বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার দুনিয়ায় সবচেয়ে জমজমাট উৎসব। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ বিপুল আগ্রহে তাকিয়ে থাকে এই আয়োজনের দিকে। কারণ সব খেলারই আয়োজন হয় বিশ্বমানবের মধ্যে সম্প্র্রীতি ও সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে; কিন্তু ২০২৬ সালের আয়োজন ঘিরে ভিন্ন বার্তা যেন স্পষ্ট। এতে খেলার চেয়ে বেশি হচ্ছে রাজনীতি।
এবার বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। খেলবে ৪৮টি দল। ইভেন্টে অংশ নিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসানীতি ও ভূরাজনৈতিক মারপ্যাঁচের ধকল পোহাতে হচ্ছে অনেক দলকে। ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা দীর্ঘদিনের। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর ইরানের বিশ্বকাপে অংশ নেয়া অনিশ্চিত হয়ে যায়। শেষে ফিফা শক্ত অবস্থান নেয়ায় ইরানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। তবে খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিয়ে তৈরি জটিলতা কাটেনি। ইরানি ফুটবল দল বিশ্বকাপ খেলতে মেক্সিকোয় পৌঁছেছে। তবে দলটির অন্তত ১৫ জন কর্মকর্তা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি। কেবল ইরান নয়, সোমালিয়ার রেফারিকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে বিমানবন্দর থেকে। ইরান ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সাংবাদিকদের ভিসা দেয়া হয়নি।
স্বাগতিক দেশের এই একপেশে ও অনমনীয় আচরণে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের মূল চেতনা হুমকির মুখে পড়েছে। যে উৎসবের রঙে মেতে ওঠার কথা ছিল ফুটবল বিশ্বের, সেখানে এখন শঙ্কা আর অনিশ্চয়তা। এই বৈষম্যমূলক নীতির কারণে মাঠের পরিবেশ এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। ফুটবলের মতো শারীরিক ও মানসিক শক্তির খেলায় মাঠের বাইরের মানসিক স্থিতি জরুরি; কিন্তু ম্যাচের আগে ও পরে ইরানের খেলোয়াড়দের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াতের ঝক্কি পোহাতে হবে। এটি খেলায় সমতা নিশ্চিত করার মূলনীতির চরম লঙ্ঘন।
মাঠের বাইরের এই ভূরাজনীতি এখন গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। গ্যালারিতে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আগের পতাকা দেখানো হতে পারে, এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমাদ দনিয়ামালি। অননুমোদিত ওই পতাকা দেখানো হলে ইরান কড়া ভূমিকা নেবে। স্টেডিয়ামের গ্যালারিগুলো রাজনৈতিক প্রতিবাদের মঞ্চ বা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি আছে। এতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে মাঠেও।
ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বড় গলায় আশ্বাস দিয়েছিলেন, বিশ্বকে আমেরিকায় স্বাগত জানানো হবে। তিনি বলেছিলেন, রাজনীতি খেলায় কোনো প্রভাব ফেলবে না; কিন্তু তার দাবি বিফলে গেছে। মার্কিন প্রশাসনের সাথে ফিফা নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠতা থাকলেও ভিসা জটিলতা ও বৈষম্য এড়ানো যায়নি। এতে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা বিব্রত। খেলাধুলাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার যে অঙ্গীকার ফিফা আওড়ায়, বর্তমান সঙ্কটে তা ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে। যেভাবে ভারতের একাধিপত্যে বিশ্ব ক্রিকেটের আবেদন অনেকটাই কমে এসেছে।
খেলার আয়োজন কোনো দেশের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হলে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এখনো সময় আছে, বৃহত্তর স্বার্থে স্বাগতিক দেশগুলোকে নমনীয় হয়ে সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। না হয় এই আসরটি ফুটবল উৎসব নয়, রাজনীতির কালো দাগ হিসেবে থেকে যাবে।



