মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এখন যে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তাকে এক কথায় বলা যায় ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলে যাওয়া। ইরান এবং ইসরাইলের মধ্যকার চলমান উত্তজনা আর আমেরিকার কৌশলী পিছুটান পুরো অঞ্চলকে এক নতুন সমীকরণের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ওয়াকিবহাল এক সূত্র পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, ইরান যেকোনো পরিস্থিতির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
ইরান বরাবরই তাদের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি আর চুক্তির ব্যাপারে দায়বদ্ধতা দেখিয়ে এসেছে, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তারা ভবিষ্যতের সব কটি পথই খোলা রাখছে। সেই সূত্রটি স্পষ্ট ভাষায় একটি বার্তা দিয়েছেন—ইসরাইলের এই বর্ববতার ফল থেকে কেউ রক্ষা পাবে না। যদি আমেরিকা এবং তার সহযোগীরা ইরানের জন্য সন্তোষজনক কোনো চুক্তিতে না পৌঁছায়, তবে পুরো অঞ্চল আবারো তুমুল লড়াইয়ের গনগনে আগুনের মুখে পড়বে।
অন্যদিকে, পারস্য উপসাগরের নীল পানিতে এখন এক নতুন ক্ষমতার খেলা চলছে। একসময় এই অথৈ জলরাশির অবিসংবাদিত রাজা ছিল যারা, সের্গেই পোলেতায়েভ তাদের ডাকছেন ‘আলফা নেকড়ে’ বলে। বনের সবচেয়ে শক্তিশালী নেকড়েটি যেমন তার চোখের পলক আর নখের ধার দিয়ে পুরো এলাকা শাসন করে, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দাপট ছিল ঠিক তেমন। কিন্তু সময় বদলেছে। পোলেতায়েভের ধারালো কলম বলছে, সেই প্রতাপশালী ‘আলফা নেকড়ে’ এবার তার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। শিকারের ঘাড় মটকানোর বদলে সে এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। আর যখন বনের পুরনো সর্দার পথ হারায়, তখন বাকিরা আর তার গর্জনে ভয় পায় না; বরং তারা তাকাতে শুরু করে নতুন কোনো শক্তির দিকে, যারা এখন বনের নয়া অধিপতি হয়ে ওঠার অপেক্ষায়।
বিখ্যাত তথ্য বিশ্লেষক এবং ‘ভ্যাটফর’ প্রজেক্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই পোলেতায়েভ তার এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন কিভাবে পারস্য উপসাগরের নিয়ন্ত্রণ এখন কার্যত ইরানের হাতে চলে যাচ্ছে। তার মতে, আমরা এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলোর ‘বস’ বা কর্তা বদলে গেছে।
পোলেতায়েভ বলছেন, গত ৭ এপ্রিলের পর পরিস্থিতি হুট করে বদলে যায়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই প্রলয়ঙ্করী হুমকির সুর মিইয়ে যায়। পাশাপাশি দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। এই যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে এবং ইসরাইলও এতে যোগ দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু এই বিরতি কি স্থায়ী শান্তির পথ দেখাবে, নাকি এটি বড় কোনো ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা? পোলেতায়েভ মনে করেন, পরিস্থিতি যেদিকেই যাক না কেন, ইরানই এখন চালকের আসনে।
ইরানি সূত্রটি যে সব চিত্র বা দৃশ্যাবলীর কথা বলছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে সহজ হলো আমেরিকা যদি নিজের এবং তার সঙ্গীদের মাধ্যমে একটি সম্মানজনক যুদ্ধবিরতি বজায় রাখে। ইরান এবং তাদের মিত্রদের জন্য সন্তোষজনক কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো গেলে হয়তো বড় কোনো সঙ্ঘাত এড়ানো সম্ভব।
কিন্তু তাসনিম নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ওই ইরানি সূত্রটি সতর্ক করেছেন যে, আমেরিকা চাইলে আলোচনার টেবিলে কূটচাল চালতে পারে। আলোচনা আলোচনা খেলার নামে কালক্ষেপণ করে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আমেরিকা হয়তো নিজে সরাসরি যুদ্ধ থেকে গা বাঁচাতে চাইবে কিন্তু ইসরাইলকে ইরান বা লেবাননের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেবে।
ইরানি সূত্রটির হুঁশিয়ারি খুব সরাসরি—যদি এই যুদ্ধবিরতি কোনো ইতিবাচক ফল ছাড়াই শেষ হয়, তবে গোটা অঞ্চলে আমেরিকার স্বার্থ আবারো আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলে উঠবে। শত্রুর সামনে এখন দুটি পথ: হয় ইরান ও প্রতিরোধের শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য একটি চুক্তি, না হয় ইসরাইল ও আমেরিকার ওপর আগুনের বৃষ্টির প্রত্যাবর্তন।
সের্গেই পোলেতায়েভ তার বিশ্লেষণে এই অবস্থাকে বলছেন ‘পারস্য উপসাগর এখন আক্ষরিক অর্থেই পারস্যের হয়ে উঠছে’। ইরান এখন এই এলাকার নৌ-পথের ওপর এতটাই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে যে, আরব দেশগুলোর তেল রফতানি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—সবই এখন তেহরানের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। আমেরিকা দৃশ্যত এই নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এতদিন আরব দেশগুলো নিরাপত্তার জন্য আমেরিকাকে পয়সা দিয়ে এসেছে, এখন হয়তো সময় বদলেছে।
পোলেতায়েভের ভাষায়, ‘আলফা নেকড়ে’ তার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। নেকড়েদের পালের প্রধান বা সর্দারকে বলা হয় ‘আলফা’। বনের আইন অনুযায়ী, আলফা নেকড়েই ঠিক করে দেয় পাল কোন দিকে যাবে, কে আগে খাবার খাবে এবং কে কার এলাকা দখল করবে। পালের বাকিরা তাকে ভয় পায় এবং তার নির্দেশ শিরোধার্য মনে করে। বনের অন্য প্রাণীরাও আলফা নেকড়েকে দেখলে পথ ছেড়ে দেয়—তার শক্তির চেয়েও তার ‘ভয়ঙ্কর’ ভাবমূর্তির দাপট থাকে বেশি।
ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে পোলেতায়েভ এখানে আমেরিকাকে সেই ‘আলফা নেকড়ে’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কয়েক দশক ধরে পারস্য উপসাগর বা মধ্যপ্রাচ্যের এই ‘বন’ বা অঞ্চলে আমেরিকার কথাই ছিল শেষ কথা। আরব দেশগুলো তাকেই মনে করত একমাত্র রক্ষাকর্তা। সবাই জানত, আলফা নেকড়ে একবার গর্জন দিলে বা থাবা বাড়ালে শত্রু পিছু হটতে বাধ্য।
এখন আরব দেশগুলো যদি দেখে যে ইরানই এই অঞ্চলের প্রকৃত শক্তি, তবে তারা নিরাপত্তার জন্য ইরানের ওপরই ভরসা করবে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক যুক্তির সাথে মিলে যায়—যে বেশি শক্তিশালী, তাকেই খাজনা বা নজরানা দিয়ে তুষ্ট রাখা।
পান্তশিরের বর্ম আর তেলের রাজনীতি
আমরা যদি পোলেতায়েভের বিশ্লেষণ করা তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির দিকে তাকাই, তবে প্রথমটি হলো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি। পোলেতায়েভ মনে করেন, যদি এই দুই সপ্তাহের বিরতি দিনের পর দিন বাড়তে থাকে, তবে আরব দেশগুলোর জন্য প্রধান কাজ হবে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নতুন করে সাজানো। কারণ রাশিয়ার তৈরি পান্তশির বা এই জাতীয় সস্তা কিন্তু কার্যকর ইন্টারসেপ্টর দিয়ে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোই এখন তাদের মূল লক্ষ্য হবে। এ ছাড়াও তারা হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য কমাতে লোহিত সাগর দিয়ে নতুন পাইপলাইন তৈরির চেষ্টা করবে। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা কঠিন। এক হাজার কিলোমিটারব্যাপী উপকূলে ইরান যেকোনো সময় যেকোনো জাহাজের পথ আগলে দাঁড়াতে পারে। আরবের বিশাল সব বন্দর, পানি শোধনাগার বা তেলের খনিগুলো এখন ইরানের লক্ষ্যভেদের সীমানার মধ্যে।
তাসনিম নিউজের সেই ইরানি সূত্রটিও একই সুরে কথা বলছেন। তিনি বলছেন, আমেরিকা কোনোভাবেই এই সংকটের পরিণতি থেকে পালাতে পারবে না। যদি আলোচনায় ইরান এবং তার মিত্রদের অধিকার নিশ্চিত না হয়, তবে আমেরিকা তার আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে না। যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানোর চেষ্টা করলেও তাদের লেবানন বা অন্য কোনো ফ্রন্টে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। ইরানের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে তাদের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা। পোলেতায়েভ তার লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, ইসরাইলের ওপর ইরানের হামলার সাফল্যের হার যেখানে যুদ্ধের শুরুতে ছিল মাত্র ৩ শতাংশ, সেখানে মার্চের শেষে তা দাঁড়িয়েছে ২৭ শতাংশে। এর মানে হলো ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ক্লান্ত এবং ফুরিয়ে আসছে। অন্যদিকে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা শুধু টিকিয়েই রাখেনি, বরং আরো শানিত করেছে।
পোলেতায়েভের দ্বিতীয় সিনারিওটি হলো যুদ্ধের নতুন করে ভয়াবহ উত্থান। যদিও তিনি মনে করেন এটি হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ আমেরিকা বা ইসরাইলের কাছে ইরানকে পরাজিত করার কোনো পরিষ্কার সামরিক পথ এই মুহূর্তে নেই। যদি তারা ইরানকে ‘পাথর যুগে’ পাঠিয়ে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে বড় কোনো বোমা হামলা চালায়, তবে ইরানের পাল্টা আঘাত হবে অভাবনীয়। আমেরিকার বি-৫২ বোমারু বিমানগুলো ইরানের আকাশসীমায় অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। ইসফাহান অঞ্চলের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করেছে যে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে বিশাল সব বিমান লক্ষ্যবস্তু হওয়া সহজ। তা ছাড়া বড় কোনো হামলা হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। বিশ্ব অর্থনীতিকে এক মহা সঙ্কটের দিকে ঠেলে দেবে। এই বাস্তবতাই আমেরিকাকে ইরানের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য করছে।
ইরানি সূত্রটি বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত অপর পক্ষ সেটা মেনে চলে ইরান তাদের সব ধরনের চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু তারা কেবল দেখার জন্য বসে নেই। ইরানের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন সময় এবং স্থানের গুরুত্ব অনুযায়ী নির্ধারিত হচ্ছে। আমেরিকার সামনে এখন বড় পরীক্ষা—তারা কি আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধানে আসবে, নাকি আবারো মধ্যপ্রাচ্যকে এক অবারিত অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেবে?
পোলেতায়েভ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ইরান যদি আবারো হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তবে তার দায়ভার এবার আমেরিকার ওপরই পড়বে। কারণ বিশ্ব এখন আর আগের মতো আমেরিকার একতরফা দাপট মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। আরবের দেশগুলোও এখন বিকল্প খুঁজছে, তারা যুদ্ধের খরচ আর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে নিজেদের বাঁচাতে চায়।
যুদ্ধের ছায়ায় ইরানের কূটনীতি
তৃতীয় যে পরিস্থিতিটি পোলেতায়েভ দেখছেন, তা হলো নিম্নমাত্রার সংঘর্ষ বা ‘লো-লেভেল ক্লাশ’। পোলেতায়েভ এবং ইরানি সূত্র—উভয়ের কথা বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, এই পরিস্থিতিই এখন সবচেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত। ইরান অভিযোগ করছে যে ইসরাইল বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। এর জবাবে ইরান হয়তো পুরোপুরি লড়াইয়ে নামবে না। তার বদলে মাঝে মাঝেই হরমুজ প্রণালী একদিন বা দুই দিনের জন্য বন্ধ করে দেবে। ইসরাইল হামলা চালাবে, ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জবাব দেবে, আর বিশ্ববাসী এটাকে একটি ‘নতুন স্বাভাবিকতা’ হিসেবে মেনে নেবে। তেলের প্রবাহ যতক্ষণ পুরোপুরি বন্ধ না হচ্ছে, ততক্ষণ হয়তো বাইরের পৃথিবী বড় কোনো উচ্চবাচ্য করবে না। কিন্তু এর ফলে অঞ্চলটি দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার পথে চলে যাবে।
পোলেতায়েভ তার বিশ্লেষণে একটি দারুণ বিষয়ের অবতারণা করেছেন—আরব দেশগুলো এখন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাকে টাকা দেবে তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নয়। আগে তারা আমেরিকাকে দিত, এখন হয়তো তারা ইরানকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করবে। প্রতিটি সুপারট্যাংকারের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য যদি ইরানকে ২ মিলিয়ন ডলারও দিতে হয়, যা তেলের দামের মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ, তবে খদ্দেররা সে দাম হাসিমুখেই মেটাবে। ইরানের জন্য এ এক বিশাল বিজয়। যুদ্ধের ঝক্কি না নিয়ে নিজের আধিপত্য কায়েম করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর এক ধরনের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা—এই হবে তেহরানের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। পোলেতায়েভ একে প্রাচ্যের শাসকদের প্রাচীন ও বিজ্ঞ কৌশল এক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে, তাসনিম নিউজকে দেয়া ওই ইরানি সূত্রের বয়ান অনুযায়ী, শত্রুপক্ষের কাজ এখন পরিষ্কার। হয় ইরান এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি চুক্তিতে আসা, অথবা আমেরিকা ও ইসরাইলের ওপর আগুনের বৃষ্টির প্রত্যাবর্তন। এই যে ‘আগুনের বৃষ্টি’ বা ‘ফায়ার’ শব্দটির ব্যবহার, তা ইরানের আত্মবিশ্বাসকেই ফুটিয়ে তোলে। ইরান এখন শুধু আঞ্চলিক শক্তি নয়, তারা বিশ্বরাজনীতির বড়মাপের খেলোয়াড় হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ট্রাম্পের মতো নেতারা যখন বড় বড় হুমকি দিয়েও শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করেন, তখন বোঝা যায় ক্ষমতার ভারসাম্য কোনো দিকে ঝুঁকে আছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীও বুঝতে পারছেন যে, একা ইরানকে মোকাবেলা করা তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে যখন মার্কিনিরা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ব্যস্ত।
উপসংহারে বলা যায়, সের্গেই পোলেতায়েভের বিশ্লেষণ এবং ইরানের প্রভাবশালী সূত্রের বক্তব্য একই মোহনায় এসে মিশছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রভাব কমছে এবং ইরানের প্রভাব বাড়ছে। ইসরাইল এখন এক গভীর সঙ্কটে—তারা না পারছে যুদ্ধ থামাতে, না পারছে জিততে। আরবের দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে পুরনো বন্ধুদের ওপর ভরসা করে আর লাভ নেই। নতুন এই আঞ্চলিক বিন্যাসে ইরানই এখন প্রধান শক্তি।
পোলেতোয়েভের ভাষায়, পারস্য উপসাগর এখন সত্যিই পারস্যের হতে চলেছে। আর ইরানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শক্তিশালী সূত্রের কথা অনুযায়ী, ভবিষ্যতের দিনগুলো নির্ধারিত হবে আমেরিকা ও ইসরাইলের আচরণের ওপর। তারা যদি শান্তির পথ বেছে না নেয়, তবে আবারো আগুনের শিখা সারা অঞ্চলকে গ্রাস করবে। এই দাবানল থেকে কারোরই রেহাই মিলবে না। এই অনিশ্চিত যাত্রায় ইরান এখন নিজের শর্তে খেলার জন্য প্রস্তুত।
কূটনীতি আর বারুদের খেলা
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল একটি সামরিক সঙ্ঘাত হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি আসলে কয়েক দশকের পশ্চিমা আধিপত্যের পতনের গল্প। তাসনিম নিউজের সেই প্রভাবশালী সূত্রটি যখন বলেন যে ইরান সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত, তখন তার পেছনে রয়েছে দেশটির দীর্ঘ সময়ের সামরিক প্রস্তুতি। ইরান কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বাড়ায়নি, বরং তারা এমন এক ‘অসম যুদ্ধ’ কৌশল রপ্ত করেছে। এই রণকৌশনের মুখে আমেরিকার মতো পরাশক্তিও অসহায় বোধ করছে।
পোলেতায়েভ তুলে ধরেছেন, বি-৫২ বোমারু বিমানের মতো বিশালাকার যুদ্ধযন্ত্রগুলো এখন ড্রোন প্রযুক্তির যুগে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল দামী অস্ত্র থাকলেই জেতা যায় না, বরং সেই অস্ত্রের সঠিক প্রয়োগ এবং ভৌগোলিক সুবিধার ব্যবহারই আসল। ইরান ঠিক এই জায়গাতেই সফল। তারা জানে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে বিশ্ব অর্থনীতির হৃৎস্পন্দন থেমে যাবে, আর এই ভয়টাই এখন ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করছে।
এদিকে, ইসরাইলের ভেতরেও এখন চরম অস্থিরতা কাজ করছে। পোলেতায়েভের বিশ্লেষণে উঠে আসা সেই পরিসংখ্যান—ইরানি হামলার সাফল্যের হার ৩ শতাংশ থেকে ২৭ শতাংশে উন্নীত হওয়া—ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ বা ‘অ্যারো’র সীমাবদ্ধতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। কোনো দেশই অনির্দিষ্টকালের জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে পারে না, কারণ প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে ইরান যে ড্রোন বা মিসাইল ব্যবহার করছে তা তুলনামূলক অনেক সস্তা। এই যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষয়, এটি ইসরাইলকে দীর্ঘমেয়াদে ‘জঈফ’ করে দিচ্ছে। ইরানি সূত্রটি তাই অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পেরেছেন যে, ইসরাইলের বর্ববতার পরিণতি থেকে কেউ নিরাপদ থাকবে না। তারা বুঝতে পারছে যে ইসরাইলের সামরিক দাপট এখন বাতকে বাত, কথার কথা। কেবল বাইরের আবরণ মাত্র, ভেতরের শক্তি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
আরব দেশগুলোর অবস্থানও এখন অনেক বেশি বাস্তবমুখী। সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে আমেরিকা তাদের নিরাপত্তার যে ‘গ্যারান্টি’ দিত, তা এখন আর কার্যকর নয়। তাই তারা ইরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর বদলে এক ধরনের ‘শীতল শান্তি’ বজায় রাখতে বেশি আগ্রহী। পোলেতায়েভ যথার্থই বলেছেন যে, আরব দেশগুলো এখন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে রাশিয়ার পান্তশিরের মতো কার্যকর প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। রুশ ভাষায় পান্তশির মানে বর্ম বা কবচ। অর্থাৎ আরবীয়রা এখন চায় যর্থাথ বর্ম বা রক্ষাকবচ।
