পৃথিবীর সব জায়গায় স্থলপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে রেলকে নিরাপদ, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী বাহন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই উপমহাদেশে রেলপথের যাত্রা শুরু হয় ১৮৫৩ সালে। আর আমাদের পূর্ব বাংলায় রেলপথের সূচনা হয় ১৮৬২ সালে দর্শনা-জগতি রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে। এরপর সময়ের পরিক্রমায় রেলপথের বিস্তৃতি ঘটে।
পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রেলব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ আমলের অবকাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পর ‘পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে’ ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে’ নামে যাত্রা শুরু করে। ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু নির্মাণের আগে পূর্ব ও পশ্চিম অংশের রেল যোগাযোগ ছিল না। পূর্ব অংশ মিটারগেজ এবং পশ্চিম ব্রডগেজ জোনে বিভক্ত ছিল। যমুনা নদী পার হতে হতো ফেরিতে করে। বর্তমানে ব্রডগেজ ও মিটারগেজের মিশ্রণ আছে। তবে ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজ লাইন স্থাপনে জোর দেয়া হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২৮৭৭ কিলোমিটার রেললাইন নেটওয়ার্ক দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৪টি জেলার সাথে সংযুক্ত আছে। ১৯৪৭ সালের আগে অবিভক্ত ভারতে রেলওয়ে বোর্ডের মাধ্যমে তখনকার রেলওয়ে পরিচালিত হতো। ১৯৭৩ সালে বোর্ডের কার্যক্রম বিলুপ্ত করে একে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়। এর পর থেকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সড়ক ও রেলপথ বিভাগ রেলওয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করত। তবে দীর্ঘ দিন ধরে ভুল পরিকল্পনা ও ক্রমাগত অবহেলায় রেল খাত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। আর তাই এ খাতকে বাঁচাতে দাবি ওঠে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে ‘রেলপথ মন্ত্রণালয়’ নামে স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়।
উন্নত বিশ্বে রেলপথ অনেকটাই নিরাপদ, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী। কিন্তু বাংলাদেশে সেবার মান ভালো নয়। রেলগাড়িতে জরাজীর্ণ বগি থাকে, দেয়া হয় মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন। দক্ষ জনবল সঙ্কট, ইঞ্জিন ও বগি সঙ্কট আছে। তা ছাড়া ঠিক সময়ে ট্রেন ছাড়া হয় না। গন্তব্যেও পৌঁছতে পারে না সময়মতো। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি দিন দিন বেড়ে চলেছে। অতীতে ম্যানুয়ালি টিকিট দেয়া হতো। বর্তমানে ম্যানুয়াল ও অনলাইন— দুই ব্যবস্থায়ই দেয়া হয়। তবে দুই ঈদের সময় টিকিট প্রাপ্তির যে বিড়ম্বনা, সেটি নিরসনে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম রেলপথ। টঙ্গী-ভৈরব-আখাউড়া-লাকসাম হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত এই পথের দৈর্ঘ্য ৩২১ কিলোমিটার, সময় লাগে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। এই পথে জনপ্রিয় ট্রেনগুলোর মধ্যে আছে— সোনার বাংলা এক্সপ্রেস, সুবর্ণ এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতী, মহানগর গোধূলি, তূর্ণা এক্সপ্রেস, চট্টলা এক্সপ্রেস প্রভৃতি। প্রধান স্টেশনসগুলো হলো— ঢাকায় কমলাপুর, বিমানবন্দর, টঙ্গী, নরসিংদী, আখাউড়া, কুমিল্লা, লাকসাম, ফেনী ও চট্টগ্রাম।
নারায়ণগঞ্জ হয়ে কুমিল্লা পর্যন্ত নতুন কর্ডলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। এটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব ৩২১ কিলোমিটার থেকে ৯০ কিলোমিটার কমে ২৩১ কিলোমিটার হবে। যাতায়াতের সময় নেমে আসবে তিন ঘণ্টায়। তখন টঙ্গী-ভৈরব-আখাউড়া হয়ে যেতে হবে না। এটি শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম নয়, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার যোগাযোগব্যবস্থায়ও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। এর সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা তৈরির কাজ চলছে, যদিও শুরুতে এর লক্ষ্য ছিল হাইস্পিড ট্রেন চালু করা। বর্তমানে কর্ডলাইন নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার নতুন রেলপথ এবং চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪১ কিলোমিটার পথের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত প্রকল্পটির কাজ ২০১৮ সালে শুরু হয়। শেষ হয় ২০২৩ সালে। কক্সবাজারের রেলস্টেশনটি ঝিনুক আকৃতির, যা একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা থেকে কক্সবাজার সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হওয়ায় পর্যটনশিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এই রেলপথ ভবিষ্যতে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের অংশ হিসেবে মিয়ানমার এবং পরবর্তী সময়ে চীন পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে।
