ড. মুস্তফা ফেতুরি
গত পয়লা মে, শুক্রবার, স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো সাংবাদিকদের বলেন, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কে তার মূল্যায়ন বিস্ময়করভাবে একটি সরল মাপকাঠিতে এসে দাঁড়িয়েছে, আর তা হলো- মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘সকালের মেজাজ’। ফিকো মন্তব্য করেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিভাবে ঘুম থেকে ওঠেন, তার ওপর নির্ভর করেই তেলের দামসহ সব কিছু চাপের মধ্যে রয়েছে।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন, তার ‘খুশ মেজাজ’ তেলের দাম তলানিতে নামিয়ে দিতে পারে, আবার তার একটি খামখেয়ালি মন্তব্যই দাম ধাইধাই করে বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফিকোর মন্তব্য যদিও অতিরঞ্জন বলে মনে হতে পারে, তবু এটি এক নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ ‘অস্থিরতার মাপকাঠি’ সামনে হাজির করে, যা এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এই অনিশ্চয়তা কেবল বাজারের ওঠানামা নয়; এটি বিশ্বব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন। মধ্যপ্রাচ্য হলো এমন এক অঞ্চল, যেখানে এক ব্যারেল তেলের দাম এবং একটি বিমানবাহী রণতরীর চলাচল প্রায়ই ওয়াশিংটনের ফিসফিসানিতে নির্ধারিত হয়।
হোয়াইট হাউজ যখন গতানুগতিক ধারার কূটনীতির পরিবর্তে ‘মর্জি-নির্ভর’ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করছে, তখন বিশ্ব ক্রমশ বুঝে নিচ্ছে, কোনো একটি কূটনৈতিক সাফল্য এবং একটি আঞ্চলিক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যকার সীমারেখা এখন হয়তো সম্পূর্ণরূপে একজন ব্যক্তির খেয়াল বা মেজাজ-মর্জির ওপরই নির্ভর করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে এই ‘মেজাজ-মর্জি চালিত’ কূটনীতি প্রায়ই রাষ্ট্রপরিচালনার প্রচলিত কলাকৌশল পাশ কাটিয়ে যায়, যা ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়কেই এক চিরস্থায়ী প্রতিক্রিয়াশীল দোটানার মধ্যে ফেলে দেয়। ফলস্বরূপ এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তঃসারশূন্য করে তোলে এবং সেগুলোকে নিছক প্রেসিডেন্টের কথার প্রতিধ্বনি তোলার কুঠুুরিতে পরিণত করে। ফলে দিনে কয়েকবার সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ঘোষণাপত্রগুলোতে প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো নতুন প্রেক্ষাপট যোগ করতে, সূক্ষ্মতা ব্যাখ্যা করতে বা সেগুলো সংশোধন করতে অক্ষম। আঞ্চলিক শক্তিগুলো, যারা পররাষ্ট্র দফতরের প্রটোকল-নির্ভর ধীরগতিতে চলতে অভ্যস্ত, তাদের জন্য প্রেসিডেন্টের সহজাত মেজাজ অনুযায়ী চলতে গিয়ে শূন্যতে তৈরি করে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের মতো সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে, যেখানে বিধ্বংসী আগ্রাসী যুদ্ধ চলছে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য ধারাবাহিক কূটনৈতিক সঙ্কেত দেয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার, সেখানে মেজাজের আকস্মিক পরিবর্তন মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটাতে পারে, হঠাৎ করে ইরানের সাথে শান্তিচুক্তি ঘোষণা করতে পারে, এমনকি নাজুক যুদ্ধবিরতি আলোচনাও থামিয়ে দিতে পারে। এটি আর অতীতের ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ নয়; এটি একটি কাঠামোগত অস্থিতিশীলতা, যেখানে বৈশ্বিক পণ্য বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং সরবরাহ ব্যবস্থা একটিমাত্র নির্বাহী দফতরের পরিবর্তনশীল খেয়ালখুশির সাথে বাঁধা।

এই ‘মেজাজ-নির্ভর’ নীতির বাস্তব পরিণাম সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা গেছে গত ৪৮ ঘণ্টার মাথা ঘুরিয়ে দেয়া সব উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে। সোমবার ৪ মে, পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তেজনাকর; মার্কিন জাহাজে হস্তক্ষেপ করলে ইরানকে ‘পৃথিবীর মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার’ হুমকি দিয়ে প্রেসিডেন্ট অঞ্চলটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে টেনে নিয়ে যান। তার সামরিক বাহিনী তখন আগ্রাসন ও অবরোধের এক বিধ্বংসী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল, যার পেছনে এ অঞ্চলের প্রতিদিন খরচ হচ্ছিল শত শত মিলিয়ন ডলার।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা নাগাদ পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেল- ট্রুুথ সোশ্যালের এক পোস্টে হঠাৎ করেই সামরিক অভিযান (প্রজেক্ট ফ্রিডম) স্থগিত করার ঘোষণা দেয়া হয়, যাতে ‘কোনো চুক্তি চূূড়ান্ত করা যায় কি না, তা দেখা যায়’ এবং এর কারণ হিসেবে ‘বিশাল সামরিক সাফল্যের’ কথা উল্লেখ করা হয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বৈশ্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ধ্বংসের হুমকি থেকে সরে এসে প্রায়-শান্তি চুক্তির আকস্মিক ঘোষণার দিকে মোড় নেয়।
৬ মে বুধবার সকাল নাগাদ প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা আরো প্রকট হয়ে ওঠে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের জানান এবং কংগ্রেসকে দেয়া বিজ্ঞপ্তিরই পুনরাবৃত্তি করেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরির’ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে গেছে। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধের আক্রমণাত্মক পর্ব সমাপ্ত হয়েছে এবং সামরিক বাহিনী এখন পুরোপুরি ‘প্রতিরক্ষামূলক’ অবস্থানে চলে যাচ্ছে।
তবুও স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই ‘মিশন সম্পন্ন’ হওয়ার সঙ্কেতও বেশ ভঙ্গুর মনে হচ্ছে; রুবিও সম্ভবত ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’-এর আইনি সীমাবদ্ধতা এড়ানোর জন্য অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে থাকতে পারেন, তবে প্রেসিডেন্ট এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্তের সত্যতা নিশ্চিত করেননি। এর ফলে রুবিও এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন, যেখানে তাকে এমন একটি বিজয়কে সংজ্ঞায়িত করতে হচ্ছে, যা একটিমাত্র টুইটের মাধ্যমেই বাতিল হয়ে যেতে পারে। (এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটে গেছে) উপসাগরীয় অঞ্চলের এবং বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষের জন্য এসব কেবল রাজনৈতিক চালবাজি নয়; এগুলো এমন এক যন্ত্রের কলকব্জা, যা নির্ধারণ করে তাদের বন্দরগুলো খোলা থাকবে নাকি তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো টিকে থাকবে।
এই ‘মেজাজ-তাড়িত’ বিচ্ছিন্নতা শুধু তাৎক্ষণিক বিশৃঙ্খলাই সৃষ্টি করে না; এটি সেই মৌলিক বিশ্বাসকেও স্থায়ীভাবে ক্ষুণ্ন করে, যার ওপর আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তিগুলো নির্মিত হয়। যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শান্তি ঘোষণাকে নীতি হিসেবে না দেখে কেবল লোকদেখানো বলে গণ্য করা হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলের থরহরিকম্প মিত্রদের কাছে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে নিজের ভূমিকা হারায় এবং একটি ঝুঁকিপূর্ণ দায়ে পরিণত হয়।
পুরো বিশ্ব উপলব্ধি করছে, প্রথাগত রাষ্ট্রীয় রীতিনীতি, আনুষ্ঠানিক তারবার্তা, উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ সম্মেলন এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রভৃতি এখন হোয়াইট হাউজের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে গুরুত্ব হারিয়েছে। ফলস্বরূপ এ অঞ্চলটি এখন আর কেবল আমেরিকার অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে না; বরং এমন এক বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে খেয়ালখুশিমতো সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করা যেতে পারে। এই নতুন যুগে ‘অস্থিরতার ব্যারোমিটার’ই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক, যা মধ্যপ্রাচ্যকে এক স্থায়ী উচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখেছে, যেখানে পরদিন সকালের শিরোনাম যেমন যুদ্ধবিরতি আনতে পারে, তেমনি এক অন্তহীন যুদ্ধের নতুন ফ্রন্টও খুলে দিতে পারে।
মেজাজ-চালিত এই যুগের চূড়ান্ত শিকার হলো কৌশলগত পূর্বাভাসযোগ্যতার ধারণা। কয়েক দশক ধরে, বিশ্বব্যবস্থা এই অনুমানের ওপর নির্ভর করত। সেই যুগ শেষ হয়ে গেছে। ফিকোর ‘মর্নিং টেম্পারমেন্ট’ পরিমাপক যেমনটি দেখায়, বিশ্ব ইতিহাসের এমন এক ‘প্রাতিষ্ঠানিক-পরবর্তী’ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে ৭০ বছরের প্রতিষ্ঠিত জোট-প্রটোকলের চেয়ে একজন ব্যক্তির মেজাজ বেশি গুরুত্ব বহন করে।
মধ্যপ্রাচ্যের জন্য, যে অঞ্চলটি ইতোমধ্যেই কয়েক দশকের হস্তক্ষেপের কারণে ক্ষতবিক্ষত, এই উপলব্ধি যে একটি আগ্রাসী যুদ্ধকে ডিজিটাল কোনো ‘ঝলক’ বা সকালের খেয়ালের ওপর ভিত্তি করে চালু বা বন্ধ করা যেতে পারে, তা এক ভয়াবহ দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন। এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের কম্পমান মিত্র থেকে শুরু করে তেহরানের উদ্ধত প্রতিপক্ষ পর্যন্ত প্রতিটি আঞ্চলিক পক্ষকে এক স্থায়ী জরুরি অবস্থার মধ্যে কাজ করতে বাধ্য করে। যখন ‘অস্থিরতার ব্যারোমিটার’ই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে, তখন কূটনীতি আর সমাধান খোঁজার বিষয় থাকে না; এটি হয়ে দাঁড়ায় পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা টিকে থাকার লড়াই। এর ফলস্বরূপ বিশ্ব শুধু আরো বিপজ্জনকই নয়; বরং এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে শান্তি নিজেও ততটাই খামখেয়ালি ও অনিশ্চিত, যতটা খামখেয়ালি সেই ব্যক্তি যিনি এখন এর শর্তগুলো নির্ধারণ করছেন।
শেষ পর্যন্ত বিশ্ব বুঝতে পারছে, পরিকল্পিত যুদ্ধের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হলো এমন শান্তি, যা একজন রাষ্ট্রপতির ঘুমের মানের ওপর নির্ভরশীল!
লেখক : লিবীয় শিক্ষাবিদ ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ফ্রিডম অব প্রেস’ পুরস্কার পেয়েছেন। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ : মুজতাহিদ ফারুকী