আরবীয়রা লোহিত সাগর দিয়ে বিকল্প পথ খুঁজছে ঠিকই, কিন্তু ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেই বিকল্পগুলোও খুব একটা নিরাপদ নয়। শেষ পর্যন্ত তাদের ইরানের সাথেই একটি সমঝোতায় আসতে হবে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়, যেখানে নিরাপত্তা আর কোনো বিদেশী শক্তির কাছ থেকে ‘ক্রয়’ করা যাবে না, বরং প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্কের মাধ্যমেই তা নিশ্চিত করতে হবে।
তেলের রাজনীতি ও ভবিষ্যতের অনিবার্য সঙ্ঘাত
বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি তেল, আর সেই তেলের চাবিকাঠি এখন তেহরানের পকেটে। পোলেতায়েভ তার লেখায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেছেন—নিরাপদ যাতায়াতের জন্য প্রতিটি সুপারট্যাঙ্কার থেকে ২ মিলিয়ন ডলার আদায়ের বিষয়টি। যদি এটি কার্যকর হয়, তবে ইরান কোনো যুদ্ধ ছাড়াই বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে। এটি হবে আমেরিকার আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধের বিরুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলো যখন মূল্যস্ফীতি আর জ্বালানি সঙ্কটে ভুগছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় কোনো যুদ্ধ শুরু হওয়া মানে বৈশ্বিক আর্থিক মন্দাকে ত্বরান্বিত করা। আমেরিকা এই ঝুঁকি নিতে চায় না বলেই ট্রাম্পের মতো কঠোর নেতারাও শেষ পর্যন্ত সুর নরম করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ইরানি সূত্রটি যে ‘আগুনের’ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তা কেবল ফাঁকা বুলি নয়। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন এবং ইয়েমেনে ইরানের যে মিত্ররা রয়েছে, তারা সবাই এখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। আমেরিকা যদি আলোচনার টেবিলে ইরানকে তুষ্ট করতে না পারে, তবে কেবল হরমুজ প্রণালী নয়, বরং লোহিত সাগর আর ভূমধ্যসাগরের সংযোগস্থলগুলোও উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। পোলেতায়েভের তৃতীয় দৃশ্যাবলী বা ‘লো-লেভেল ক্লাশ’ আসলে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ। এতে ইসরাইল বারবার আক্রান্ত হবে এবং তাদের পর্যটন ও বিনিয়োগ খাত মুখ থুবড়ে পড়বে।
এর বিপরীতে ইরান তার প্রভাব বলয় আরো শক্তিশালী করবে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ; এটি নির্দেশ করে যে এশীয় শক্তিগুলো এখন এই অঞ্চলের সমস্যা সমাধানে পশ্চিমা বিশ্বের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে।
পরিশেষে, পারস্য উপসাগরের এই পরিবর্তন কেবল সাময়িক কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত। পোলেতায়েভের ভাষায় ‘আলফা বা সর্দার নেকড়ে’ অর্থাৎ আমেরিকার আধিপত্য এখন অস্তমিত। ইরান এখন তার নিজের শর্তে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। তাসনিম নিউজকে দেয়া ইরানি সূত্রের সেই চূড়ান্ত বার্তাটিই এখন সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক—হয় শান্তি ও ন্যায্য অধিকারের চুক্তি, না হয় অনির্দিষ্টকালের জন্য আগুনের বৃষ্টি। শত্রুরা কোন পথ বেছে নেবে, তা হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে যে, পারস্যের এই নতুন অধিপতিকে উপেক্ষা করা এখন আর কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে প্রতিটি ভুল পদক্ষেপ বদলে দিতে পারে আগামীর ইতিহাস।
-ইরানের সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির বিশেষ সাক্ষাৎকারের প্রতিবেদন অবলম্বনে



