মার্কা-এ-হক

মার্কা-এ-হকে পাকিস্তানের বিজয়ের পেছনে জাতির সেই ঐক্য ছিল, যা এক দীর্ঘ সময় পরে দেখা গিয়েছিল। সারা বিশ্ব দেখেছে, জনগণ যখন নিজেদের সেনাবাহিনীর পেছনে এসে দাঁড়ায়, তখন সেই সেনাবাহিনী নিজেদের চেয়ে পাঁচগুণ বড় শত্রুকেও পরাস্ত করে দিতে পারে। এ কারণেই দেশজুড়ে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে মার্কা-এ-হকের প্রথম বার্ষিকী উদযাপন করা হলো।

২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সাথে চার দিনের যুদ্ধকে পাকিস্তানে কেন মার্কা-এ-হক (সত্যের যুদ্ধ) অভিহিত করা হলো? কারণ ভারত এক মিথ্যা দিয়ে এ যুদ্ধের বৈধতা খুঁজেছিল এবং যুদ্ধের সূচনাও করেছিল মিথ্যা দিয়ে। পাকিস্তানের জবাব ছিল সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ২২ এপ্রিল, ২০২৫ অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরের পর্যটন এলাকা পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার একটি ঘটনার দায় পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ২৩ এপ্রিল একতরফাভাবে সিন্ধু তাস চুক্তি (সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি) স্থগিত করে দেয়া হয়। কয়েক দিন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ ব্যতিরেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করা হয়। এরপর ৭ মে অপারেশন সিঁদুুর নাম দিয়ে পাকিস্তানের ওপর মিসাইল আক্রমণ করা হলো।

যে রাতে এ আক্রমণ করা হলো, সে রাতের কথা আমি কখনো ভুলব না। ভারতীয় এক নারী সাংবাদিক আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে জানতে চান, তুমি কি ঠিক আছ? আমি জানতে চাইলাম, কী হয়েছে? তিনি বললেন, তাদের টিভিতে ব্রেকিং নিউজ চলছে, করাচি, লাহোর ও ইসলামাবাদ ভারত দখল করে নিয়েছে। শাহবাজ শরিফ গ্রেফতার হয়েছেন এবং জেনারেল আসিম মুনির পাকিস্তান থেকে পালিয়ে গেছেন। আমি ওই নারী সাংবাদিককে বললাম, সব মিথ্যা। ইসলামাবাদে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ভারতীয় বাহিনীর কোনো নামনিশানা নেই। এরপর আমি জানতে পারলাম, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং ভারতের পক্ষ থেকে মিথ্যাকে যুদ্ধের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যাতে পাকিস্তানিদের হতাশাগ্রস্ত করে দেয়া যায় এবং চারদিকে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানের মিডিয়া এই মিথ্যার মোকাবেলায় ন্যায় ও সত্যকে তুলে ধরে। এরপর যখন ভারতের সাতটি যুদ্ধবিমান গুলি করে নামানো হলো এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়াও পাকিস্তানের মিডিয়ার দাবিগুলোর সত্যতা স্বীকার করল, তখন এটি মার্কা-এ-হক বা সত্যের যুদ্ধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো।

মার্কা-এ-হকে পাকিস্তানের বিজয়ের পেছনে জাতির সেই ঐক্য ছিল, যা এক দীর্ঘ সময় পরে দেখা গিয়েছিল। সারা বিশ্ব দেখেছে, জনগণ যখন নিজেদের সেনাবাহিনীর পেছনে এসে দাঁড়ায়, তখন সেই সেনাবাহিনী নিজেদের চেয়ে পাঁচগুণ বড় শত্রুকেও পরাস্ত করে দিতে পারে। এ কারণেই দেশজুড়ে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে মার্কা-এ-হকের প্রথম বার্ষিকী উদযাপন করা হলো। এ উৎসাহ-উদ্দীপনা বলছিল, জনগণের আস্থা ফর্ম ৪৭ অর্থাৎ- কোনো কাগুজে ফলাফল বা বিতর্কিত সরকারি ঘোষণার ওপর নির্ভর করে না। যখন কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করে নেয়, তখন জনগণকে বড় বড় শত্রুরাও বিভ্রান্ত করতে পারে না। মার্কা-এ-হকের এক বছর পূর্তিতে এ কথা আরজ করতে চাই- বিজয়ের আনন্দ অবশ্যই উদযাপন করুন; কিন্তু শত্রু থেকে সতর্ক থাকুন। শত্রু যেমন ধূর্ত, তেমন অধমও।

২০২৫ সালের মে মাসের যুদ্ধ পাকিস্তান নয়; বরং ভারত শুরু করেছিল। ওই যুদ্ধে বিজয় বিশ্বজুড়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। পাকিস্তান ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধবিরতির যে মর্যাদা অর্জন করেছে, তা ধরে রাখা এতটা সহজ নয়। আজ পাকিস্তান বিশ্বে শান্তির রক্ষক হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির জন্য পাকিস্তানের এ নতুন অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়। বিজেপির রাজনীতি ঘৃণা, সঙ্ঘাত ও মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

বিজেপি সরকার ইসরাইলের সাথে মিলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। আর এ কারণেই আমেরিকার ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিন ৪ মে, ২০২৬ পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে এক নতুন যুদ্ধের ঝুঁকির ব্যাপারে সতর্ক করেছে। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে এক নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি এ জন্য রয়েছে যে, পাকিস্তানে অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতি। এ ঝুঁকি মোকাবেলা করার জন্য পাকিস্তানে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই ঐক্য ও সংহতির জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুশাসনের ওপর মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। সুশাসনের বড় দাবি হচ্ছে- সমস্ত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও অন্তত সাধারণ জনগণের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানো।

আমরা দেখেছি, যখন পুরো জাতি মার্কা-এ-হকের প্রথম বার্ষিকী উদযাপন করছে, তখন পেট্রলের মূল্য লিটারপ্রতি ৪০০ রুপি থেকে বাড়িয়ে ৪১৫ করা হলো। আগে পেট্রলে লিটারপ্রতি লেভি কর ছিল ১০৩ রুপি। এ লেভি কর বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ১১৭ রুপি করা হয়েছে। যেখানে আইএমএফের দাবি ছিল- এই লেভি কর প্রতি লিটারে ৮০ রুপি পর্যন্ত হওয়া উচিত। পেট্রলে প্রতি লিটারে লেভি কর বাড়তি ৩৭ রুপি আদায়ের বড় কারণ হচ্ছে- এফবিআর কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। এ কারণে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সাধারণ জনগণকে কোরবানির খাসি বানানো হচ্ছে।

পেট্রলের মূল্যে অসহনীয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির সেই তুফান খাড়া করেছে যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে কোরবানির ঈদে কোরবানির পশু কেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আজকাল আমি যেদিকেই যাই, সাধারণ মানুষ পথ রোধ করে বলে, মার্কা-এ-হক নিয়ে আপনি যে সত্যবাদিতা দেখিয়েছেন, তার জন্য আপনাকে সালাম। কিন্তু কিছু সত্য কথা জনগণের জন্যও বলুন। সত্য কথা হচ্ছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানি নেতৃত্বের বারবার প্রশংসা করেন, তখন আমাদের শত্রুদের মন খুব জ্বলে। যখন ইরানের ইসলামী বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী হরমুজ প্রণালী দিয়ে পাকিস্তানের সামুদ্রিক জাহাজকে যাওয়ার অনুমতি দেয়, তখন আমরা ভাবি, সত্যিই পাকিস্তান দারুণ কিছু করে দেখিয়েছে। আমেরিকা ও ইরান উভয়েই পাকিস্তানের প্রতি সন্তুষ্ট; কিন্তু এই দারুণ কিছু করা সত্ত্বেও পাকিস্তানের জনগণ কোনো রিলিফ পাচ্ছে না কেন?

ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে পেট্রলের মূল্যস্ফীতি এতটা হয়নি, যতটা পাকিস্তানে হয়েছে। আমাদের সুশাসন কোথায়? আমাদের মন্ত্রী মহোদয়রা আমাদের ইমরান খানের শাসনামলের দুর্নীতির কাহিনী শোনাতে ক্লান্ত হন না, অথচ ওয়ান কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউর উঁচু ভবনের একটি ঘটনা শাহবাজ শরিফের সরকারের সুশাসনের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। একদিকে মুসলিম লীগের (এন) ভেতর আমরা বিভেদ দেখতে পাচ্ছি। দলটির নেতাকর্মীরা একে অপরের বিরুদ্ধে সাইবার আক্রমণ চালাচ্ছে। অপরদিকে, মুসলিম লীগ (এন) ও পিপলস পার্টির মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। উভয় দলের সাইবার যোদ্ধারা একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দিচ্ছে।

মুসলিম লীগ (এন) ও পিপলস পার্টির মধ্যে শুরু হওয়া এই ঠাণ্ডা লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হতে পারে মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় সরকারের। ইরান ও আমেরিকার যুদ্ধ শাহবাজ শরিফের সরকারের দুর্বলতাগুলোকে আড়াল করে রেখেছে। কিন্তু তারা যেন মনে রাখে, নির্বাচনে সফলতার জন্য তো ফরম ৪৭ কাজে আসে; কিন্তু যখন শত্রুর ষড়যন্ত্রগুলোর মোকাবেলার প্রয়োজন হয়, তখন ফরম ৪৭ নয়; বরং জনগণের পূর্ণ আস্থা কাজে আসে। জনগণের আস্থা শুধু সেই কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জন হয়, যা পাকিস্তানের বাহিনী ২০২৫ সালের মে মাসের মার্কা-এ-হকে করে দেখিয়েছে। মার্কা-এ-হকের আনন্দ উদযাপনের মুহূর্তে এ প্রশ্ন উত্থাপনও সত্যবাদিতার দাবি- জনগণকে মূল্যস্ফীতির হাত থেকে রক্ষার জন্য একটি নতুন মার্কা-এ-হক বা সত্যের যুদ্ধ কবে শুরু হবে?

পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ১১ মে ২০২৬ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর

ইমতিয়াজ বিন মাহতাব

[email protected]

হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট