দেশে কার্যত রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। খুন হত্যা ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে সেখানে যখন তখন লাশ পড়ছে, খুন হচ্ছে, ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা কাজ করছে। এদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফ্যাসিস্ট আমলের সুবিধাভোগীরা অর্থনৈতিক সেক্টরকেও অস্থিতিশীল করতে তৎপরতা চালাচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং জগতের আইকন ইসলামী ব্যাংককে ধসিয়ে দিতে কৌশলে ফ্যাসিস্ট সরকারের লুটেরাগোষ্ঠী কলকাঠি নাড়ছে। অপরদিকে পান থেকে চুন খসলেই ফ্যাসিস্ট আমলের এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী গোষ্ঠী সেগুলো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে চটকদার ফটোকার্ড তৈরি করে কিংবা সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণে কন্টেন্ট ক্রিয়েট করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দিয়ে হাইপ তুলছে। আবার কখনো কখনো মিথ্যা তথ্য দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ ঘোলাটে করার জন্য নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কট্টোর সমর্থক ও নেতাকর্মীরা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নজিরবিহীন পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও একের পর এক ইস্যু তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোরনীতির কারণে তাদের সেই তৎপরতা ওই সময় বেশিদূর এগোতে পারেনি। গেল ১২ ফেব্রুয়ারি পতিত আওয়ামী লীগবিহীন অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করে। আর পতিত দলটি রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত করার জন্য লোকবল সঙ্কটে এখন সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নিয়েছে। দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে ভুয়া ফটোকার্ড ও বিতর্কিত কন্টেন্ট তৈরি করে নামে বেনামে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিছু কিছু ঘটনাও রঙ চঙ লাগিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দিয়ে হাইপ তোলা হচ্ছে। এসব কন্টেন্ট দেখে রাজনৈতিক অঙ্গন প্রায়শ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এসব অপতৎপরতার মাধ্যমে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করতে পতিত দলটি আলোচনায় থাকার কৌশলের পথ বেছে নিয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের দেশে ও বিদেশে অবস্থান করা পলাতক নেতাকর্মীরা অন্তত দেড় হাজার থেকে দুই হাজার ভুয়া অ্যাকাউন্ট সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করছে। দেশের অভ্যন্তরে খুন, হত্যা ধর্ষণ কিংবা মব ভায়োলেন্সের মতো কোনো ঘটনা ঘটার আগেই ওইসব ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো আগে থেকেই সক্রিয় থাকে। ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে গুজব ছড়িয়ে ঘটনাকে ভিন্নমাত্রা দেয়ার জন্য একটি হাইপ তুলে দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যাসহ বেশ কয়েকটি ঘটনা গণমাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। বায়ান্ন নিউজ নামে একটি পেজ থেকে গত ২০ মে ‘অব্যাহত জবাই, ধর্ষণ! ২ দিনে ৪ সংখ্যালঘুসহ প্রায় ১ ডজন মানুষ জবাই! ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে জবাই! কি হচ্ছে দেশে? কি ঘটতে যাচ্ছে?’ এই শিরোনামে একটি ফটোকার্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেয়া হয়। ২৮ মে ‘ঢাকায় ৩০ ঘণ্টার ব্যবধানে জোড়া দম্পতিসহ ১৩ লাশ’ শিরোনামে একটি ফটোকার্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে দেখা যায়। কোরবানি ঈদের আগে রাজধানীতে একটি গরুকে মেট্রোরেলে উঠানোর একটি ভিডিও বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং সেটি নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়। আওয়ামীপন্থী নেটিজেনরা সরকারের দিকে তির্যক মন্তব্য ছুড়ে দেয়। তাদের ভাষ্য, ‘ঢাকার মেট্রোস্টেশনগুলো আজ গরুর হাট! যেমন রুচিহীন সরকার, তেমনি তার রুচিহীন ও ফেল্টুস ঢাকার প্রশাসক, তেমনি তার ১৭ বছরের বুভুক্ষু দল। মেট্রোরেল চালু হয়েছে ২০২২ সালে। আজ পর্যন্ত কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দলের রুচির এতটা অধঃপতন হয়নি যে, মেট্রোরেলের মতো আইকনিক ও হাজার কোটি টাকার প্রজেক্টকে গরুর খোঁয়াড়ে পরিণত করবে। তারেক সরকার ও তার দল সেই অসম্ভবকে আজ সম্ভব করেছে।’ গত ২৪ মে ‘বৈশ্বিক মন্দার চেয়েও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিশৃঙ্খলা ডুবালো দেশের পোশাক শিল্পকে’ এরকম একটি ফটোকার্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে দেখা যায়। গত ২২ মে ‘রামিসাকে ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামির দায় স্বীকার’ শিরোনামে একটি ফটোকার্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। গত ২১ মে ‘জুলাইয়ের আগে ঢাবি অধ্যাপক সাইমার অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে জর্জ সেরোসের ৫০ হাজার ডলার! গোপন নথি ফাঁস করলো এফবিআই’ শিরোনামে একটি ফটোকার্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন পতনের পর এরকম হাজার হাজার ভুয়া ফটোকার্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করা হয়- যার নেপথ্যে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে দেশে ও বিদেশে পলাতক থাকা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের। ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি ফ্যাক্ট চেক প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েকটি ঘটনার সত্যতা যাচাই করেও পেয়েছে। কিছুদিন আগে এহসান চৌধুরী নামক একটি ফেসবুক আইডি থেকে এআই ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাইমা রহমানের একটি আপত্তিকর ফটোকার্ড তৈরি করে পোস্ট করা হয়। ওই ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেয়ার নেপথ্যে ছিল কুমিল্লার ছাত্রলীগ নেতা গাজী আশরাফুল আলম শ্রাবণসহ আওয়ামী লীগপন্থী কয়েকজন অ্যাকটিভিস্ট। অবশ্য ওই ভুয়া ফটোকার্ডের সত্যতা যাচাই করে ছাত্রলীগ নেতা ও আওয়ামী লীগের যোগসূত্র পেয়েছিল বলে কয়েকটি ফ্যাক্ট চেক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছিল।
এর আগেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজপথে গড়ে উঠা আন্দোলনগুলোর নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগ সমর্থিত লোকজন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতনের পর জুডিশিয়াল ক্যুর মাধ্যমে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে উৎখাত করার জন্য ভয়াবহ পরিকল্পনা করেছিল আওয়ামী লীগ। সেটি ব্যর্থ হওয়ার পর গ্রাম পুলিশের আন্দোলন, আনসারদের আন্দোলন, পোশাক শ্রমিকদের অসন্তোষ, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের আন্দোলন, সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন, সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনসহ গত দেড় বছরে গড়ে উঠা বড় বড় আন্দোলনের ওপর ভর করে সরকার পরিবর্তনের তৎপরতা চালিয়েছিল পতিত দলটি। এমনকি গোপালগঞ্জে এবং সচিবালয়ে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার পেছনে পতিত আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটা বড় আকারের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির ক্ষেত্র যে তৈরি করা হচ্ছে, তার নানা লক্ষণ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। সামাজিক মাধ্যমে নামে বেনামে অশ্লীল ও আপত্তিকর এআই জেনারেটেড ছবি ছড়িয়ে আগুনে ঘি ঢালার প্রাথমিক কাজটা শুরু করছে ছাত্রলীগ। তারপর সেই ঘটনার রেশ ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। অর্থনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এর পেছনে রয়েছে বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের সবচেয়ে সুবিধাভোগী এস আলম গং। তাদেরকে অর্থনৈতিক খাতে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই অস্থিরতা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক শাহজাহান শুভ মনে করেন, জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সুপার মেজোরিটি নিয়ে সরকার গঠন করার পর নানাভাবে থউসকানিটা আবারো শুরু হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে নামে বেনামে অশ্লীল ও আপত্তিকর এআই জেনারেটেড ছবি ছড়িয়ে আগুনে ঘি ঢালার প্রাথমিক কাজটা শুরু করছে ছাত্রলীগ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাত্রলীগ গুজব ছড়িয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে মোটামুটি সফল হয়েছে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক খাতকে ধ্বংস করতেও চক্রান্ত চলছে। যার উদাহরণ ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতা।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যেসব আন্দোলন হয়েছিল তার নেপথ্যে ছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। নানা কৌশলে তারা একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চেয়েছিল। সেটা যদিও সফল হয়নি। তিনি বলেন, এখন নির্বাচিত সরকারের সময় মাঠের আন্দোলনে সফল হবে না ভেবে সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নিয়েছে ওই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও লুটেরা গোষ্ঠী হামলে পড়েছে। সেখানেও একটি অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। পলাতক দলের ফাঁদে পা দেয়া সরকারের কোনোভাবেই উচিত হবে না। এজন্য সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।