ঢাকা-সিলেট রেলপথের দূরত্ব ২২৫ কিলোমিটার। সময় লাগে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা। এ পথে পারাবত, জয়ন্তিকা, কালনী ও উপবন আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। ট্রেনগুলো ঢাকার কমলাপুর থেকে যাত্রা করে বিমানবন্দর, ভৈরব বাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, শায়েস্তাগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে সিলেট পৌঁছায়।
ঢাকা-রাজশাহী রেলপথ ৩৪৩ কিলোমিটার, সময় লাগে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা। এই পথে চলাচল করে আন্তঃনগর ট্রেন বনলতা, পদ্মা, সিল্কসিটি ও ধূমকেতু।
ঢাকা থেকে দিনাজপুরের রেলপথের দূরত্ব ৪০৫ কিলোমিটার। এই পথে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেনগুলো হচ্ছে— একতা, দ্রুতযান এবং পঞ্চগড় এক্সপ্রেস। যমুনা সেতু হয়ে যাতায়াতে সময় লাগে আট থেকে ৯ ঘণ্টা।
ঢাকা-খুলনা রেলপথে বর্তমানে পদ্মা সেতু হয়ে আন্তঃনগর টেনগুলো যাতাযাত করে। দূরত্ব ২১২ কিলোমিটার, চলাচলে সময় লাগে প্রায় চার ঘণ্টা। এই পথে চলাচল করে আন্তঃনগর জাহানাবাদ, বেনাপোল, সুন্দরবন ও চিত্রা এক্সপ্রেস। এগুলো ভাঙ্গা, রাজবাড়ী, পোড়াদহ ও ঈশ্বরদীতে যাত্রাবিরতি করে।
পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে যশোরের ১৭০ কিলোমিটার দূরত্বের রেলপথে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। এই পথ ঢাকার সাথে কেরানীগঞ্জ, মাওয়া, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও নড়াইল হয়ে যশোরকে সংযুক্ত করেছে। পথটি বাস্তবায়নের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে রাজধানীর সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন এবং সময় ও খরচ কমানো।
ঢাকা থেকে যমুনা সেতু হয়ে কুষ্টিয়ার রেল যোগাযোগ আছে। এই পথের দূরত্ব ১৮৮ কিলোমিটার, সময় লাগে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা। চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেন হলো— নকশীকাঁথা এক্সপ্রেস। ট্রেনটি জয়দেবপুর, বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব ও পশ্চিম, সিরাজগঞ্জ, ঈশ্বরদী ও পোড়াদহ স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে।
ঢাকা-বরিশাল রেলপথ হলো ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে পায়রা বন্দর ও কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রস্তাবিত একটি দীর্ঘ রেলপথ প্রকল্প। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগের মাধ্যমে বরিশালকে রেল নেটওয়ার্কে আনতে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে, যার মাধ্যমে ঢাকা থেকে সরাসরি ট্রেন বরিশাল ও পায়রা বন্দরে পৌঁছবে। ভাঙ্গা জংশন থেকে বরিশাল হয়ে পায়রা বন্দর ও কুয়াকাটার দূরত্ব ২১৪ কিলোমিটার। ভাঙ্গা ও কুয়াকাটা ছাড়া এ পথে চলাচলকারী স্টেশনগুলো হলো— মাদারীপুর, গৌরনদী, বরিশাল, বাকেরগঞ্জ ও পটুয়াখালী। প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ হয়েছে এবং চীন অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই রেলপথ চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ও বাণিজ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে, যা পায়রা বন্দরকে উন্নত করবে। সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে এই প্রকল্পটি সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে ঢাকা থেকে সরাসরি বরিশাল যাওয়ার রেলপথ নেই; তবে এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমবার বরিশাল বিভাগ রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে।
পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে ব্রডগেজ লাইনে ইলেকট্রিক ট্রেন চলাচল করে। আমাদের দেশে রেলকে দ্রুততম ও আধুনিক করতে হলে ব্রডগেজের পাশাপাশি ইলেকট্রিকে রূপান্তরের বিকল্প নেই। বর্তমানে আমাদের দেশের পূর্বাংশের মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রেলপথে এখনো মিটারগেজ লাইনে ট্রেন চলাচল করছে, যার দ্রুত অবসান প্রয়োজন।
মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে রেলপথের গুরুত্ব অনেক। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে কনটেইনার পরিবহনে রেলওয়ে নির্ভরযোগ্য ও অপরিহার্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে রেলওয়ের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল। সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এখন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে রেলওয়েকে ঢেলে সাজানো গেলে এটি কেবল যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবেই নয়; অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন এবং উন্নত সেবায় বাংলাদেশ রেলওয়ে হয়ে উঠুক উন্নত মানুষের নির্ভরতার প্রতীক।
লেখক : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক



