মুসলিমরা প্রায়ই নিজেদের অবক্ষয়ের জন্য প্রতিপক্ষকে দায়ী করি। কিন্তু নিজেরাই কিভাবে নিজেদের প্রতিপক্ষে পরিণত হই, তা খেয়াল করি না। প্রতিপক্ষ তাদেরকেই বিধ্বস্ত করে, যারা নিজেদের মধ্যে বহন করে আত্মঘাতী উপাদান। মুসলিমদের আত্মঘাতী উপাদান হলো আখলাকি সঙ্কট।
আখলাকি অবক্ষয় কোনো একক ঘটনা নয়। এটি সমাজের চিন্তা, ভাষা, মূল্যবোধ এবং আচরণের ভেতরে ছড়িয়ে পড়া এক গভীর সাংস্কৃতিক ও মানসিক দূষণ। একে কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতার সমস্যা ভাবলে ভুল হবে; এ দূষণ পুরো সভ্যতার মূল্যবোধ কাঠামোর ভাঙনের ফল। এই ভাঙন কয়েকটি সুস্পষ্ট স্তরে দৃশ্যমান।
প্রথম স্তর হলো সত্যের অবমূল্যায়ন। একটি সুস্থ নৈতিক সমাজে সত্য কেবল তথ্য নয়। সত্য একটি মূল্যবোধ, একটি প্রতিশ্রুতি এবং একটি নৈতিক দায়। সত্য বলা সেখানে সাহস, সততা এবং আত্মিক দৃঢ়তার প্রতীক। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সত্যের এই ঔৎকর্ষ ক্ষয়ে গেছে। এখন মিথ্যাকে কৌশল (strategy) মনে করা হয়। মনে করা হয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী সত্যকে আড়াল করা বা বিকৃত করাই বুদ্ধিমত্তা। ফলে সত্য আর নৈতিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে থাকে না; সত্য হয়ে ওঠে পরিস্থিতিনির্ভর বিকল্প। এই পরিবর্তন সমাজের আস্থা কাঠামো ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়। কারণ যেখানে সত্য আর নির্ভরযোগ্য নয়, সেখানে আখলাকও স্থায়ী হতে পারে না।
দ্বিতীয় স্তর হলো স্বার্থপরতার আধিপত্য। আধুনিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে কায়েম হয়েছে আমি (self)। ব্যক্তি তার চিন্তা, সিদ্ধান্ত এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নিজেকেই চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেছে। এর ফলে সমষ্টিগত কল্যাণ গুরুত্ব হারিয়েছে। সমাজ, পরিবার এবং উম্মাহভিত্তিক নৈতিক কাঠামোর জায়গায় এখন ব্যক্তিগত সুবিধা, নিরাপত্তা এবং উন্নতি হয়ে উঠেছে মূল বিষয়। এই পরিবর্তনের ফলে সামাজিক সম্পর্কগুলো সহযোগিতার ভিত্তি থেকে সরতে থাকে, সে দাঁড়ায় প্রতিযোগিতার ভিত্তির ওপর।
তৃতীয় স্তর হলো নৈতিকতার আপেক্ষিকতা। এটি আধুনিক আখলাকি সঙ্কটের একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গভীর রূপ। এখানে কোনো স্থায়ী নৈতিক মানদণ্ড আর স্বীকার করা হয় না। সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, সব কিছুই পরিস্থিতি, সংস্কৃতি বা ব্যক্তিগত পছন্দের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে নৈতিকতা তার সর্বজনীনতা হারায়। ফলে নৈতিকতার কোনো দৃঢ় ভিত্তি থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি আপেক্ষিক ধারণা। এর ফলে স্থায়ী মানদণ্ড না থাকলে সঠিক ও ভুলের পার্থক্যও ঝাপসা হয়ে যায়।
চতুর্থ স্তর হলো ক্ষমতা ও অর্থের পূজা। আধুনিক সমাজে একটি নতুন মূল্যবোধ কাঠামো গড়ে উঠেছে, যেখানে সফলতা নৈতিকতার চেয়ে বড়। আগে সফলতা নৈতিকতার অধীন ছিল। অর্থাৎ, সফল হতে হলে ন্যায়, সততা ও দায়িত্ববোধ বজায় রাখতে হতো। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রে নৈতিকতা সফলতার অধীন হয়ে গেছে। অর্থ, ক্ষমতা ও সামাজিক প্রভাবকে সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়। ফলে মানুষ এমন এক মানসিকতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যেখানে নৈতিক প্রশ্ন নয়; বরং কার্যকারিতা ও ফলাফলই চূড়ান্ত বিবেচ্য বিষয়। ফলে নৈতিকতা তার অবস্থান হারায়।
এখানে সত্যের অবমূল্যায়ন সমাজের জ্ঞানগত ভিত্তি দুর্বল করছে। যা সমাজকে নৈতিকভাবে বিভ্রান্ত ও আত্মিকভাবে মুমূর্ষু অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে।
এমন বহু উপাদান আছে, যেগুলো এক হয়ে আখলাকি সঙ্কট অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। একদিকে সভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়, অন্যদিকে কিছু মৌলিক কাঠামোগত কারণ তাকে পূর্ণাঙ্গ সভ্যতার সঙ্কটে পরিণত করে। ব্যাপারটি কয়েক দিক থেকে খোলাসা করা যেতে পারে।
প্রথমত, রুহানি শূন্যতা। এটি আখলাকি পতনের সবচেয়ে গভীর কারণ। মানুষের নৈতিকতা কেবল সামাজিক নিয়ম বা আইনের উপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং এর একটি অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক ভিত্তি থাকে, যা মানুষকে উচ্চতর মূল্যবোধের সাথে যুক্ত করে। ইসলামী সভ্যতার ক্ষেত্রে এই ভিত্তি হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক। এটি এক জীবন্ত, সচেতন ও প্রভাবশালী সম্পর্ক, যা মানুষের চিন্তা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এই সম্পর্ক যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন নৈতিকতা তার অন্তর্নিহিত শক্তি হারায়। মানুষ তখন আর কোনো গায়েবি কর্তৃত্বের সামনে নিজেকে দায়বদ্ধ মনে করে না। এই রুহানি শূন্যতাই নৈতিকতার ভিত ধসিয়ে দেয়।
দ্বিতীয়ত, জ্ঞান ও আমলের বিচ্ছেদ আখলাকি সঙ্কট আরো গভীর করে। জ্ঞান নিজে কখনো সভ্যতা পয়দা করে না, যদি তা জীবন্ত বাস্তবতায় রূপান্তরিত না হয়। একটি জীবন্ত সভ্যতায় জ্ঞান কেবল পাঠ্য বা তথ্য নয়। সেখানে জ্ঞান একটি সক্রিয় শক্তি, যা মানুষের আচরণ, চরিত্র এবং সামাজিক কাঠামোকে রূপ দেয়। কিন্তু যখন ইলিম ও আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন জ্ঞান তার কার্যকারিতা হারায়। ফলে জ্ঞান নিছক আনুষ্ঠানিক ও নিষ্ক্রিয় কাঠামোতে পরিণত হয়, যা আচরণ বদলায় না। এই বিচ্ছিন্নতা সমাজে এক ধরনের দ্বৈধতা সৃষ্টি করে। মানুষ জানে কোনটি সঠিক; কিন্তু করে সেটিই, যেটি সুবিধাজনক। এই দ্বৈধতাই নৈতিকতার ভেতরকার সত্যনিষ্ঠা বরবাদ করে দেয়।
তৃতীয়ত, পশ্চিমা বস্তুবাদী চিন্তার প্রভাব আখলাকি সঙ্কট আরো জটিল করে। পশ্চিমা সভ্যতায় মানুষকে মূলত ভোগকারী সত্তা হিসেবে দেখা হয়। এই চিন্তাধারা যখন অন্য সমাজে প্রবেশ করে, তখন তা সেই সমাজের মানুষের মূল্যবোধ পাল্টে দেয়। তারাও মনে করতে থাকে সফলতা মানে ভোগ, ক্ষমতা এবং আরাম। এই প্রভাবের ফলে মানুষের আকাক্সক্ষা সীমাহীন এবং নৈতিক সংযম দুর্বল হয়ে পড়ে।
চতুর্থত, আদর্শ ব্যক্তিত্বের সঙ্কট আখলাকি অবক্ষয়ের দৃশ্যমান ও বাস্তব দিক। একটি সভ্যতা তখনই নৈতিকভাবে মজবুত থাকে, যখন সেখানে ধারাবাহিকভাবে এমন ব্যক্তিত্ব তৈরি হয় যারা কেবল ইলিমওয়ালা নয়, বরং চরিত্রবান, দায়িত্বশীল এবং নৈতিকভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক। এই ধরনের ব্যক্তিত্ব সমাজে রোল মডেল হিসেবে কাজ করে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে দিকনির্দেশনা দেয়। কিন্তু যখন এই ধরনের আদর্শ ব্যক্তিত্বের অভাব দেখা দেয়, তখন সমাজে নৈতিক অনুপ্রেরণার শূন্যতা সৃষ্টি হয়।
কোনো সভ্যতা কেবল স্থাপত্য, অর্থনীতি বা রাজনৈতিক কাঠামোর উপর টিকে থাকে না; বরং তার প্রকৃত অস্তিত্ব নির্ভর করে এমন সব ‘মানুষ’-এর উপর যে মানুষ নিজেকে একটি ঐতিহাসিক ও নৈতিক মিশনের ধারক হিসেবে উপলব্ধি করে। কিন্তু যখন এই মিশনচেতনা বিলুপ্ত হতে থাকে, তখনই জন্ম নেয় এক বিশেষ মানব-অবস্থা। যাকে তাত্ত্বিকভাবে বলা যায় সভ্যতা-উত্তর মানব।
এই মানব-অবস্থার প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো- ঐতিহাসিক মিশনের অবক্ষয়। একটি জীবন্ত সভ্যতায় মানুষ সবসময় একটি বড় নজরিয়া বা ধারণা-দৃষ্টিভঙ্গির ধারক থাকে। এটি তাকে ব্যক্তিগত জীবনসীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশ করে তোলে। এই ধারণা মানুষকে দায়িত্বশীল করে, তাকে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে, তাকে একটি নির্দিষ্ট নৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। কিন্তু যখন এই ধারণা বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন মানুষ তার ঐতিহাসিক ভূমিকা ভুলে যায়। সে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে ব্যক্তিগত চাহিদা ও নিরাপত্তার মধ্যে। এ অবস্থায় সে নির্মাতা হতে পারে না; বরং ভোক্তায় পরিণত হয়।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো- চিন্তার সৃজনশীলতার অবসান। একটি প্রাণবন্ত সভ্যতা সর্বদা নতুন চিন্তা উৎপাদন করে। সে গঠন করে নতুন ব্যাখ্যা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু সভ্যতা-উত্তর মানবের ক্ষেত্রে চিন্তা আর সৃষ্টিশীল শক্তি হিসেবে কাজ করে না; বরং তা হয়ে ওঠে সংরক্ষণ ও পুনরাবৃত্তির মাধ্যম। তার মধ্যে আর সমাজ রূপান্তরের শক্তি থাকে না। এ অবস্থায় বৌদ্ধিক জীবন বাহ্যিকভাবে সক্রিয় মনে হলেও তা কোনো অগ্রগতি নিশ্চিত করে না।
তৃতীয়ত, এই মানব-অবস্থার সবচেয়ে গভীর সঙ্কট হলো নৈতিক শক্তির পতন। নৈতিকতা সভ্যতার চালিকাশক্তি, যা সামাজিক আস্থা, দায়িত্ববোধ এবং সামষ্টিক চেতনার ভিত্তি তৈরি করে। যখন এই নৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে যায়, তখন মানুষ তার আচরণের কেন্দ্র হিসেবে উচ্চতর মূল্যবোধের বদলে ব্যক্তিগত স্বার্থকে গ্রহণ করে। এর ফলে সমাজে আস্থা ভেঙে পড়ে, দায়িত্ববোধ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং সমষ্টিগত লক্ষ্য বিলুপ্ত হয়ে যায়।
মুসলিম সভ্যতা তার ইসলামী চরিত্র থেকে যে বৌদ্ধিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উদ্দীপনা লাভ করে, আধুনিক আমলে সেই উদ্দীপনা অবক্ষয়কবলিত। ইসলামী সভ্যতায় জীবনের কেন্দ্র হলেন আল্লাহ। আল্লাহর হেদায়েত এখানে মানুষের চিন্তা, নৈতিকতা এবং সামাজিক কাঠামোকে অর্থ প্রদান করে। এই কেন্দ্রিকতা মানুষের জীবনে একটি ঊর্ধ্বমুখী দিক তৈরি করে। যেখানে প্রতিটি কাজ কেবল পার্থিব ফলের জন্য নয়; বরং একটি বৃহত্তর আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যের জন্য পরিচালিত হতো।
কিন্তু আখলাকি সঙ্কটের ফলে এই কেন্দ্র ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হয়। আল্লাহর স্থানে মানুষের আত্মসত্তা কেন্দ্র হয়ে ওঠে। জীবন আবর্তিত হতে থাকে আত্মকেন্দ্রিক চাহিদা ও ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির চারপাশে। এর ফলে নৈতিকতা তার অতীন্দ্রিয় ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ, নৈতিকতা আর কোনো চূড়ান্ত সত্য বা খোদায়ি নির্দেশনার সাথে যুক্ত থাকে না। সে হয়ে যায় আপেক্ষিক, পরিস্থিতিনির্ভর এবং ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার বিষয়।
আমরা আখলাকি সঙ্কটকে যেভাবে দেখছি, তা সভ্যতার গভীর অসুস্থতার সাথে যুক্ত। তাই এর উত্তরণও কোনো একক পদক্ষেপে সম্ভব নয়। এটি একটি ধীর, গভীর এবং বহুমাত্রিক পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া। যেখানে মানুষকে তার ভেতর থেকে, সমাজকে তার ভিত্তি থেকে এবং চিন্তাকে তার কেন্দ্র থেকে আবার গড়ে তুলতে হবে।
লেখক : কবি, গবেষক



