জ্বালানি তেলের আগুনে বোরো ধান

জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। কৃত্রিম সঙ্কট ও মজুদদারি অনেক সময় প্রকৃত ঘাটতির চেয়েও বড় অস্থিরতা সৃষ্টি করে। একই সাথে কৃষকদের জন্য ডিজিটাল ভর্তুকি ব্যবস্থা চালু করা দরকার, যাতে ডিজেল ও সার ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যায়। খাদ্য মজুদ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকভাবে তিন থেকে ছয় মাসের খাদ্য মজুদকে নিরাপদ ধরা হয়। বাংলাদেশে এই সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক সঙ্কটের সময় বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। অন্য দিকে কৃষি প্রযুক্তির আধুনিকায়ন অপরিহার্য। স্মার্ট সেচ, ড্রিপ ইরিগেশন এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার উৎপাদন ব্যয় ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। পাশাপাশি ফসল বীমা ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষক প্রাকৃতিক ও বাজার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এখনো গভীরভাবে কৃষিনির্ভর। এই কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ধান উৎপাদন, যা কেবল খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি নয়; গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিও। মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ হয় বোরো মৌসুমে। এটি পুরোপুরি সেচনির্ভর। ফলে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সামান্য অস্থিরতাও সেচ ও সারের সঙ্কট সৃষ্টি করে এবং দাম বাড়ায়। এতে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় ও সক্ষমতায় প্রভাব পড়ে। বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত নৌপথের অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক তেলবাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। বিশেষ করে কৃষি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ডিজেলের পুরোটাই আমদানি করতে হয়। বছরে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হয়, যার বড় অংশ কৃষি, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহার হয়। কৃষি খাতে ব্যবহৃত ডিজেলের পরিমাণ ৯ থেকে ১০ লাখ টন, যা প্রধানত বোরো মৌসুমে সর্বোচ্চ চাপে থাকে।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় বছরে প্রায় দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই অতিরিক্ত ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ডলারের বিনিময় হার বাড়িয়ে দেয়। এতে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি ও কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। তবে সঙ্কট কেবল বৈশ্বিক নয়; অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এক হেক্টর জমিতে গড়ে ১২০ থেকে ১৫০ লিটার ডিজেল দরকার হয়। দেশের প্রায় ৪ দশমিক ৮ থেকে পাঁচ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হওয়ায় মৌসুমজুড়ে প্রায় আট থেকে ৯ লাখ টন ডিজেল ব্যবহার হয়। এই বিশাল চাহিদা পূরণে সামান্য ঘাটতিও উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে।

অন্য দিকে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের অদক্ষতা অনেক সময় প্রকৃত ঘাটতির চেয়েও বড় সঙ্কট তৈরি করে। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতি লিটার ডিজেল নির্ধারিত দামের চেয়ে ১৫ থেকে ৮০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ আছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এর সাথে যুক্ত হয় মজুদদারি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি, যা বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে। এই দ্বৈত চাপ কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে পাম্পগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেলে সেচ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ফসলের বৃদ্ধি ও উৎপাদনের ওপর।

এই প্রেক্ষাপটে বোরো ধান উৎপাদনের অর্থনৈতিক কাঠামো জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। মোট ধান উৎপাদনের ৫৫ শতাংশের বেশি আসে বোরো মৌসুম থেকে, যার পরিমাণ প্রায় ২.১ থেকে ২.২ কোটি টন। কিন্তু এই উৎপাদনের পেছনে জ্বালানি ব্যয় অনেক বেশি। প্রতি হেক্টরে ১২০ থেকে ১৫০ লিটার ডিজেল ব্যবহার হওয়ায় শুধু সেচ খরচই বছরে প্রায় ৭৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যায় (গড় ১২০ টাকা লিটার হিসাবে)।

ব্যয় বাড়ার প্রভাব সরাসরি কৃষকের লাভের ওপর পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদন ব্যয় ও বাজারমূল্য প্রায় সমান হয়ে যাচ্ছে, ফলে কৃষকের মুনাফা ৫ থেকে ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে লোকসানের অবস্থাও তৈরি হচ্ছে।

জ্বালানি সঙ্কটে সেচ ব্যাহত হলে ফসলের ফলন কমে যায়। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও হাওর অঞ্চলে এই ঝুঁকি আরো বেশি। এসব এলাকায় বৃহৎ আকারে সেচনির্ভর কৃষি হয়। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ সেচ ব্যাহত হলেও মোট উৎপাদনের ৮ থেকে ১২ লাখ টন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা।

যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা কৃষিকে আরো জ্বালানি-সংবেদনশীল করে তুলেছে। হারভেস্টার ও থ্রেশার ব্যবহারের জন্য ডিজেল অপরিহার্য। সঙ্কটের কারণে এগুলো সচল রাখতে না পারলে ফসল কাটতে দেরি হয়, ফলে অতিবৃষ্টি বা ঝড়ে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। সময়মতো কাটাই না হলে প্রতি বছর গড়ে ৫ থেকে ৭ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা সঙ্কটকালে ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।

ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড তুলনামূলকভাবে কম জ্বালানিনির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন পরিচালনা করছে। সেখানে প্রতি কেজি ধান উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১৫ থেকে ১৮ টাকার মধ্যে সীমিত। বাংলাদেশে তা ২৪ থেকে ২৮ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। এই পার্থক্য মূলত প্রযুক্তি, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি দক্ষতার ব্যবধানকে নির্দেশ করে।

জ্বালানি সঙ্কটের প্রভাব সার উৎপাদন ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে। ইউরিয়া উৎপাদন প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর হওয়ায় গ্যাস সঙ্কট বা জ্বালানি অস্থিরতার সময় সার কারখানাগুলো আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে সার আমদানি করতে হয়। ২০২৩-২৫ সময়ে সারের দাম ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।

এই পুরো পরিস্থিতি খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা মূলত তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে- উৎপাদন, সরবরাহ এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা। এ তিনটির যেকোনো একটিতে বিঘ্ন ঘটলেই পুরো ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সঙ্কট সরাসরি কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে এবং পরোক্ষভাবে বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে।

এই সরবরাহ ঘাটতির প্রভাব সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যপণ্যের দাম ১ শতাংশ বাড়লে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি প্রায় দশমিক ৪ থেকে দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে বোরো ধানের উৎপাদন ও সরবরাহে সঙ্কোচন ঘটলে মোট মূল্যস্ফীতি ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে।

এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর। শহরাঞ্চলে খাদ্য ব্যয়ের অনুপাত বেশি হওয়ায় চালের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়লে বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী খাদ্য গ্রহণ কমাতে বাধ্য হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিহীনতা, শিশুর বিকাশে বাধা এবং মানবসম্পদ ক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি করে।

গত পাঁচ বছরে বোরো ধান উৎপাদনের খরচ প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে, অথচ বাজারমূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে কৃষকের প্রকৃত আয় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমেছে। এতে কৃষি ঋণ নির্ভরতা বছরে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে।

অনেক কৃষক উচ্চসুদের ঋণ নিয়ে বোরো চাষ করছেন; কিন্তু উৎপাদন শেষে পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় তারা ঋণচক্রে আটকে পড়ছেন। একই সাথে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের একটি অংশ কৃষি কার্যক্রম থেকে সরে আসছে। এতে কৃষি শ্রমিকের চাহিদাও কমছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কৃষি খাতে শ্রম চাহিদা ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমে গেলে প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ মানুষের আংশিক কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ে। এতে গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন বাড়ে, নগর অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ বাড়ায়।

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা বহুমাত্রিক ও আন্তঃসংযুক্ত সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি নির্ভরতা, কৃষি কাঠামো এবং বৈশ্বিক বাজার অস্থিরতা একসাথে কাজ করছে।

ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরশক্তিনির্ভর সেচ ব্যবস্থার দিকে এ গুতে হবে। ভারত ও ভিয়েতনাম সোলার পাম্প ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে। বাংলাদেশেও যদি মোট সেচ ব্যবস্থার ২০-২৫ শতাংশ সৌরশক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তাহলে ডিজেল খাতে ব্যয় বছরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। কৃত্রিম সঙ্কট ও মজুদদারি অনেক সময় প্রকৃত ঘাটতির চেয়েও বড় অস্থিরতা সৃষ্টি করে। একই সাথে কৃষকদের জন্য ডিজিটাল ভর্তুকি ব্যবস্থা চালু করা দরকার, যাতে ডিজেল ও সার ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যায়। খাদ্য মজুদ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকভাবে তিন থেকে ছয় মাসের খাদ্য মজুদকে নিরাপদ ধরা হয়। বাংলাদেশে এই সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক সঙ্কটের সময় বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। অন্য দিকে কৃষি প্রযুক্তির আধুনিকায়ন অপরিহার্য। স্মার্ট সেচ, ড্রিপ ইরিগেশন এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার উৎপাদন ব্যয় ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। পাশাপাশি ফসল বীমা ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষক প্রাকৃতিক ও বাজার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কৃষি কাঠামোর জ্বালানিনির্ভরতা একত্রে খাদ্য ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তবে সঠিক নীতি, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। হ

লেখক : অর্থনীতিবিদ

[email protected]