বিজ্ঞানীদের তথ্য মতে, পৃথিবীতে প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন প্রজাতির আনুমানিক ১০৩০ জীবন্ত বস্তুর (Livising things) অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত জীবন্ত বস্তুর প্রায় ৮২ শতাংশ উদ্ভিদ, ১৩ শতাংশ ব্যাকটেরিয়া এবং মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ, প্রাণী, পোকামাকড়, ছত্রাক, মাছসহ অন্য সব জীব রয়েছে। সমস্ত জীবের মধ্যে শুধু মানুষকেই (০.০১ শতাংশ) ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, আসল-নকল, সত্য-মিথ্যা ইত্যাদি বুঝার, চিন্তা করার উচ্চক্ষমতা প্রদান করেছেন।
মস্তিষ্ক মানুষকে পৃথিবীতে সৃষ্টির সেরাজীব বানিয়েছেন। দেহের মোট ৭৮টি অঙ্গের মধ্যে মস্তিষ্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল একটি অঙ্গ। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কের ওজন প্রায় ১৩০০-১৪০০ গ্রাম যার প্রায় ৮০ ভাগই পানি। ১৮ বছর বয়সে মানুষের মস্তিষ্কের বৃদ্ধি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের ২০ শতাংশ শক্তি ব্যবহার করে। বিজ্ঞানীদের গবেষণা তথ্যমতে, একজন মানুষের মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা প্রায় ২.৫ লাখ গিগাবাইট যা প্রায় ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। অপরদিকে, প্রতিটি কম্পিউটারের ধারণক্ষমতা নির্দিষ্ট এবং একটি সুপার কম্পিউটারের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা হচ্ছে মাত্র ২৬০০০ গিগাবাইটস। সুতরাং আমাদের মস্তিষ্কের ক্ষমতা অপরিসীম যা সঠিক প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা যেতে পারে।
আমাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গই গুরুত্বপূর্ণ ও আশীর্বাদস্বরূপ। তবে, মস্তিষ্কই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা আমাদের জীবনকে অর্থপূর্ণ করেছে। মস্তিষ্কের বহু ট্রিলিয়ন সিন্যাপসের জটিল ভাঁজে ভাঁজে জ্ঞান-বুদ্ধি, চিন্তা-ভাবনা, কল্পনা, উপলব্ধি, ন্যায়-অন্যায় বোধ, ইচ্ছা, স্মৃতিশক্তি, আকাক্সক্ষা-অনুভূতি, আবেগ, ঝোঁক-প্রবণতা এবং চারপাশের বিশ্ব সম্পর্কে আরো অনেক শক্তির এক বিশাল তথ্যভাণ্ডার কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে আছে। মস্তিষ্কের ক্ষমতাবলেই আমরা শ্বাস নিতে, কাজ করতে, খেলতে, লিখতে, পড়তে, চিন্তা করতে ও মনে রাখতে পারছি। এজন্যই আল্লাহ বলেন, তোমরা কেন নিজেকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছ না, যা তোমাদের দেয়া হয়েছে। কেউ যদি স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলে এক ধাক্কায় সব তথ্যভাণ্ডার হারিয়ে ফেলবে।
মস্তিষ্ক কোটি কোটি স্নায়ুকোষ দ্বারা গঠিত যাকে নিউরন বলা হয়। মানুষের মস্তিষ্ক প্রায় একশত বিশ (১২০) বিলিয়ন নিউরন নিয়ে গঠিত। প্রতিটি নিউরন অন্যান্য নিউরনের সাথে প্রায় এক হাজার সংযোগ তৈরি করে, যার পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন সংযোগেরও বেশি। মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে সংযোগের পরিমাপ করে বিজ্ঞানীরা মানুষের মস্তিষ্কের স্টোরেজ ক্ষমতা বাইট একক ধরে হিসাব করেন। একটি একক বাইট ৮ বিট নিয়ে গঠিত। একটি গবেষণায় জানা গেছে যে, একটি সিন্যাপ্স ৪.৭ বিট পর্যন্ত তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে এবং সেরিব্রাল কর্টেক্স একাই ১২৫ ট্রিলিয়ন সিন্যাপ্স ধারণ করে। সায়েন্টিফিক আমেরিকান-জার্নালের একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষের মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি ২.৫ পেটাবাইটের সমান। একটি ‘পেটাবাইট’ মানে ১০২৪ টেরাবাইট বা এক মিলিয়ন গিগাবাইট। অর্থাৎ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তার মস্তিষ্কে ২.৫ মিলিয়ন গিগাবাইটের সমতুল্য মেমরি জমা করতে পারে। একজন মানুষ যত বেশি চিন্তা করবে তত বেশি মস্তিষ্কের মেমরি ক্যাপাসিটি বা ক্ষমতা বাড়বে। কারণ মানুষের মস্তিষ্কের নির্দেশকপ্রক্রিয়া (commanding system) হচ্ছে চিন্তাশক্তি। মস্তিষ্ক তার বহু ট্রিলিয়ন সিন্যাপ্সে যে পরিমাণ তথ্য সঞ্চয় করতে পারে তা অসীম নয়, তবে এটি যথেষ্ট বড় যে আমরা যে পরিমাণ শিখতে পারি তা মস্তিষ্কের স্টোরেজক্ষমতা দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। তবে এটা স্পষ্টভাবে নিশ্চিত যে, মানুষ তার জন্মগতভাবে প্রাপ্ত মস্তিষ্কের স্টোরেজক্ষমতা তার জীবদ্দশায় ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। উপরন্তু, সৃজনশীল ও ইতিবাচক চিন্তা করে একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তার মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতার আরো ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করেছে। কম্পিউটার, ট্যাবলেট এবং স্মার্টফোনের মতো ডিভাইসগুলো আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। আমরা যখন এই ডিভাইসগুলো ক্রয় করার কথা ভাবি, তখন আমরা প্রথমে সেই নির্দিষ্ট ডিভাইসের স্মৃতি বা স্টোরেজ ক্যাপাসিট বিবেচনা করি। পৃথিবীর সমস্ত কম্পিউটারের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রতিটি কম্পিউটারের একটি নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা রয়েছে। একটি সুপার কম্পিউটারের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা হচ্ছে ২৬ পেটাবাইটস বা ২৬০০০ গিগাবাইটস যা প্রায় ১০০টি ব্যক্তিগত কম্পিউটার (পিসি) এর সমান। একটি সুপার কম্পিউটারের ধারণক্ষমতা পূরণ হয়ে গেলে সেটি লাল বর্ণ ধারণ করে এবং আর ডাটা সংরক্ষণ করতে পারে না। মানুষের মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি বা প্রতিভা মানুষের কল্পনা থেকেও অনেক বেশি যা বিকশিত করে প্রত্যেক মানুষ তার জীবনের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগাতে পারে।
মস্তিষ্কের নিজস্ব ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের উপায়
সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেক মানুষকেই একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। কোনো মানুষকেই অনর্থক তৈরি করেন নাই। আর প্রত্যেক ব্যক্তির মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। আমাদের সকলেরই উচিত মস্তিষ্কের ক্ষমতাকে যথাসম্ভব কাজে লাগানো। নিম্নোক্ত উপায়ে আমরা আমাদের মস্তিষ্কের ক্ষমতাকে শতভাগ ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারি। মস্তিষ্কের প্রায় ৮০ ভাগের অধিক পানি রয়েছে। পরিমাণ মতো পানির প্রাপ্যতার ওপর মস্তিষ্কের কোষসমূহের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। তাই মস্তিষ্কের নিজস্ব ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে প্রতিদিন নিয়মিত ও পরিমাণ মতো বিশুদ্ধ পানি পান করা প্রয়োজন। কুরআনে সূরা নাবার ৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- আল্লাহ মানুষের জন্য ঘুমকে শান্তির বাহন হিসেবে তৈরি করেছেন। অতএব, আমাদের শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে এবং দেহ ও মনে সতেজতা ফিরিয়ে আনতে প্রতিদিন কমপক্ষে ৬-৭ ঘণ্টা পূর্ণ বিশ্রাম নেয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে, রাতের ঘুমকেই প্রাধান্য দেয়া উচিত।
ধূমপান এবং অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় পান করা এড়িয়ে চলা দরকার। আর চিনিযুক্ত এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ সীমিত রাখা একান্ত আবশ্যক। স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে এমন খাবার খাওয়া যেমন সবুজ শাক, বাদাম, বাটার, ঘি, বেরি, মাছ ইত্যাদি। নিয়মিত ব্যায়াম মস্তিষ্কের কোষের বৃদ্ধি এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিকারী নিউরোট্রান্সমিটারের উৎপাদন বাড়ায়। জীবনকে শিক্ষা ও উদ্দীপনার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করে মনকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা। ভ্রমণ, খেলাধুলা ও বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ- সবই মস্তিষ্কের কোষের বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে। ধ্যান, মানসিক চাপ হ্রাস এবং সামাজিক সম্পর্কের নেটওয়ার্ক বজায় রাখা। আল্লাহ প্রদত্ত মানব মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ ব্যবহারে সদা সচেষ্ট থাকা একান্ত প্রায়োজন।
লেখক: পিএইচডি, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
মহিষ উৎপাদন গবেষণা বিভাগ, বাংলাদেশ
প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, সাভার



