স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষণেই কাঁচা চামড়ার দাম বাড়বে

চামড়ার মূল্যটা যেহেতু সমাজের অসহায় মানুষদের প্রাপ্য, সুতরাং চামড়ার দাম কমায় আড়তদার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান এবং গরিব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থায় কাঁচা চামড়ার মূল্য বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধ করতে হবে। চামড়ার বাজার মনিটরিং এবং এলাকায় এলাকায় আড়ত গড়ে তুলতে হবে। কোরবানির দিনে জবাই করা পশুর চামড়া ওই দিনই বিক্রি না করে নিজেদের উদ্যোগে সংরক্ষণ এবং অন্যান্য পণ্যের মতো বছরজুড়ে বিক্রি করতে হবে। গরিব মানুষ এবং অর্থনীতির কল্যাণে কাঁচা চামড়ার যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করতেই হবে।

সময়ের সাথে গরুর দাম বাড়লেও কোরবানির পশুর চামড়ার দাম বাড়েনি। দশ-বারো বছর আগে কোরবানির পশুর চামড়ার অনেক দাম ছিল। এখন দাম কমে যাওয়ায় অনেকে চামড়া ফেলে দেন, গর্ত করে মাটিতে পুঁতে ফেলেন। আবার ক্রয়মূল্যের চেয়ে বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় অনেকে কেনা চামড়া বিক্রি করতে পারেন না। অথচ এই চামড়া দিয়ে সেন্ডেল, জুতা, ব্যাগ, বেল্টসহ অনেক পণ্য হয়। বাজারে এগুলোর দামও ভালো।

চামড়াজাত পণ্যের দাম বেশি হলে ও কাঁচা চামড়ার দাম আমাদের এখানে কম। ফিনিশড প্রোডাক্টের দামের সাথে এর কাঁচামালের দামের সম্পর্ক থাকে। একটি ফিনিশড পণ্যের দাম তার কাঁচামালের দামের চেয়ে দ্বিগুণ বা তার কাছাকাছি হয়; অর্থাৎ কাঁচামালের দাম ফিনিশড পণ্যের দামের অর্ধেক বা তার কাছাকাছি হওয়ার কথা।

ঈদুল আজহায় দেশে প্রায় এক কোটি পশু জবাই হয়। সুতরাং কাঁচা চামড়ার সংখ্যাও প্রায় এক কোটি। কোরবানিদাতারই কাঁচা চামড়ার প্রথম জোগানদাতা। খুচরা ব্যবসায়ীরা কোরবানিদাতার ঘরে ঘরে গিয়ে চামড়া ক্রয় এবং আড়তদারদের কাছে বিক্রি করে। আড়তদাররা প্রাথমিকভাবে লবণ এবং প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করে। ট্যানারি মালিকরা আড়তদারদের থেকে কিনে নেয়। উৎসস্থল থেকে ট্যানারিতে পৌঁছা পর্যন্ত যতবার হাতবদল হয়, ততবারই চামড়ার দাম বাড়ে। মধ্যস্বত্বভোগী যত, ততবারই চামড়া বিক্রি হয়। মধ্যস্বত্বভোগীরাই চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। তারা কম দাম নির্ধারণ করলেও চামড়া বিক্রি না করে উপায় থাকে না কোরবানিদাতাদের। কারণ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিক্রি করতে না পারলে চামড়ায় পচন ধরে। এ অবস্থায় কোরবানিদাতার দরকষাকষি এবং অপেক্ষার সুযোগ থাকে না। এ সুযোগটিই মধ্যস্বত্বভোগীরা কাজে লাগায়, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করে। এ কারণেই উৎসস্থলে চামড়ার মূল্য কম, যা খুবই দুঃখজনক।

কয়েক বছর থেকে সরকার কোরবানির পশুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। ২০২৬ সালে গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুট মূল্য ঢাকা শহরে ৬২-৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়, ঢাকার বাইরে ৫৭-৬২ টাকা। ছাগলের চামড়ার মূল্য সারা দেশে ২৫-৩০ টাকায় নির্ধারণ করেছে। অথচ ২০১৩ সালে ঢাকায় গরুর চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ছিল ৮৫-৯০ টাকা। ছাগলের চামড়ার দাম ছিল ৫০-৫৫ টাকা। ২০১৩ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে চামড়ার দাম কমেছে। কিন্তু অন্য সব কিছুর দাম সময়ের সাথে বেড়েছে।

সরকার কর্তৃক চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ায় ওপেন মার্কেটে চামড়ার মূল্য নির্ধারণের সুযোগটা কমে যায়। পুরোপুরি আয়তকার বা বর্গাকার না হওয়ায় চামড়ার প্রকৃত সাইজ নির্ধারণ করা আমজনতার পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে চামড়ার মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতাটা ক্রেতার হাতে চলে যায়। অধিকাংশ পণ্যের দাম ওপেন মার্কেটে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্ধারিত হলেও কোরবানি পশুর চামড়ার দাম সরকার কর্তৃক নির্ধারিত। অথচ জবাইকৃত পশুটির মূল্য বাজারে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে।

বারো-তেরো বছর আগেও চামড়া কিনতে ব্যবসায়ীরা কোরবানিদাতাদের বাড়িতে গিয়ে পশুর সাইজ, রঙ ও চামড়ার কোয়ালিটি দেখে চামড়া কিনতেন। অনেক সময় জবাইয়ের আগেই পশুর চামড়া বিক্রি হয়ে যেত এবং ব্যবসায়ীরা মূল্য অগ্রিম পরিশোধ অথবা বুকিং মানি দিতেন। সেই দৃশ্য এখন নেই। পশু জবাইয়ের পর কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও চামড়া কিনতে কেউ আসে না।

স্থানীয় পর্যায়ে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ কাঁচা চামড়ার বাজারকে রক্ষা করতে পারে। আড়তদাররা কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ এবং পরে চাহিদানুযায়ী বিক্রি করেন। ফলে তাদের লোকসান হয় না। জোগান বেশি হলে দাম কমে যাওয়া অর্থনীতির মূল নীতি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এ দিনে সব চামড়া বিক্রি না করে বছরজুড়ে ধারাবাহিকভাবে চামড়া বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য গ্রামে গ্রামে চামড়া সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। একটি এলাকার চামড়া এক জায়গায় একত্র করে লবণ এবং প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল দিয়ে সংরক্ষণ করলে ঈদুল আজহার দিনে চামড়া নিয়ে অব্যবস্থাপনা বন্ধ হবে। দামও বাড়বে। এটি জটিল কোনো কাজ নয়। এর জন্য বেশি টাকারও দরকার হবে না। চামড়া সংরক্ষণে অত্যাধুনিক কোনো টেকনোলজির প্রয়োজন হয় না। গ্রাম-ইউনিয়ন-উপজেলাভিত্তিক আড়ত গড়ে তুলতে হবে। ঘরে মাটিতে বিছানার ওপর চামড়াগুলো পরিষ্কার করে লবণ দিয়ে স্তরে স্তরে রেখে দিলেই হবে। পানি থেকে রক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনীয় সময়ে আপনি চামড়াগুলো বিক্রি করতে এবং লোকসান থেকে রক্ষা পাবেন। এভাবে সংরক্ষণ করলে কোরবানির দিন কাঁচা চামড়া নিয়ে টেনশন এবং শহরে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না। আড়তদারের কাছে চামড়া বিক্রির জন্য অনুরোধও করতে হবে না। এ পদ্ধতিটি গ্রহণ করলে কাঁচা চামড়ার বাজারে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে।

চামড়ার মূল্যটা যেহেতু সমাজের অসহায় মানুষদের প্রাপ্য, সুতরাং চামড়ার দাম কমায় আড়তদার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান এবং গরিব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থায় কাঁচা চামড়ার মূল্য বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধ করতে হবে। চামড়ার বাজার মনিটরিং এবং এলাকায় এলাকায় আড়ত গড়ে তুলতে হবে। কোরবানির দিনে জবাই করা পশুর চামড়া ওই দিনই বিক্রি না করে নিজেদের উদ্যোগে সংরক্ষণ এবং অন্যান্য পণ্যের মতো বছরজুড়ে বিক্রি করতে হবে। গরিব মানুষ এবং অর্থনীতির কল্যাণে কাঁচা চামড়ার যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করতেই হবে।

লেখক : প্রকৌশলী

[email protected]