প্রবাসে মহিলাকর্মীদের যৌন নির্যাতন

নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় গাফিলতি নয়

যৌন নির্যাতনের মতো অমানবিক ঘটনা কোনো সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না। মানবতাবিরোধী এই জঘন্য অপরাধ আড়াল না করে সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলায় জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীকর্মীদের সম্মান ও অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকৃত অর্থে মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে আমাদের।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকের অবদান অনস্বীকার্য। প্রতি বছর লাখো শ্রমিক বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করেন। বিপুলসংখ্যক নারীও ভাগ্য ফেরাতে বিদেশে যান। তাদের একটি বড় অংশ গৃহকর্মী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- একাধিক গবেষণা ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বিদেশে কর্মরত নারীকর্মীদের বড় অংশ যৌন নির্যাতন, শারীরিক নিপীড়ন ও মানসিক হয়রানির শিকার হন।

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে গত সোমবার সংরক্ষিত নারী আসনের বিরোধীদলীয় এমপি মারদিয়া মমতাজ বলেন, ২০২২-২৫ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি নারীশ্রমিক বিদেশে গেছেন। তাদের অনেকে নিরাপত্তাহীনতা, বেতন বঞ্চনা ও চুক্তি লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন। এদের মধ্যে ৯৪ শতাংশ নারীশ্রমিক যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

যদিও সরকার দাবি করে থাকে, বিদেশে বাংলাদেশী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিতে দূতাবাসভিত্তিক সেবা জোরদার আছে। আইনি সহায়তা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে নানা কার্যক্রম চলমান আছে। তা সত্ত্বেও বিদেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত নারীকর্মীরা প্রতিনিয়ত জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এই নারী সংসদ সদস্যের দাবি অনুযায়ী, সত্যিই যদি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশী ৯৪ শতাংশ নারীকর্মী কোনো না কোনো ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হন, তা হলে এটি শুধু শ্রম অধিকার লঙ্ঘন নয়, মানবাধিকারের বড় ধরনের বিপর্যয়।

প্রকৃত বাস্তবতায় বিদেশে কর্মরত আমাদের নারীকর্মীর বেশির ভাগ দরিদ্র ও স্বল্পশিক্ষিত পরিবারের সদস্য। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় তারা প্রবাসে পাড়ি জমান। অনেক ক্ষেত্রে তাদের স্বপ্ন পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে। কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় কাজ, বেতন না পাওয়া, চলাফেরার স্বাধীনতা হরণ, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতা তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। বেশির ভাগ ভয়, লজ্জা কিংবা আইনি জটিলতায় নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেন না। এ পরিস্থিতির জন্য শুধু গন্তব্য দেশের নিয়োগকর্তাদের দায়ী করে দায়মুক্তি পাওয়া যাবে না। শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় জড়িত অসাধু দালালচক্র, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, দুর্বল নজরদারি এবং কূটনৈতিক সহায়তার সীমাবদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। আবার বহু নারী বিদেশে যাওয়ার আগে নিজেদের অধিকার, ঝুঁকি এবং প্রতিকার সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা পান না। ফলে নির্যাতনের শিকার হলেও তারা কিভাবে সাহায্য চাইবেন, তা জানেন না।

এই সঙ্কট মোকাবেলায় প্রবাসে যাওয়ার আগে নারীদের জন্য সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। সেই সাথে গন্তব্য দেশগুলোর সাথে শ্রমিক সুরক্ষাবিষয়ক চুক্তি আরো শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোর দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, আশ্রয় দেয়া এবং আইনি সহায়তায় সক্রিয় ভূমিকা পালনে সদা সক্রিয় থাকতে হবে। পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার নারীদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

যৌন নির্যাতনের মতো অমানবিক ঘটনা কোনো সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না। মানবতাবিরোধী এই জঘন্য অপরাধ আড়াল না করে সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলায় জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীকর্মীদের সম্মান ও অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকৃত অর্থে মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে আমাদের।