যুদ্ধ এবং অস্ত্র ব্যবসায়- এই দু’টি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এটি শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; বরং বিশাল অর্থনৈতিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। মানবিক বিপর্যয়ের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কিছু গোষ্ঠী ও রাষ্ট্র এ থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। চলমান সঙ্ঘাতগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, অস্ত্রের চাহিদা ততই বাড়ে। এই চাহিদা পূরণে এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি ও চীনের মতো শীর্ষ অস্ত্র রফতানিকারক দেশ। তারা বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্ঘাতরত রাষ্ট্রগুলোতে অস্ত্র সরবরাহ করে। এতে অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা SIPRI-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অস্ত্র স্থানান্তর উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে বিশ্বনিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো অস্থিতিশীল হয়েছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অস্ত্রশিল্প একটি লাভজনক খাত। যুদ্ধপরিস্থিতিতে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, গোলাবারুদ, যুদ্ধবিমান এবং সামরিক প্রযুক্তির চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। ফলে বহু প্রতিরক্ষা কোম্পানি তাদের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করে। যুদ্ধ যত তীব্র হয়, এই শিল্প ততই সমৃদ্ধ হয়। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়ে গেলে অস্ত্রের চাহিদা কমে যায়- এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক সময় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করে। ফলে মানবিক দিক থেকে যুদ্ধ বন্ধের দাবি থাকলেও, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় সেই পথকে জটিল করে তোলে।
যুদ্ধের ফলাফল ভয়াবহ। মানুষের প্রাণ যায়। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। বৈশ্বিক অর্থনীতি ধ্বংস করে এবং দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য বাড়ায়। জ্বালানি, খাদ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে অনুভূত হয়।
মধ্যপ্রাচ্য সঙ্ঘাত : অস্ত্র ব্যয় ও যুদ্ধ অর্থনীতি
মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুমান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরাইল-ইরান সঙ্ঘাতের মধ্যেই মোট সামরিক ব্যয় ৭৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে- আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা ব্যবহার, বিমান, নৌবাহিনীর মোতায়েন ব্যয়, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয়করণ, সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা ও লজিস্টিক খরচ। তবে ব্যয়ের প্রকৃত পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে, কারণ এতে গোপন সামরিক ব্যয়, লজিস্টিক, পুনরায় অস্ত্র উৎপাদন ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিপূরণ অন্তর্ভুক্ত নয়।
এই সঙ্ঘাতে সবচেয়ে ব্যয়বহুল অংশ হলো ‘নির্ভুল লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ’। একটি আধুনিক টমাহক ক্রুজ মিসাইলের দাম ২৬-৪৮ কোটি টাকা এবং ব্রাহমোস ক্রুজ মিসাইলের দাম ৪২-৬০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। উন্নত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের একটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের ৬০ লাখ থেকে এক কোটির ওপর। ড্রোন তুলনামূলকভাবে সস্তা হলেও, তা প্রতিহত করতে ব্যবহার হওয়া প্রযুক্তি অনেক ব্যয়বহুল। ফলে একটি অদ্ভুত অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়।
সস্তা আক্রমণ বনাম ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা। এই অসম সমীকরণ যুদ্ধকে শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও টেকসই সঙ্কটে পরিণত করে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে। যেমন- ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী প্রযুক্তি ও আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক। এই সিস্টেমগুলো সক্রিয় রাখতেই প্রতিদিন বিপুল ব্যয় হয়।
