শোষণ বঞ্চনায় ভরা সেই পুরনো জীবন একাত্তরের ২৫-এর রাতে শেষ হয়ে যায়নি। তবে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তেমন প্রস্তুতি ছিল না। ইতিবৃত্তে তাকালে দেখা যায়, রাজনৈতিক ভূগোলের পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনধারায় মৌলিক রূপান্তর খুব কম এনে থাকে। আমাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও সে কথা বলে।
একাত্তরে বাংলাদেশ যখন ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছিল তখন তার চোখে এক ধরনের স্বপ্নের ঘোর ছিল। যেমন কবিদের মধ্যে থাকে। আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয়ে, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা করতে গিয়ে বিপর্যয় ডেকে আনে পাক সামরিক শাসন কর্তৃপক্ষ। স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ এক মাসের মধ্যে স্থিমিত হয়ে পড়ে এবং তাজউদ্দীন আহমদের প্রবাসী সরকার ভারতের মাটিতে বসে তাকে নতুন করে সংগঠিত রূপ দেন। শেষ পর্যন্ত পাক আক্রমণের মুখে ভারত সম্মুখসমরে পাকিস্তানকে পরাজিত করে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ত্বরান্বিত করে। সেই সুবাদে তাজউদ্দীন আহমদের প্রবাসী সরকার ঢাকায় এসে তার কার্যক্রম শুরু করে। এক মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধু পাক কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেন। সত্তরের নির্বাচনের আগে যা ছিল প্রশ্ন সেটা তার চোখের সামনে বাস্তব রূপ নিয়ে হাজির হলো। সোনার বাংলা শ্মশান কেন (?), আমি সেই পোস্টারের কথা বলছি। দিনে দিনে জনগণের জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী হতে শুরু করলে রাজনীতিতে অস্থিরতা ও অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি হতে থাকল। অনেক বিয়োগান্ত ঘটনা সংঘটিত হলো, একের পর এক সরকার বদলাতে থাকল কিন্তু সোনার বাংলার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল!
এসব দেখার পর স্বাভাবিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে : আসলে কি জনজীবনে বাস্তব কোনো পরিবর্তন ঘটেছে, না যা কিছু পরিবর্তন তা অধিপতি শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে? কিছু মানুষের জন্য জীবন নাটকীয়ভাবে উন্নত হয়েছে। সৌভাগ্য, প্রভাব বা বিদ্যমান ব্যবস্থার সুবিধা নেয়ার ক্ষমতা যাদের বেশি তাদের জীবনে, যা সবসময় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
সরকার বদলায়, কিন্তু ক্ষমতার সুবিধাভোগীরা প্রায়ই একই থেকে যায়। এতে আরো এক গভীর উদ্বেগ সামনে আসে। ‘সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের সর্বাধিক সুখ নিশ্চিত করা’ এ প্রতিশ্রুতির কী হবে? যদি এ আদর্শ পূরণ না হয়, তবে জাতীয় বীরদের ত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের সংগ্রাম কেবল কি রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে?
একই সাথে, বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরের অনিশ্চয়তাকেও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
একসময় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত পশ্চিমা বিশ্বে এখন দুর্বলতার লক্ষণ সুস্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের অনির্দেশ্য বাণিজ্যনীতি ও শুল্ক বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ইউরোপের ধীরগতির, জ্বালানি সঙ্কটময় অর্থনীতি, যে স্তম্ভগুলোর ওপর অনেক উন্নয়নশীল দেশ নির্ভর করত, সেগুলো আর আগের মতো স্থিতিশীল নয়। বাংলাদেশের জন্য পশ্চিমের এ দুর্বলতা শুধু আন্তর্জাতিক খবর নয়; এটি সরাসরি অর্থনৈতিক হুমকি।
দেশের তৈরী পোশাক (আরএমজি) খাত, যা রফতানি আয়ের মেরুদণ্ড এবং বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস— এখনো পশ্চিমা বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সেই অর্থনীতিগুলো ধীরগতির হলে, অর্ডার কমে যায়, রফতানি আয় হ্রাস পায় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সঙ্কুচিত হয়। যার চাপ সরাসরি বাংলাদেশে এসে পড়ে। বৈশ্বিক অস্থিরতা দেশের অভ্যন্তরেও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ, যা সবসময় স্থানীয় ফসলহানির কারণে নয়, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের চাপের ফল।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি খরচ এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি আরো তীব্র হয়, এর বোঝা বহন করে সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে। তবে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। নতুন সরকার সামাজিক সুরক্ষা জাল শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে, বিশেষ করে খাল খনন প্রকল্প ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বিতরণের মাধ্যমে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগও উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
খাল খনন শুধু একটি জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি নয়; এটি কৃষির টিকে থাকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি কার্যকর জলপথ এবং বর্ষানির্ভর সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। খালগুলো সচল রাখা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। একাজ শীতের শুরুতে আরম্ভ করে বর্ষার আগে শেষ করতে পারলে বেশি সুফল পাওয়া যাবে। এ ধরনের প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকার শুধু মাটি কাটছে না, বরং ভূমিহীন শ্রমিকদের হাতে ক্রয়ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে। সেই সাথে গ্রামীণ জীবিকাকে বৈশ্বিক বাজারের ধাক্কা থেকে রক্ষা করছে।
তবু সামনে পথ সহজ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, পশ্চিমা বাজারের দুর্বল চাহিদা এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের কৃষি ভবিষ্যৎকে হুমকিতে ফেলছে।
দেশকে স্বল্পমেয়াদি ত্রাণের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা ভাবতে হবে।
নদী ও খালগুলোকে বাণিজ্যিক মৎস্য চাষের কেন্দ্রে রূপান্তরের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, যেমনটি চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো করেছে। এটি শুধু রফতানি বাড়াবে না, বরং স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, যা লন্ডন বা নিউ ইয়র্কের ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল নয়। তবে এসব বাস্তবায়নে প্রয়োজন পুঁজি, যার অভাব বর্তমানে আমাদের দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ।
সম্প্রতি সখীপুরে এক সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আজম খান সরকারের আর্থিক চাপে থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, গত এক দশকে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
জনআস্থা ধরে রাখতে সরকারকে দু’টি বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে : আর্থিক পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাণিজ্য পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সাথে মুদ্রামানের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অর্থনৈতিক নীতি সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান স্বস্তি আনে।
একই সাথে, নীতিনির্ধারকদের উচিত অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে অযথা অর্থ ঢালার প্রবণতা থেকে বিরত থাকা। বেসরকারি কারখানা ব্যর্থ হলে মালিক ক্ষতি বহন করেন; কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা ব্যর্থ হলে সেই বোঝা পড়ে করদাতাদের ওপর, আর অদক্ষতা থেকে যায়।
বাংলাদেশের পক্ষে এমন বিলাসিতা সম্ভব নয়। এমন এক বিশ্বে, যেখানে পশ্চিমা বাজার আর নিশ্চিত প্রবৃদ্ধি দিতে পারে না। সঠিক পথ হলো স্বনির্ভর, কৃষিভিত্তিক শিল্প অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা কৃষকদের ক্ষমতায়ন করবে। ক্ষুদ্র শিল্পকে সহায়তা করবে। টেকসই স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করবে।
বাংলাদেশের অলৌকিক কিছু দরকার নেই। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সংস্কার, গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন এবং এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলার দৃঢ়তা, যা বিশ্ব টালমাটাল হলেও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক



