রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধ্রুপদি ও সমকালীন তত্ত্বে আধুনিক রাষ্ট্রকে কেবল ভূখণ্ড ও জনসংখ্যার সমষ্টি হিসেবে নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা-ব্যবস্থা (রহংঃরঃঁঃরড়হধষ ঢ়ড়বিৎ ংঃৎঁপঃঁৎব) হিসেবে দেখা হয়, যেখানে আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের ‘অপারেশনাল আর্ম’ (ড়ঢ়বৎধঃরড়হধষ ধৎস) হিসেবে কাজ করে। ম্যাক্স ওয়েবারের মতে, আধুনিক রাষ্ট্রের বৈধতা নির্ভর করে একটি পেশাদার, যুক্তিনির্ভর ও নিয়মভিত্তিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে ধারাবাহিক প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। একইভাবে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা রাষ্ট্রের বিশ্লেষণ করেছেন তার স্টেট ক্যাপাসিটি (ংঃধঃব পধঢ়ধপরঃু) ও ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটির ভিত্তিতে। তার মতে, শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের মূল শর্ত হলো দক্ষ ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র।
কিন্তু উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে এই আদর্শিক কাঠামো প্রায়শই রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হয়। সেখানে আমলাতন্ত্র কেবল নীতিনিরপেক্ষ প্রশাসনিক যন্ত্র হিসেবে থাকে না; বরং ক্ষমতা, প্রভাব এবং প্রতিযোগিতার একটি কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। পিয়ের বুর্দিওর ভাষায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাহ্যিকভাবে নিরপেক্ষ হলেও বাস্তবে তারা ‘প্রতীকী ক্ষমতার’ (ংুসনড়ষরপ ঢ়ড়বিৎ) পুনরুৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে নিয়োগব্যবস্থা, বিশেষ করে উচ্চতর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার মতো প্রক্রিয়া, কেবল মেধা যাচাইয়ের কাঠামো নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বণ্টনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। ফলে এখানে ন্যায়বিচার (লঁংঃরপব), স্বচ্ছতা (ঃৎধহংঢ়ধৎবহপু) এবং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা (রহংঃরঃঁঃরড়হধষ ঃৎঁংঃ) Ñএই তিনটি উপাদান রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের ধারায় বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) একটি মৌলিক প্রতিষ্ঠান, যা কেবল প্রশাসনিক নিয়োগব্যবস্থা নয়; বরং রাষ্ট্রক্ষমতার প্রয়োগ, নীতি বাস্তবায়ন এবং শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতার কেন্দ্রবিন্দু। ঔপনিবেশিক আমলের ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে গড়ে ওঠা এই কাঠামো পাকিস্তান আমলে সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিসেস (সিএসএস) এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়। ১৯৭৫ সালের সার্ভিস (রি-অর্গানাইজেশন অ্যান্ড কন্ডিশনস) অ্যাক্ট এবং ১৯৮০ সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসেস (রি-অর্গানাইজেশন) অর্ডারের মাধ্যমে বিসিএস কাঠামো পুনর্গঠিত হয়; পরবর্তীতে ১৯৯২ সালের একীভূতকরণ আদেশ প্রশাসন ও সচিবালয় সার্ভিসকে একত্র করে একটি কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ধারার সৃষ্টি করে।
তাত্ত্বিকভাবে বিসিএস একটি মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাব্যবস্থা (সবৎরঃ-নধংবফ পড়সঢ়বঃরঃরাব বীধসরহধঃরড়হ ংুংঃবস), যার তত্ত্বাবধান করে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)Ñএকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিকÑ এই তিন ধাপের মাধ্যমে প্রার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। প্রতি বিসিএসে প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ প্রার্থী অংশগ্রহণ করেন; প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন আনুমানিক ১৫-২০ হাজার, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তার অর্ধেকের মতো এবং চূড়ান্তভাবে ক্যাডার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন দেড় থেকে দুই হাজার প্রার্থী। এই কাঠামো একটি কঠোর প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার ধারণা তৈরি করলেও বাস্তবতার সাথে এর ফাঁক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন বিদ্যমান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিশেষত ২৯তম, ৩০তম ও ৩১তম বিসিএসকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলো, যেমনÑ প্রশ্নফাঁস, অযোগ্য প্রার্থীর অন্তর্ভুক্তি এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপÑ এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। একই সাথে জাতীয় সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোতে প্রশাসন ক্যাডারের অন্তত ১২ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর, ৩৯ জনকে চাকরিচ্যুতি এবং ৫৬৪ জনকে ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ভেতরে অস্বাভাবিকতার ইঙ্গিত বহন করে। এই তথ্যগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্তাধীন বলে সরকারি বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিসিএস নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা যায়, উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে প্রশাসনিক নিয়োগ প্রায়শই ‘অভিজাত পুনরুৎপাদন কৌশল’ (বষরঃব ৎবঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ সবপযধহরংস) হিসেবে কাজ করে। পিয়ের বুর্দিওর তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলো বাহ্যিকভাবে নিরপেক্ষ হলেও বাস্তবে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অভিযোগ রয়েছে যে প্রিলিমিনারি পর্যায়ে প্রশ্নফাঁস, লিখিত পরীক্ষায় অসদুপায় এবং মৌখিক পরীক্ষায় পক্ষপাতমূলক নম্বর প্রদানÑ এই তিন স্তরে আওয়ামী আমলে দুর্নীতি হয়েছে।
বিশেষ করে মৌখিক পরীক্ষার ২০০ নম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। লিখিত পরীক্ষায় ভালো ফল করেও মৌখিক পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়ার অভিযোগ বহু প্রার্থীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে। অন্য দিকে কিছু প্রার্থী অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ নম্বর পাওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। এই বৈষম্যকে অনেকে ‘স্বেচ্ছাচারী হেরফের’ (ফরংপৎবঃরড়হধৎু সধহরঢ়ঁষধঃরড়হ) হিসেবে চিহ্নিত করেন, যেখানে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে বোর্ডের স্বাধীনতা অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করে। কয়েক দিন আগে আমার দেশ পত্রিকায় এ সম্পর্কে একটি প্রামাণ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
এ ছাড়া পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রার্থীদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাজনৈতিক তথ্য যাচাইয়ের নামে অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক রিপোর্ট প্রদান করে চূড়ান্ত গেজেট থেকে নাম বাদ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএস পর্যন্ত কয়েক শ’ সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী বছরের পর বছর গেজেটবিহীন অবস্থায় ছিলেন; পরবর্তীতে তাদের মধ্যে ২৫৯ জনকে দীর্ঘ বিলম্বের পর নিয়োগ দেয়া হয়। তবে তাদের বকেয়া আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়নি, যা প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে আরো জটিল করে। এই প্রেক্ষাপটে ‘বঞ্চনা’ একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা হিসেবে সামনে আসে। এটি কেবল চাকরি না পাওয়া নয়; বরং মেধার স্বীকৃতি না পাওয়া, রাজনৈতিক কারণে বাদ পড়া, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তায় থাকাÑ এ সবের সম্মিলিত ফল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও নীতিশাস্ত্রের আলোচনায় এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘পদ্ধতিগত অবিচার’ (ঢ়ৎড়পবফঁৎধষ রহলঁংঃরপব) হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, যেখানে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। জন রলস তার ‘এ থিওরি অব জাস্টিস’-এ বলেন, ন্যায়বিচার কেবল ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় একটি ‘বিশেষ বিসিএস’ উদ্যোগকে ট্রানজিশনাল জাস্টিস (ঃৎধহংরঃরড়হধষ লঁংঃরপব) বা রূপান্তরমূলক ন্যায়বিচারের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অর্থাৎÑ অতীতের সম্ভাব্য অবিচার আংশিকভাবে সংশোধনের একটি কাঠামোগত ব্যবস্থা।
প্রথমত, বিতর্কিত বিসিএসগুলোÑ বিশেষ করে ২৯, ৩০ ও ৩১তম পুনর্মূল্যায়নের আওতায় আনা যেতে পারে। যেসব প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও মৌখিক পর্যায়ে বাদ পড়েছেন, তাদের পুনরায় ভাইভা নেয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, একটি স্বাধীন মূল্যায়ন বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন, যেখানে বিচার বিভাগ, একাডেমিয়া এবং প্রশাসনের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এতে মূল্যায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।
তৃতীয়ত, মৌখিক পরীক্ষার স্কোরিং পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। প্রতিটি নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে লিখিত যুক্তি সংরক্ষণ, প্রার্থীর জন্য সীমিত আপিলের সুযোগ এবং ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে পারে। চতুর্থত, যারা দীর্ঘদিন বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের জন্য সিনিয়রিটি সমন্বয়, প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং আংশিক ক্ষতিপূরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। দীর্ঘ ১৭ বছরে নানা কারণে মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীরা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তাদের জন্য একটি বিশেষ সুযোগ দেয়া যেতে পারে। একটি বিশেষ বিসিএস ব্যবস্থা ন্যায়কে নিশ্চিত করবে। এরশাদ আমলে এরকম একটি বিশেষ পরীক্ষা দেয়া হয়েছিল। পিএসসির ব্যবস্থাপনায় সংক্ষিপ্ত সময়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে পরীক্ষাটি হতে পারে। বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৫০ বছর এবং সর্বনিম্ন ৩২ বছর হতে পারে।
পঞ্চমত, প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার অপরিহার্য। প্রশ্নব্যাংকের নিরাপত্তা, ডিজিটাল মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং অ্যালগরিদমিক পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া চালু করা হলে মানবীয় হস্তক্ষেপের সুযোগ কমে আসবে। ইতোমধ্যে সরকার দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে, যা এই সংস্কারের একটি ইতিবাচক দিক।
ম্যাক্স ওয়েবারের আমলাতন্ত্র তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও নিয়মভিত্তিক প্রশাসন। কিন্তু যখন সেই প্রশাসন রাজনৈতিক বা আর্থিক প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের বৈধতা (ষবমরঃরসধপু) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তার ‘স্টেট-বিল্ডিং’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের জন্য কেবল ক্ষমতা নয়Ñ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য।
একটি বিশেষ বিসিএস উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কয়েকটি সম্ভাব্য সুফল অর্জিত হতে পারে। প্রথমত, প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয়ত, মেধাবী কিন্তু বঞ্চিত প্রার্থীদের পুনঃঅন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে প্রশাসনের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। তৃতীয়ত, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য আংশিকভাবে হলেও নিরসন সম্ভব হবে। চতুর্থত, ভবিষ্যতে অনিয়মের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধমূলক বার্তা যাবে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আইনি জটিলতা, বিদ্যমান ক্যাডারদের প্রতিক্রিয়া, প্রশাসনিক চাপ এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ভিন্নতাÑ এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। তবুও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিলম্ব কোনো অজুহাত হতে পারে না।
অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, ‘ন্যায়বিচার হলো সমানদের সাথে সমান এবং অসমদের সাথে অসম আচরণ করা।’ অর্থাৎ যাদের পরিস্থিতি ভিন্ন, তাদের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণই প্রকৃত ন্যায়বিচার। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বঞ্চিত প্রার্থীদের জন্য একটি বিশেষ বিসিএস উদ্যোগ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।
বাংলাদেশ আজ যে উন্নয়ন ও রাষ্ট্রগঠনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও মেধাভিত্তিক প্রশাসন অপরিহার্য। অতীতের ভুল স্বীকার করে তা সংশোধনের সাহস দেখাতে পারলেই কেবল ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের দীর্ঘদিনের আন্দোলন, ক্ষোভ ও আকাক্সক্ষার সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক পর্বের সূচনা ঘটেছে। এই পরিবর্তনকে অনেকে একটি গণ-আকাক্সক্ষাভিত্তিক রূপান্তর (ঢ়ড়ঢ়ঁষধৎ ফবসড়পৎধঃরপ ঃৎধহংরঃরড়হ) হিসেবে বিবেচনা করেন, যেখানে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রত্যাশা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের মতো মৌলিক প্রতিষ্ঠানকে পুনর্মূল্যায়নের দাবি আরো জোরালো হয়েছে।
জনসাধারণের প্রত্যাশা হলো, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি মেধাভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠবে, যেখানে অতীতের অনিয়ম, বৈষম্য ও বঞ্চনার অভিজ্ঞতাগুলোকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি সংশোধনমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করা হবে। এই প্রত্যাশা কেবল প্রশাসনিক সংস্কারের নয়; বরং এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার পুনর্গঠনের একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবি।
এই প্রেক্ষাপটে জনগণের একটি অংশ বিশ্বাস করে, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রচিন্তা ও প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বর্তমান সরকার যদি প্রশাসনিক ন্যায়বিচার, মেধার মূল্যায়ন এবং প্রতিষ্ঠানগত স্বচ্ছতার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে, তবে তা একটি টেকসই রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হবে।
অতএব, জনগণের প্রত্যাশা হলো, বর্তমান রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অতীতের বিভাজনমূলক প্রশাসনিক অনুশীলন থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী প্রশাসনিক সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে। এতে করে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যা একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য শর্ত।
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