যুদ্ধ অর্থনীতির চালিকাশক্তি
যুদ্ধ কি কেবল নিরাপত্তার বিষয়, নাকি অর্থনীতিরও অংশ? আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, আধুনিক অস্ত্রশিল্প এত বড় একটি অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কিছু শিল্প ও কোম্পানি সরাসরি লাভবান হয়। মার্কিন-ইসরাইল-ইরান উত্তেজনা সেই বাস্তবতা আরো স্পষ্ট করে তুলেছে।
এ বছর এপ্রিল পর্যন্ত সঙ্ঘাতের যে ব্যয় আমরা দেখেছি, তা যদি গঠনমূলক কাজে যেমন স্কুল বা হাসপাতাল তৈরিতে ব্যবহার হতো, তবে তার ফলাফল হতো অভাবনীয়। নিচে যুদ্ধের আনুমানিক খরচের (আমেরিকা, ইসরাইল ও ইরানের সম্মিলিত ব্যয় প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার) বিপরীতে কী পরিমাণ উন্নয়ন করা সম্ভব ছিল, তার একটি তুলনামূলক চিত্র দেয়া হলো :
যুদ্ধের খরচে : প্রায় ৩৭৫টি আন্তর্জাতিক মানের এক হাজার শয্যার মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল নির্মাণ করা যেত। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজারটি সম্পূর্ণ নতুন এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা সম্ভব ছিল। একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ($৪ মিলিয়ন) : এর বদলে প্রায় ৪০টি উন্নত লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স কেনা যেত। একটি টমাহক ক্রুজ মিসাইল ($২.৫ মিলিয়ন) : এর বদলে প্রায় ২০টি গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ ও সজ্জিত করা যেত। একটি আয়রন ডোম মিসাইল ($৫০ হাজার) : এর বদলে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষার্থীর এক বছরের পড়াশোনার খরচ চালানো যেত। এই ৭৫ বিলিয়ন ডলার দিয়ে প্রায় ২০টি পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল অথবা বিশ্বের কয়েক শ’ শহরের সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে নবায়নযোগ্য সৌরশক্তিতে রূপান্তর করা যেত।
নতুন অস্ত্রের সক্ষমতা পরীক্ষা
নতুন অস্ত্রের সক্ষমতা পরীক্ষার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগার হয়ে ওঠে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র। সাধারণত কোনো অস্ত্র বা সামরিক প্রযুক্তি প্রথমে গবেষণাগার ও প্রশিক্ষণ মাঠে পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু সেখানে পরিবেশ থাকে নিয়ন্ত্রিত, সীমাবদ্ধ ও পূর্বনির্ধারিত।
অন্য দিকে যুদ্ধক্ষেত্রে সব কিছুই অনিশ্চিত- লক্ষ্যবস্তু বাস্তব, প্রতিপক্ষ সক্রিয় ও কৌশলী, পরিবেশ অপ্রত্যাশিত এবং ফলাফল তাৎক্ষণিক। ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, দূরপাল্লার ক্রুজ মিসাইল, ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং উন্নত নির্দেশিত অস্ত্রের লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা, গতি ও নির্ভুলতা বাস্তব পরিস্থিতিতে যাচাই করা হয়। ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা থেকেই নতুন সংস্করণ (Upgrade) তৈরি হয়।
শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র কত দ্রুত শনাক্ত ও ধ্বংস করা যায়- তা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। নজরদারি ড্রোন, আত্মঘাতী ড্রোন এবং ঝাঁক (Swarm) ড্রোন ব্যবস্থার বাস্তব সক্ষমতা যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে দ্রুত বোঝা যায়। যোগাযোগব্যবস্থা জ্যাম করা, রাডার বিভ্রান্ত করা বা স্যাটেলাইট সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ- এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতাও বাস্তব সঙ্ঘাতে পরীক্ষা করা হয়।
আধুনিক যুদ্ধকে অনেক গবেষক সংক্ষেপে এভাবে ব্যাখ্যা করেন- ‘যুদ্ধ শুধু সঙ্ঘাত নয়, এটি একই সাথে বাস্তব সময়ের প্রযুক্তি উন্নয়নের প্রক্রিয়া।’ এই প্রক্রিয়ায় অস্ত্র যেমন উন্নত হয়, তেমনি মানব সমাজও গভীর অস্থিরতার মধ্যে পড়ে যায়।’
যুদ্ধ শুধু শক্তির প্রদর্শনী নয়; এটি একইসাথে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মানবতার কঠিন পরীক্ষাও। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- উন্নয়নের প্রকৃত মূল্য তখনই অর্থবহ, যখন তা ধ্বংস নয়; বরং শান্তি ও কল্যাণের পথে পরিচালিত হয়।
লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা



