ কথা
একটি রাষ্ট্র দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে যখন ক্ষমতা জবাবদিহির বাইরে চলে যায়। প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় নিয়ন্ত্রণে পড়ে। বিচারব্যবস্থা স্বাধীনতা হারায়। রাজনীতি সুবিধাবণ্টনের যন্ত্র হয়ে ওঠে। আর নাগরিক নিজেও অন্যায় ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হতে শুরু করে।

মুক্তির পথ শুরু হবে সত্য স্বীকারের মধ্য দিয়ে। দুর্নীতিবাজ নেতা যেমন সমস্যা তেমনি দুর্নীতির সুবিধা নিতে চাওয়া নাগরিক মনোবৃত্তিও সমস্যা। দুর্বল বিচারব্যবস্থা সমস্যা, দলীয় প্রশাসন সমস্যা, অস্বচ্ছ নির্বাচন সমস্যা এবং নৈতিক আপসও সমস্যা।

রাষ্ট্রকে ন্যায্যভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে শুধু সৎ মানুষের প্রার্থনা যথেষ্ট নয়; নীতিনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। এমন প্রতিষ্ঠান যা ক্ষমতাবানকে ভয় পাবে না। এমন আইন যা গরিব-ধনী সবার ওপর সমানভাবে প্রয়োগ হবে। এমন সমাজ যেখানে দুর্নীতিবাজকে সফল নয়, লজ্জার মানুষ হিসেবে দেখা হবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুক্তি তাই কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। একটি সামাজিক অঙ্গীকার। একটি নৈতিক সংগ্রাম। প্রশ্ন হলো— আমরা কি শুধু দুর্নীতিকে ঘৃণা করব, নাকি দুর্নীতির সুবিধা নেয়ার সংস্কৃতিকেও প্রত্যাখ্যান করব? যে দিন নাগরিক, রাজনীতি ও রাষ্ট্র— তিন জায়গা থেকে এ প্রত্যাখ্যান শুরু হবে, সে দিন থেকে মুক্তির পথ খুলতে শুরু করবে।

লেখক : কানাডা প্রবাসী রাজনৈতিক বিশ্লেষক