স্মৃতিতে ভাস্বর বাবা

একজন অভিভাবক ও পথপ্রদর্শকের রেখে যাওয়া দর্শন

বাবা আমাদের শিখিয়েছিলেন, আদালতে সবসময় নিজের মর্যাদা ও গাম্ভীর্য বজায় রাখতে। এ মর্যাদা কেবল প্রতিপক্ষ আইনজীবীর ক্ষেত্রে নয়, বরং আদালতের (বিচারকের) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এটি ছিল অত্যন্ত জরুরি একটি পরামর্শ, কারণ আদালতে প্রতিপক্ষ অনেক সময় রূঢ় ও অভদ্র আচরণ করতে পারেন। এমনকি বিরল ক্ষেত্রে বিচারকরাও জুনিয়র আইনজীবীদের ধমক দিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।

প্রায় এক বছর হলো আমরা আমার বাবা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে হারিয়েছি। ২০২৪ সালের শুরুতে তার শরীরে অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার (প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার, স্টেজ থ্রি) শনাক্ত হয়। জীবনের এই কঠিন লড়াই তিনি লড়েছেন অত্যন্ত নিভৃতে ও সাহসিকতার সাথে। তবে মে ২০২৫-এ তিনি এ ব্যাধির কাছে হার মানেন। তার প্রস্থান এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। তিনি শুধু আমার জন্মদাতা ছিলেন না, বরং আমার কর্মজীবনের অগ্রজ এবং পথপ্রদর্শকও ছিলেন। জটিল আইনি সিদ্ধান্ত হোক কিংবা ব্যক্তিগত সঙ্কট, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তার পরামর্শের ওপর নির্ভর করেছি। এমনকি তিনি যখন দেশের বাইরে থাকতেন, তখনো আমি পরামর্শের জন্য তাকে ফোন দিতাম। তা ছাড়া আমার আর ইমরানের মধ্যে যেকোনো বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে, তা আইন, চেম্বার পরিচালনা কিংবা রাজনীতি যাই হোক না কেন, বাবা ছিলেন চূড়ান্ত মীমাংসাকারী। আমাদের যেকোনো সিদ্ধান্তের পেছনে তার প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা কাজ করছে, এ স্বস্তির জায়গাটি ছিল আমাদের বড় শক্তি। আজ সেই স্বস্তির জায়গা চিরতরে হারিয়ে গেছে। তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে, আমি সেই গুরুত্বপূর্ণ পেশাদার শিক্ষাগুলোর কথা স্মরণ করছি, যা তিনি আমাকে এবং তার অন্য সব জুনিয়রকে দিয়ে গেছেন।

উপস্থাপনা শৈলীর মাহাত্ম্য
ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সান্নিধ্যে তিন বছর কাজ করার পর, ২০০৫ সালের অক্টোবর মাসে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে বাবার চেম্বারে যোগদান করি। বাবার অধীনে কাজ করার ধরনটি ছিল প্রথাগত শিক্ষার চেয়ে আলাদা। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সাহচর্যে আমি আইনি কৌশল ও গবেষণার ওপর জোর দিতে শিখেছিলাম; সেখানে মূল লক্ষ্য ছিল পুরনো আইনি নজিরের ভারে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে ফেলা। অন্য দিকে বাবার দৃষ্টিতে আইন পেশা কেবল শুষ্ক যুক্তি নয়, বরং তা ছিল চমৎকার উপস্থাপনা ও আদালতকে প্রভাবিত করার একটি শিল্প। আদালতে নিজের বাচনভঙ্গি ও কণ্ঠস্বরকে আকর্ষণীয় রাখার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। মামলার শুরুটা কীভাবে করবেন, শুরুতে কোন বিষয়গুলো বলবেন এবং শেষটা কেমন হবে, এ বিষয়গুলোর ওপর খুব জোর দিতেন। কখনো কখনো কোনো জটিল মামলায় জুনিয়রদের নিয়ে বসতেন শুধু এটি ঠিক করতে যে, কোন শব্দটি তিনি ব্যবহার করবেন কিংবা কোন বাক্যটি কখন বলবেন। ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে বাবা ‘লন্ডন স্কুল অয মিউজিক অ্যান্ড ড্রামা’ থেকে বাগ্মিতার ওপর তালিম নিয়েছিলেন; তার কথা বলার ঢং এবং আদালতে যুক্তি উপস্থাপনের চমৎকার ভঙ্গি দেখলে এটার ছাপ স্পষ্ট দেখা যেত। তিনি খুব চিৎকার করে কথা বলতেন না, অথচ আদালত কক্ষের শেষপ্রান্ত থেকেও তার কথা পরিষ্কার শোনা যেত। কথা বলার গতির ওপর তার দারুণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। তিনি খুব ধীরগতিরও ছিলেন না, আবার খুব দ্রুতও ছিলেন না। বাবা প্রায়ই বলতেন আমি বড্ড দ্রুত কথা বলি; বাবার অনুশাসনটি আজো আমার কানে বাজে; আর অভ্যাসটি শোধরে নেয়ার চেষ্টায় আমি আজো সংগ্রাম করছি।

Abdur-Razzak-25-4

মিনিটের যুক্তি, ঘণ্টার সাধনা
কথাটি বাবাকে কে বলেছিলেন তা আমার ঠিক মনে নেই; হতে পারে ইংল্যান্ডে তার কোনো শিক্ষক বা মেন্টর। আদালতের শুনানিতে সওয়াল-জবাব করার প্রাক্কালে তিনি আমাদের প্রায়ই এটি বলতেন। সুচিন্তিত প্রস্তুতির অর্থ হলো, আপনি লক্ষ্যহীনভাবে ডানে-বামে ছুটবেন না। সেই সাথে একই কথার পুনরাবৃত্তি করবেন না। কখনো কখনো প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যেত না; সেক্ষেত্রে সেই মামলার জন্য কাজ করা আইনজীবীর সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে হতো। বেশি আইনজীবী কাজ করলে প্রস্তুতির জন্য বেশি সময় পাওয়া নিশ্চিত হতো। তবে প্রস্তুতির এ মূলমন্ত্রের সাথে কোনো আপস চলত না!

বাবার নোটবুক
বাবার একটি নোটবুক ছিল; যার ওপর লেখা থাকত, ‘অল কেসেস’। এখানে তিনি তার মামলার যাবতীয় যুক্তি এবং যেসব নজিরের ওপর নির্ভর করবেন, তা লিখে রাখতেন। অন্য সিনিয়রদের নোটবুকের সাথে এর পার্থক্য ছিল আকাশ-পাতাল; তাদের নোটবুকগুলো ছিল কেবল রেফারেন্সের তালিকা মাত্র। কিন্তু বাবার নোটবুক শুধু উদ্ধৃতি বা সাইটেশনে সীমাবদ্ধ ছিল না; সেটি ছিল ওকালতির এক পূর্ণাঙ্গ ছক, কোন যুক্তিটি প্রথমে আসবে। কোনটি তোলা থাকবে শেষের জন্য, তার বিস্তারিত বিবরণ থাকত সেখানে। কখনো তিনি এর চেয়েও গভীরে যেতেন। তার সওয়াল-জবাবের গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুচ্ছ এমনকি পুরো বাক্যটিও তিনি আগেভাগে লিখে রাখতেন। গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর ক্ষেত্রে একটিমাত্র ডায়েরিতে সীমাবদ্ধ থাকতেন না; বরং প্রতিটি মামলায় পৃথক পৃথক নোটবুক ব্যবহার করতেন। ইটিভি মামলা এবং অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব লাভের মামলার ক্ষেত্রে তিনি এমনটি করেছিলেন।

আদালতে আত্মমর্যাদা রক্ষা
বাবা আমাদের শিখিয়েছিলেন, আদালতে সবসময় নিজের মর্যাদা ও গাম্ভীর্য বজায় রাখতে। এ মর্যাদা কেবল প্রতিপক্ষ আইনজীবীর ক্ষেত্রে নয়, বরং আদালতের (বিচারকের) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এটি ছিল অত্যন্ত জরুরি একটি পরামর্শ, কারণ আদালতে প্রতিপক্ষ অনেক সময় রূঢ় ও অভদ্র আচরণ করতে পারেন। এমনকি বিরল ক্ষেত্রে বিচারকরাও জুনিয়র আইনজীবীদের ধমক দিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। আর প্রতিপক্ষ যদি বুঝতে পারে যে- আপনি ভীত, তবে তারা আপনার ওপর চড়াও হওয়ার সুযোগ নেবেন। আমাদের প্রেক্ষাপটে অনেক সময় মার্জিত হওয়াকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বিষয়টিকে আরো সংবেদনশীল করে তোলে। বাবা শিখিয়েছিলেন যে, যদি কোনো সহকর্মী আইনজীবী এমন আচরণ করেন, তবে আমাদের এই বাক্য দিয়ে তার পাল্টা জবাব দেওয়া উচিত, ‘মাই লর্ডস, আমার বিজ্ঞ বন্ধুর আচরণ এ আদালতের সুউচ্চ মর্যাদার পরিপন্থী।’ এমনকি বিচারকের আচরণের ক্ষেত্রেও মার্জিতভাবে এ প্রতিবাদ জানানো সম্ভব। মোদ্দাকথা, কারো আত্মমর্যাদায় আঘাত হানা হলে তা বিনাবাক্যে মেনে নেয়া উচিত নয়, তবে সেই প্রতিবাদটিও হতে হবে অত্যন্ত মার্জিত ও গাম্ভীর্যপূর্ণ। বাবাকে মাত্র একবার একজন সিনিয়র আইনজীবীর বিরুদ্ধে এ কৌশলটি ব্যবহার করতে দেখেছি, যিনি অতি সহজে ধৈর্য হারিয়ে ফেলতেন।

খসড়া প্রণয়নের কৌশল
পিটিশনের খসড়া তৈরির সময় বাবা সবসময় ছোট ছোট বাক্য ব্যবহারের ওপর জোর দিতেন। নিয়মটি সাধারণ হলেও তিনি এটি পালনে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। ছোট বাক্যের সুবিধা হলো এতে ব্যাকরণগত ভুল কম হয়। তবে তার চেয়েও বড় কথা, এটি যুক্তিগুলোকে সহজে বোধগম্য করে তোলে এবং বক্তব্যের ধার বাড়িয়ে দেয়। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে একটি প্রবণতা রয়েছে যে, অনেকগুলো ক্লজ বা খণ্ডবাক্য বিশিষ্ট দীর্ঘ ও জটিল বাক্য লিখলে বোধ হয় ইংরেজির ওপর দখল প্রকাশ পায়। কিন্তু স্কুলের প্রবন্ধ বা উপন্যাস লেখা আর আইনি খসড়া তৈরি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ড্রাফটিংয়ে শব্দবিন্যাসের চেয়ে অর্থের স্পষ্টতা মুখ্য। তিনি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন যেন আমরা বিশ্লেষণের বাহুল্য বর্জন করি। তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট, বিশ্লেষণ ছাড়াই আপনাকে মামলার বর্ণনা দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

তবে পেশাগত কঠোরতার পাশাপাশি তার মাঝে ছিল এক প্রবল জ্ঞানতৃষ্ণা। তিনি নিয়মিত পড়াশোনা করতেন। প্রায়ই পঠিতব্য বইয়ের তালিকা নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করতেন। এমনকি জীবনের শেষ পর্যায়েও শেক্সপিয়রের সমগ্র নাট্যসম্ভার সংগ্রহ করেছিলেন। আদালতে নিজের মামলার ডাক আসার অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় হোক, ভ্রমণে কিংবা বাড়িতে অবসরে, তিনি সবসময় বই পড়তেন।

‘প্রতিদিনই নতুন সম্ভাবনার দিন’
আদালতে যখন আমাদের কোনো দিন খুব খারাপ কাটত। মনে হতো সব আশাই শেষ, তখন বাবা আমাদের মনে করিয়ে দিতেন, ‘প্রতিটি দিনই এক নতুন দিন’। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি সূর্যোদয় নতুন কোনো ফল বয়ে আনতে পারে। আজ যে বিচারক আমাদের যুক্তিতে সায় দিচ্ছেন না, কাল হয়তো তিনি তা বিবেচনায় নেবেন। মাঝে মধ্যে এমনটি সত্যিই ঘটত। শুরুতে যে বেঞ্চ আপনার বিপক্ষে ছিল, পরে তাদের যুক্তি দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারার চেয়ে বড় তৃপ্তি আর নেই। তাই অনেক সময় শুনানি মুলতবি করে অন্য কোনো দিন আবার শুরু করাটা ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। মূলকথা ছিল, পরিস্থিতি কঠিন হলেও হাল ছাড়া যাবে না। তিনি আমাদের পরামর্শ দিতেন সব গুরুত্বপূর্ণ মামলা একদম শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার। যার অর্থ ছিল আপিল করা এবং প্রয়োজনবোধে রিভিউ পিটিশন বা পুনর্বিবেচনার আবেদন দাখিল করা।

তবে এ দর্শনের একটি বিপরীত দিকও তিনি আমাদের শিখিয়েছেন। যখন বেঞ্চ আমাদের প্রতি সহমর্মী থাকত এবং যুক্তির প্রবাহ অনুকূলে থাকত, তখন তিনি দ্রুত শুনানি শেষ করার তাগিদ দিতেন। কারণ, আগামীকালকের দিনটি সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। আজকের নমনীয়তা কাল নাও থাকতে পারে; তাই অনুকূল সুযোগকে দীর্ঘায়িত না করে দ্রুত ফল লাভ করা ছিল তার বিচক্ষণতা।

আত্মসমীক্ষা ও বিজ্ঞজনদের পরামর্শ
বাবার একটি বিশেষ গুণ ছিল; তিনি সবসময় নিজের ব্যর্থতা ও ভুলগুলো ব্যবচ্ছেদ করে মূল্যায়ন করতেন। তিনি আমাদের সেই হাদিসটি মনে করিয়ে দিতেন যে, একজন মুমিন একই ভুল দুবার করে না। তাই তিনি প্রায়ই তার জুনিয়রদের সাথে আলোচনা করতেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজে তিনি আর কী কী ভিন্নভাবে করতে পারতেন। প্রায়ই তিনি এটি লিখিতভাবে করতেন। বাবা লিখে চিন্তা করতে পছন্দ করতেন। তার একটি ডায়েরিতে নিজের উদ্দেশ্যে লেখা নোটে তিনি নিজেকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘কলমের সাহায্যে চিন্তা করো’।

যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় তিনি তার জুনিয়র, বন্ধু, সহকর্মী এবং আমার মায়ের সাথে পরামর্শ করতেন। আমি দেখেছি, প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিতে তিনি ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, মইনুল হোসেন, খন্দকার মাহবুব হোসেন, মওদুদ আহমদ এবং এ এফ হাসান আরিফের মতো সিনিয়রদের ফোন করতেন।

ভারসাম্যপূর্ণ জীবন
মঙ্গলবার এবং বৃহস্পতিবার বাবা চেম্বারে যেতেন না। আদালত থেকে সরাসরি বাড়ি ফিরতেন। এটি ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের চেম্বার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল; কারণ সেখানে আমাদের মঙ্গলবার তো বটেই, এমনকি বৃহস্পতিবারও গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হতো। বাবার কাছে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের অর্থ ছিল বন্ধু এবং পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ রাখা।

