কৈশোরকাল শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে যায়। কিশোর-কিশোরীরা যেমন আবেগপ্রবণ হন তেমনি তারা খুব অল্পতে দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ ও ভয় পান। এমতাবস্থায় তারা খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নেন, যা এখন বাংলাদেশে উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে।
গত শনিবার আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৪০৩ জন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগের বছর আত্মহননে ঝরে গেছে ৩১০ শিক্ষার্থীর প্রাণ। ৪০৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সর্বাধিক স্কুল পর্যায়ের ১৯০ জন, কলেজ পর্যায়ে ৯২ জন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন ও মাদ্রাসায় ৪৪ জন আত্মহত্যা করেছে। লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪৯ জন নারী ও পুরুষ ১৫৪ জন।
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় চাকচিক্যময় জীবনের অন্তরালে যে গভীর ক্ষত ও বেদনা লুুকিয়ে থাকে তারই ফল এসব আত্মহত্যা। মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বাড়ছে। সেই সাথে পরিবারগুলোতে বাড়ছে নানা চাহিদা। সমাজে যশ-খ্যাতিতে একে অন্যের উপরে ওঠার প্রতিযোগিতা চোখে পড়ার মতো। এসব প্রতিযোগিতায় কেউ হেরে গেলে তিনি এক ধরনের মানসিক অশান্তিতে ভোগেন। তার ভেতর সৃষ্টি হয় হীনম্মন্যতা। আর তখনই মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
কিশোর-কিশোরীদের জন্য এই চ্যালেঞ্জটা কখনো কখনো বড় হয়ে দেখা দেয়। চাপ থাকে শিক্ষাজীবনে ভালো করার ও কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। সমাজে একজনের ভোগবাদী চাকচিক্যময় বিলাসী জীবন দেখে অপরজনের মধ্যেও তেমন জীবনের লালসা তৈরি হয়। কিন্তু তা অর্জনে ব্যর্থতা তাকে হতাশ করে তোলে। অন্যদিকে নৈতিক শিক্ষার অভাবে শিক্ষার্থীরা সামাজিক নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এসব পুঞ্জীভূত চাপ সহ্যের বাইরে গেলে সবার অজান্তে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করেন।
স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা থেকে বাঁচাতে ধর্মীয় শিক্ষা জরুরি। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। এগুলো ধর্মীয় গ্রন্থে বিস্তারিত রয়েছে। কেউ যদি অধ্যয়ন করে কখনো আত্মহত্যা করতে চাইবে না। ধর্মীয় শিক্ষা মানুষের মনের সব চাপ, যন্ত্রণা বিদূরিত করে প্রশান্তি আনতে পারে। বাংলাদেশের মানুষদের একটি বড় অংশ তাদের সন্তানদের অন্যসব শিক্ষা দিলেও শুধু ধর্মের শিক্ষাটাই দেন না। এছাড়া বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ধর্মীয় শিক্ষাকে অবহেলা করা হয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষার অভাব আত্মহত্যার মতো সমস্যাকে প্রকট করে তুলছে।
মানসিক সমস্যাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিতে হবে। এর প্রথম উৎস হতে পারে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা। সেখানে কিশোরদের সুস্থ বেড়ে ওঠার পাঠ থাকবে। থাকতে হবে মানসিক রোগ চিকিৎসার ব্যবস্থা। মানসিকভাবে পীড়িত কিশোরদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা তাদের দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কোনোরকম থাকলেও স্কুল-কলেজগুলোতে নেই বললেই চলে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরো উন্নত করা প্রয়োজন। সেই সাথে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের মানসিক চিকিৎসা নিয়ে ভাবতে হবে।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যা থেকে বাঁচাতে। আর এজন্য যেমন ধর্মীয় শিক্ষা অপরিহার্য তেমনি মানসিক চিকিৎসা ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।



