মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় বাংলাদেশেও ফার্নেস অয়েলের দাম ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যয় বেড়েছে, পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির বোঝাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা- দুই স্তরেই মূল্য পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে গঠিত এ কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি অর্থ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিবরাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বিদ্যুৎ খাতে নতুন মূল্য সমন্বয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।
কেন নতুন কমিটি : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও ফার্নেস অয়েলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যয় হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। বিশেষ করে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদনব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখনো তরল জ্বালানিনির্ভর হওয়ায় এই ব্যয় সরাসরি ভর্তুকির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সরকার প্রতি বছর বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে থাকে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, আমদানিব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজেট ঘাটতির কারণে এই ভর্তুকি দীর্ঘমেয়াদে বহন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়কে অনেকটাই অনিবার্য সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহব্যয় ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এ কারণে পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ের বিদ্যুতের দাম পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করবে এই কমিটি।
ভর্তুকির বোঝা কতটা : অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি এখন সরকারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্য বাড়লে উৎপাদনব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়, কিন্তু সেই অনুপাতে খুচরা পর্যায়ে মূল্য সমন্বয় না হলে ভর্তুকির পরিমাণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়।
বিশেষ করে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউনিটপ্রতি উৎপাদনব্যয় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে তরল জ্বালানিনির্ভর উৎপাদন বাড়লে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও বেড়ে যায়। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে ভর্তুকির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। এমন বাস্তবতায় বিদ্যুতের দাম সমন্বয় ছাড়া বিকল্প পথ সীমিত হয়ে পড়ছে।
পাইকারি ও খুচরা- দুই স্তরেই বাড়তে পারে দাম
নতুন কমিটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে পাইকারি ও খুচরা- দুই পর্যায়ের বিদ্যুৎমূল্য পুনর্বিবেচনা করা। সাধারণত বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বিদ্যুৎ কিনে বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে পাইকারি দরে সরবরাহ করে। এরপর বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্রাহকপর্যায়ে খুচরা দরে বিদ্যুৎ বিক্রি করে।
পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানো হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খুচরা গ্রাহকের ওপর পড়বে। ফলে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প- সব ধরনের গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্প খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদনব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। ফলে এর প্রভাব কেবল বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতেও প্রতিফলিত হতে পারে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্ভাব্য প্রভাব
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প ও ব্যবসা খাতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে তৈরী পোশাক, সিমেন্ট, স্টিল, কেমিক্যাল এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো বিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় তাদের উৎপাদনব্যয় বাড়বে। এতে শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানিমুখী শিল্পগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ উৎপাদনব্যয় বেড়ে গেলে রফতানি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা, দোকানপাট ও সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়বে। বিদ্যুতের বিল বাড়লে পরিচালনব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
সাধারণ মানুষের ওপর চাপ
খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর। আবাসিক গ্রাহকদের মাসিক বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি পরিবারের ব্যয় কাঠামোয় অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে। ইতোমধ্যে খাদ্য, পরিবহন ও গ্যাসসহ বিভিন্ন খাতে মূল্যস্ফীতির চাপ বিদ্যমান। এর সাথে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি যুক্ত হলে মধ্যবিত্ত ও নি¤œ আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বেড়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে নি¤œ আয়ের গ্রাহকদের জন্য সুরক্ষাব্যবস্থা রাখা জরুরি। নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারে তুলনামূলক কম হার নির্ধারণ করলে এ চাপ কিছুটা লাঘব করা সম্ভব।
কমিটির কার্যপরিধি
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কমিটি প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ শেষে মন্ত্রিসভার বৈঠকের জন্য সুস্পষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, বিষয়টি প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক- সব দিক বিবেচনায় নিয়েই পর্যালোচনা করা হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ এই কমিটির প্রশাসনিক সহায়তা দেবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সভা আয়োজন করবে। অর্থ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি বিভাগের সমন্বিত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে শিগগিরই বিদ্যুতের নতুন মূল্য কাঠামো ঘোষণা হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরো বাড়লে মূল্য সমন্বয়ের হারও বেশি হতে পারে। তবে সরকার একদিকে ভর্তুকির চাপ কমাতে চাইছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব সীমিত রাখার চেষ্টা করছে। তাই ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়ের পথও বিবেচনায় থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কটের অভিঘাত এখন সরাসরি দেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রতিফলিত হচ্ছে। উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। আগামী দিনে এই কমিটির সুপারিশ দেশের অর্থনীতি, শিল্প খাত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।