মানসিক স্থিরতা ও আত্মসংযম
আদালতে বাবা খুব কম মেজাজ হারাতেন। এমনকি চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তেও শান্ত ও মার্জিত আচরণ বজায় রাখতেন। কিছু মামলায় (বিশেষ করে জামায়াত ও সংগঠনটির নেতা কিংবা আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের আদালত অবমাননার শুনানির সময়) তাকে অত্যন্ত মারমুখী বেঞ্চের মোকাবেলা করতে হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন না যে, গলার স্বর উঁচিয়ে কোনো যুক্তি জোরালো করা যায়। বরং তার দর্শন ছিল ভিন্ন, তিনি আমাদের বলতেন, রেগে গেলে যুক্তি সাধারণত দুর্বল হয়ে পড়ে। একজন তরুণ আইনজীবী হিসেবে আমার জন্য এটি মেনে চলা কঠিন ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের শুরুর দিকে যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের মামলার শুনানি হতো, তখন অনেক সময় আমার কাছে মনে হতো পরিষ্কার অবিচার করা হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তগুলোতে বাবার ওই শিক্ষা গভীরভাবে উপলব্ধি করতাম। অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রতিকূল ও বৈরী পরিবেশে আমাদের সাক্ষ্য-জেরা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হতো। তদুপরি, বিবাদীপক্ষের দাখিলকৃত প্রমাণাদি সরাসরি প্রাসঙ্গিক হওয়া সত্ত্বেও ট্রাইব্যুনাল প্রায়ই সেগুলো গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাত। এমন পরিস্থিতিতে মাথা ঠাণ্ডা রাখা সহজ ছিল না। বাবার পরামর্শ ছিল খুব সাধারণ, তিনি আমাকে শান্ত থাকতে বলতেন। এ ছাড়া পরামর্শ দিয়েছিলেন, কথা বলতে দাঁড়ানোর আগে যেন আমি মনে মনে ‘দরুদ শরিফ’ পাঠ করি। তার মতে, আদালতের উদ্দেশে বক্তব্য শুরুর আগে নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার এটি একটি কার্যকর উপায়। আমি তার এ উপদেশ মেনে চলতাম। এটি সত্যিই কাজে দিত। তখন থেকে এটি আমার একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

পোশাক-পরিচ্ছদ
বাবা নিজের পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে ছিলেন অসম্ভব সচেতন। আসলে ‘সচেতন’ শব্দটি খুব ছোট হয়ে যায়, তিনি সবসময় নিখুঁত পরিপাটি থাকতেন। তার শার্টগুলো থাকত চমৎকার ইস্ত্রি করা, ব্যান্ডগুলোতে কোনো ভাঁজ থাকত না; এক কথায় সব দিক থেকে তিনি পরিপাটি থাকতেন। আদালতে যাওয়ার আগে তিনি প্রায়ই মাকে জিজ্ঞেস করতেন, তার পোশাকের সমন্বয় ঠিক আছে কি না। তার মতে, একজন আইনজীবীর বাহ্যিক অবয়ব তার ওকালতির অংশ। একজন আইনজীবীর কাজ কেবল সুনিপুণ বিতর্ক বা সওয়াল-জবাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার অবয়বেও সেই সামর্থ্যরে প্রতিফলন থাকা আবশ্যক। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিতেন (বিশেষ করে আমাকে, কারণ তার জুনিয়রদের মধ্যে আমিই ছিলাম সবচেয়ে অগোছালো) যে কারো মাথার চুলও তার পোশাকের একটি অংশ। তিনি মনে করতেন, পারিপাট্যহীন বেশভূষা আসলে একজন মানুষের বিশৃঙ্খল মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। ভালো মানের আতরের প্রতিও তার এক ধরনের অনুরাগ ছিল। এ আতরগুলো তিনি বেশ যত্নসহকারে নির্বাচন করতেন। তবে তিনি মোটেই অপব্যয়ী ছিলেন না। তার লক্ষ্য প্রদর্শন করা বা লোক দেখানো ছিল না, বরং শৃঙ্খলার পরিচয় দেয়া ছিল এর লক্ষ্য। তিনি প্রত্যাশা করতেন যে, আমরা সবাই তার এ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করব। এটি আমার জন্য বেশ কঠিন ছিল, কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমি এসব বিষয়ে বরাবর উদাসীন। বাবা আমার এ অগোছালো ভাব একদম মেনে নিতে পারতেন না। তিনি মাঝে মধ্যে মায়ের কাছে আমার নামে নালিশ করতেন, যেন তিনি আমাকে যেটা বোঝাতে পারেননি, মা হয়তো সেটা পারবেন।

বাবার চেম্বারের একটি নিয়ম ছিল, সন্ধ্যায় সব আইনজীবীকে টাই পরতে হবে। সত্যি বলতে, জুনিয়ররা এ নিয়ম খুব একটা পছন্দ করতেন না। দিনের শেষে যখন সবাই ক্লান্ত, তখন নিয়মটি শৃঙ্খলার এক বাড়তি চাপ তৈরি করত। তবে সময়ের ব্যবধানে শেষ পর্যন্ত নিয়মটি আর টেকেনি। তার জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে আমার যেখানে পোশাকের ব্যাপারে এক ধরনের ঢিলেঢালা ভাব ছিল, সেখানে সন্ধ্যাবেলায় টাই পরার সেই কড়াকড়ি ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। তবে আমার ধারণা, মার্জিত বেশভূষার ব্যাপারে বাবার সেই অনড় অবস্থান শেষাবধি আমার ওপর কিছুটা প্রভাব বিস্তার করেছিল। যদিও সহসা তা ঘটেনি। সেই সময়ে বিষয়টিকে অনাবশ্যক, এমনকি আতিশয্য বলে মনে হতো। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষ বুঝতে শুরু করে, এ বিষয়গুলো কেবল বাহ্যিক বা লোক দেখানো কিছু নয়। একজন মানুষের বেশভূষা তার ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে; যা তার প্রস্তুতি, নিয়মবর্তিতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি তার সম্মান প্রদর্শনকে ফুটিয়ে তোলে। কালক্রমে আমি নিজেও আমার আইনি পোশাক-আশাকের বিষয়ে আগের তুলনায় অধিকতর সচেতন হয়ে উঠি। তবু এই কথা অনস্বীকার্য যে, পারিপাট্যের সেই যে মান তিনি বজায় রাখতেন, তা আমি কখনো স্পর্শ করতে পারিনি।

বাবার প্রস্থান
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে বাবার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ফেব্রুয়ারি থেকে তাকে দফায় দফায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। ১৯ এপ্রিল সকালে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ফজর নামাজের পর ভোরে তিনি পরিবারের সবাইকে তার রুমে ডাকলেন। সংক্ষিপ্ত একটি দোয়া পরিচালনা করলেন। এরপর তিনি আমাদের বললেন যেন তাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে সন্ধ্যার দিকে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। চিকিৎসকরা তাকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখার সুপারিশ করেন, যাতে তারা তার মূল শারীরিক জটিলতাগুলো নিরসনের সুযোগ পান। কৃত্রিম উপায়ে জীবন ধারণের এ ব্যবস্থার (লাইফ সাপোর্ট) বিষয়ে বাবা আমাদের জন্য কোনো পূর্বনির্দেশনা রেখে যাননি। আইসিইউর চিকিৎসকরা সুস্থ হওয়ার কিছুটা আশা দেখালেন। আমরা তাকে লাইফ সাপোর্টে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। এটি তার জীবনের দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। বাবা সবসময় একটি মামলাকে একদম শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ায় বিশ্বাস করতেন। আইনের পথে যদি আপিল বা রিভিউয়ের সামান্যতম সুযোগও থাকত, তবে কৌশলগত বড় কোনো কারণ না থাকলে সেটাকে নিজের দায়িত্ব মনে করতেন। পরদিন তাকে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়। কিন্তু তিনি আর সেরে ওঠেননি। ২০২৫ সালের ৪ মে বিকেল ৩টা ৪৮ মিনিটের দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি