ইরান যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনা

স্থায়ী শান্তির প্রত্যাশা

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, সমঝোতা চুক্তি বাস্তবায়নের দায় যুক্তরাষ্ট্রের। আমরা আশা করব, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আর নতুন করে ঘোঁট পাকাবে না; বরং স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যেই কাজ করবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়েছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার কথা। এর মধ্য দিয়ে প্রায় তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধের কার্যত সমাপ্তি ঘটবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ইরানের সাথে আলোচনার মধ্যেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বেআইনিভাবে ইরানে হামলা চালায়। দীর্ঘ ৪০ দিনের তুমুল যুদ্ধেও আক্রমণকারীরা ইরানে তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয় এবং নিজেরাই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। প্রায় ১০০ দিনের যুদ্ধাবস্থার পর মূলত পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতায় সম্মত হয় দুই পক্ষ। তবে এরই মধ্যে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের এবং সারা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একবাক্যে স্বীকার করছেন, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হয়েছে। সমঝোতার শর্তগুলো তারই প্রমাণ।

যেসব বিষয়ে সমঝোতা হতে যাচ্ছে তাতে ইরানের দেয়া ১৪ দফা শর্ত আছে। এর অন্যতম হলো- ইরান, লেবানন, গাজাসহ সব ফ্রন্টে হামলা বন্ধ করতে হবে। ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী ঘিরে মার্কিন নৌ-অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেয়া হবে; ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে।

সমঝোতার শর্তে ইরানের ওপর এ যাবৎকালে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা, চুক্তি সইয়ের ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো এবং ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালীন ইরানের জব্দ করা ২৪ বিলিয়ন ডলার সম্পদ অবমুক্ত করার কথাও আছে। শুধু তাই নয়, ইরানের বিরুদ্ধে অন্যায় যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসাবে ৩০০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করবে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের একটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের জব্দ সম্পদের অর্ধেক অবমুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালী-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে না। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়গুলো অ্যাজেন্ডায় থাকছে না।

স্পষ্টত সমঝোতার শর্তাবলি পুরোপুরিই ইরানের অনুকূলে। এতে ইসরাইলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশটি সমঝোতার খসড়া দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে এবং ট্রাম্প তা নাকচ করে দিয়েছেন।

তবে সমঝোতার ঘোষণার পরও মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির মূল হোতা ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প যদি ইসরাইলকে থামাতে না পারেন, তাহলে সমঝোতা যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। শান্তির সম্ভাবনা নস্যাৎ হতে পারে। বর্তমানে ট্রাম্প অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট যে চতুর্মুখী চাপে রয়েছেন তাতে স্পষ্ট যে, তিনি আর যুদ্ধের ঝুঁকি নেবেন না।

তার পরও গত মঙ্গলবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক মন্তব্যে নতুন সঙ্কটের আভাস পাওয়া গেছে। ফ্রান্সে জি-সেভেন সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছেন, লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে সামলাতে সিরিয়া ব্যবস্থা নিতে পারে। এ নিয়ে ইসরাইলকেও নাকি তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। এটি সত্য হলে সমঝোতা ঘিরে পরিস্থিতি ঘোলাটে হবে। আগামীকাল জেনেভায় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনিশ্চিতও হয়ে পড়তে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, সমঝোতা চুক্তি বাস্তবায়নের দায় যুক্তরাষ্ট্রের। আমরা আশা করব, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আর নতুন করে ঘোঁট পাকাবে না; বরং স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যেই কাজ করবে।