সাদাকাতুল ফিতর নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি ও এর অপনোদন : প্রথম বিভ্রান্তি এর পরিমাণ নিয়ে

স্বর্ণ ও রৌপ্যের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর যাকাতের নিসাব হিসেবে স্বর্ণকেই নিসাব নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে ডক্টর ইউসুফ আল-কারাজাভী প্রমুখ স্কলার যে মত প্রদান করেছেন তার আলোকেই যাকাতের ক্ষেত্রে স্বর্ণের মূল্যের ভিত্তিতে নিসাব নির্ধারণ অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলে মত ব্যক্ত করেছি। তবে আমরা সাদাকাতুল ফিতরের নিসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বর্ণের পরিবর্তে রৌপ্যকে সাদাকাতুল ফিতরের নিসাব নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করাকে অধিকতর যুক্তিযুক্ত মনে করি। এ মত গ্রহণের মাধ্যমে সব মহলের মতকে একত্রিত করণের সুযোগ হবে। আল্লাহই প্রকৃত সত্যের বিষয়ে চূড়ান্ত জ্ঞানের অধিকারী

এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলো থেকে আমরা তিনটি হাদিসের উল্লেখ করা সঙ্গত মনে করছি।

(ক) ইবন উমর (রা) বর্ণিত হাদিস : তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল রামাদান মাসের প্রদেয় যাকাতুল ফিতর অবশ্যম্ভাবী করেছেন, যা এক সা’ পরিমাণ খেজুর অথবা যব প্রত্যেক মুসলিম দাস ও মুক্ত ব্যক্তির পক্ষে পুরুষ ও স্ত্রী নির্বিশেষে ছোট বড় সবার জন্য প্রযোজ্য। বুখারি, মুসলিম।

দ্রষ্টব্য : এক সা’র পরিমাণ বিষয়ে সতর্কতামূলক মত হচ্ছে ৩.৩ কেজি ওজনের

খ. আবু সাঈদ আল খুদরী (রা:) বর্ণিত হাদিস, তিনি বলেন: ‘আল্লাহর রাসূল সা: সাদাকাতুল ফিতর আদায় অবশ্যম্ভাবী ঘোষণা করেছেন, তা এক সা’ পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য, অথবা এক সা’ পরিমাণ যব অথবা এক সা’ পরিমাণ খেজুর, অথবা এক সা’ পরিমাণ পনির’। (নাসাই কর্তৃক বর্ণিত)

মন্তব্য: উপরোক্ত দুটি হাদিসের প্রথমটির উদ্দেশ্য হচ্ছে কাদের উপর তা প্রযোজ্য সে বিষয়ের উল্লেখ। তাই এ হাদিসে এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। তা ছাড়া কত পরিমাণ তার উল্লেখও এতে রয়েছে। তবে কোন কোন বস্তু দ্বারা তা আদায়যোগ্য সে বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ এই হাদিসের উদ্দেশ্য নয়। তবে এতে মৌলিক দুটি বস্তুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যথা খেজুর ও যব। কারণ এ দুটি বস্তুই মূলত সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে আদায় করা হয়ে থাকে ।

এ দুটি হাদিসের মাধ্যমে আমরা সাদাকাতুল ফিতর বিষয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা পেয়ে থাকি।

এক) সাদাকাতুল ফিতর কার উপর প্রযোজ্য?

দুই) সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ কত?

তিন) কোন কোন বস্তু দ্বারা তা প্রদেয়?

প্রথম প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে: দাস ও মুক্ত, স্ত্রী ও পুরুষ এবং ছোট ও বড় নির্বিশেষে সবার উপর তা অবশ্যম্ভাবী।

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে : এর পরিমাণ হল সব ক্ষেত্রে অভিন্নভাবে এক সা’।

তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে : বস্তু হিসেবে সব ধরনের খাদ্যদ্রব্যই সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে প্রদেয়।

উপর্যুক্ত তিনটি বিষয়ের বিপরীতে আরো একটি বর্ণনা লক্ষণীয়, যা নাকি এর পরিমাণ বিষয়ে বর্ণিত জনৈক সাহাবীর অবজারভেশন, যা এ ক্ষেত্রে বিকল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দান করে থাকে। বর্ণনাটি আসলে বিশিষ্ট সাহাবী আবু সাঈদ খুদরীর উক্তি। তিনি বলেন: “যখন আমাদের মাঝে আল্লাহর রাসূল সা: জীবিত ছিলেন তখন আমরা সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে প্রত্যেক শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক, মুক্ত ও দাসের পক্ষ থেকে এক সা’ পরিমাণ পনির অথবা এক সা’ পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য, অথবা এক সা’ পরিমাণ যব অথবা এক সা’ পরিমাণ কিশমিশ আদায় করতাম, এ নিয়মেই আমরা আদায় করে আসছিলাম, অবশেষে (আমির) মুআবিয়া তার শাসন আমলে হজ অথবা ওমরার সফরে একদিন মদিনায় এলে তিনি মিম্বরে উঠে জনতার উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দান করলেন, তার বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বললেন: “আমি মনে করি যে, সিরীয় জাতের দুই মুদ্দ (তথা আধা সা’) গম এক সা’ পরিমাণ খেজুরের সমান। এরপর লোকেরা তার এ মতকে গ্রহণ করল, কিন্তু আমি এই মতটি গ্রহণ করতে রাজি নই, বরং আমি যতদিন বেঁচে থাকব আগে যে নিয়মে এক ছা’ পরিমাণ (সাদাকা) আদায় করে আসছিলাম তারই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখব’। (বুখারি, ফাতহুল বারী, ৩/৩৭২, মুসলিম (হালাবি) ২/৬৭৮, ফিকহুসসুন্নাহ,১/ ৩৬৪।

মন্তব্য : এ হাদিসটির প্রতি লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন যে,

ক) হাদিসটিতে যে অর্ধ সা’ গমের উল্লেখ আছে তা নবীজির উক্তি বা আমল নয়, বরং জনৈক ছাহাবীর (মুআবিয়ার) নিজস্ব ইজতিহাদ। তাই হাদিসটি মারফু’ নয় বরং মওকূফ।

খ) হাদিসের রাবি নিজেই মুআবিয়ার ইজতিহাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলছেন : লোকেরা তার এ মতকে গ্রহণ করলেও আমি যতদিন বেঁচে থাকব আগের নিয়মে এক সা’ পরিমাণ সাদাকা আদায় অব্যাহত রাখব।

গ. উপরোল্লিখিত আবু সাঈদ আল খুদরী বর্ণিত হাদিসে দ্রব্য হিসেবে যে কয়টি বস্তুর উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে প্রথমটিতে বলা হয়েছে এক সা’ পরিমাণ খাদ্যদ্রব্যের কথা, অতএব সাদাকা হিসেবে গম আদায়ের ক্ষেত্রেও তার এক সা’ পরিমাণ আদায় করা অবশ্যম্ভাবী, অর্ধ ছা নয়। যেহেতু হাদিসটি নবীজি সা:র উক্তি, তাই এর বিপরীতে মু’আবিয়ার রহ. ফতোয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ঘ) ‘গমের ক্ষেত্রে অর্ধ সা’ পরিমাণ হলে চলবে’ মু’আবিয়া (রহ.) কর্তৃক এ জাতীয় মন্তব্যের পেছনে যুক্তি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে ‘সিরিয়া থেকে আনীত পীত বর্ণের শস্যের (গমের) ক্ষেত্রে অর্ধ সাই যথেষ্ট’। এখানে তিনি মূল্যমানের দিকটি বিবেচনা করেই এ মতটি ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ যেহেতু গম স্থানীয় পণ্য নয়, বরং তা একটি বহিরাগত পণ্য, তাই এর মূল্য স্থানীয় পণ্যসামগ্রীর তুলনায় দ্বিগুণ অথবা এর কাছাকাছি হওয়ার কারণে তিনি এ মতটি ব্যক্ত করেছিলেন।

অতএব বর্তমান বাজার পরিস্থিতির আলোকে করণীয় কী তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।

বর্তমানে আমাদের দেশে বাজার পরিস্থিতির আলোকে যদি পর্যালোচনা করা হয় তাহলে দেখতে পাব যে গাদাকাতুল ফিতর হিসেবে প্রদেয় যে সব বস্তুর উল্লেখ করা হয়েছে তন্মধ্যে সবচেয়ে সস্তা পণ্য হচ্ছে গম। উদাহরণ হিসেবে, খেজুরের কেজি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা, কিশমিশের কেজি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, যবের কেজি ১৫০-২০০ টাকা, পনিরের কেজি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা অথচ গমের কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা মাত্র। অতএব অর্ধ গমকে সাদাকাতুল ফিতরের নিসাব নির্ধারণের কোনো যুক্তি থাকতে পারে কী? এমতাবস্থায় সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে কেউ গমকে বেছে নিলেও তাকে অবশ্যম্ভাবী রূপে এক সা’ পরিমাণ গম অথবা এর মূল্য আদায় করতে হবে। অর্ধ সা’ পরিমাণ প্রদান করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত হবে না।

আরেকটি বিভ্রান্তির অপনোদন

বর্তমানে কিছু কিছু facebook একটিভিস্ট, যারা নিজেদের মুফতি পরিচয় বা শায়খ উপাধি ব্যবহার করতে অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, তাদের এ মর্মে ফতোয়া জারি করতে দেখা যায় যে তারা বলে বেড়ায়, সাদাকাতুল ফিতর দ্রব্য ব্যতীত এর মূল্য প্রদানের দ্বারা আদায় করা অবৈধ। অথচ তাদের এ উক্তি কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশের সাথে সাংঘর্ষিক। কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক এজন্য যে, মহান আল্লাহ বলেন: ‘তোমরা তোমাদের ‘মিথ্যা উক্তি ব্যবহার করে এ কথা বলতে যেও না যে এটি হালাল এবং এটি হারাম যার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা রটনা করে থাক’, (সুরা নাহাল: ১১৬)

কোনো বস্তুকে অবৈধ বলে মত ব্যক্ত করার পেছনে অবশ্যই সরাসরি আল কুরআনের উক্তি অথবা বিশুদ্ধ হাদিসের দলিল থাকতে হবে।

হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক এজন্য যে, উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেছেন : ‘নবীজিকে যখনই দুটি বিষয়ের মধ্যে একটিকে গ্রহণ করার সুয়োগ দেয়া হয়েছে সেক্ষেত্রে তিনি যেটি সহজতার সেটিকেই গ্রহণ করেছেন যতক্ষণ না তা পাপ কার্য বলে চিহ্নিত হয়।’ বুখারী, ৬১২৬, মুসলিম ২৩২৭ । এটি একটি প্রথম শ্রেণীর বিশুদ্ধ হাদিস। সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে দ্রব্য প্রদানের চেয়ে এর মূল্য প্রদান অধিকতর সহজ ও যুক্তিযুক্ত। তা ছাড়া ইমামদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ তথা ইমাম আজম, তিনি মূল্য প্রদানের বৈধতা বিষয়ে মত প্রকাশ করেছেন, এবং ইমাম বুখারিও মূল্য প্রদানের বৈধতা বিষয়ে অভিন্ন মত পোষণ করেছেন। অতএব বর্তমান যুগের অপরিচিত অখ্যাত মুফতিদের এ জাতীয় ফতোয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ফিতরা আদায়কারীদের নিসাবের অধিকারী হওয়া প্রসঙ্গ :

সাদকাতুল ফিতর আদায়কারীকে নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হতে হবে কি না সে বিষয়টিতে বিভিন্ন মাজহাবের মধ্যে মতের ভিন্নতা রয়েছে। কারো কারো মতে এর জন্য নিসাবের অধিকারী হওয়া শর্ত নয়। শুধু ঈদের দিনের জন্য আপন পরিবারের সদস্যদের জন্য আহার্যের ব্যবস্থা থাকলেই সাদাকাতুল ফিতর প্রদান অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে যে সমস্যাটি দেখা দিবে তা হচ্ছে এভাবে ফকিরদের ওপরও সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয়ে যাবে। যদ্দরূণ সাদাকা গ্রহণ করার মতো লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে।

আরেক দলের মতে ১০ দিনের আহার্য ও মৌলিক প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা থাকলে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে।

ইমাম আবু হানীফার মত হচ্ছে এই, যে ব্যক্তি ঈদের দিন সকালে নিসাব পরিমাণ সম্পদের (তথা ২০০ দিরহাম রৌপ্য অথবা ২০ দিরহাম স্বর্ণ অথবা সমপরিমাণ অর্থের) অধিকারী হবে তার উপর সাদাকাতুল ফিতর আদায় ওয়াজিব।

আমাদের মন্তব্য : আমরা আগেই আলোচনা করেছি যে স্বর্ণ ও রৌপ্যের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর যাকাতের নিসাব হিসেবে স্বর্ণকেই নিসাব নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে ডক্টর ইউসুফ আল-কারাজাভী প্রমুখ স্কলার যে মত প্রদান করেছেন তার আলোকেই যাকাতের ক্ষেত্রে স্বর্ণের মূল্যের ভিত্তিতে নিসাব নির্ধারণ অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলে মত ব্যক্ত করেছি। তবে আমরা সাদাকাতুল ফিতরের নিসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বর্ণের পরিবর্তে রৌপ্যকে সাদাকাতুল ফিতরের নিসাব নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করাকে অধিকতর যুক্তিযুক্ত মনে করি। এ মত গ্রহণের মাধ্যমে সব মহলের মতকে একত্রিত করণের সুযোগ হবে। আল্লাহই প্রকৃত সত্যের বিষয়ে চূড়ান্ত জ্ঞানের অধিকারী।

লেখক : সাবেক প্রোভিসি, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম