এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি আমাদের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। পরীক্ষার হলে কোনো খালি বেঞ্চ শুধু একজন শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি নয়; সেটি একটি পরিবার, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ব্যর্থতারও নীরব সাক্ষ্য।
শিক্ষা বোর্ড ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনেই ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু এর চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ এ বছর পরীক্ষায় বসছে না। দুই বছর আগে এসএসসি ও সমমান পাস করে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে। অর্থাৎ, প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ নিয়মিত শিক্ষার্থী পরীক্ষা শুরুর আগেই ঝরে গেছে।
এটি কোনো সাধারণ অনুপস্থিতির হিসাব নয়। পরীক্ষার দিন অনুপস্থিত থাকা একটি সমস্যা, কিন্তু ফরম পূরণের আগেই লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া আরো বড় সমস্যা। এক দিকে আছে যারা ফরম পূরণ করেও পরীক্ষার হলে আসছে না, অন্য দিকে আছে যারা দুই বছরের মধ্যেই শিক্ষাপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এই দুই শ্রেণীর শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ না করলে সমস্যার প্রকৃত কারণ ধরা যাবে না।
বাংলাদেশ বহু বছর ধরে শিক্ষা বিস্তার নিয়ে গর্বিত। ভর্তি বৃদ্ধি, বই বিতরণ, পরীক্ষার কেন্দ্র বৃদ্ধি, নারী শিক্ষায় অগ্রগতির মতো সাফল্য অস্বীকারের সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভর্তি হলেই কি শিক্ষার্থী ধরে রাখা যায়? পরীক্ষার ফরম পূরণ করলেই কি শিক্ষা সম্পন্ন হয়? আর পরীক্ষার হলে উপস্থিত থাকলেই কি শিক্ষার মান নিশ্চিত হয়? এইচএসসিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশের দরজা বড় হলেও ধরে রাখার ব্যবস্থা দুর্বল।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা প্রশাসনের নেতৃত্ব ও অগ্রাধিকারের প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। নতুন নেতৃত্বের কাছে প্রত্যাশা ছিল, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকসমাজের নৈতিক মর্যাদা পুনর্গঠন, শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠন, নকলমুক্ত পরীক্ষা এবং কলেজভিত্তিক জবাবদিহির মতো মৌলিক বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি। কিন্তু শিক্ষার গভীর সঙ্কট মোকাবেলায় সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার পরিবর্তে যখন দায় এড়ানোর প্রবণতা বা শিক্ষার্থী-শিক্ষককে প্রকাশ্যে দোষারোপের সংস্কৃতি সামনে আসে, তখন নেতৃত্বের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পরীক্ষায় নকল, শিক্ষকের বা প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের ক্ষেত্রে শুধু অভিযোগ করাই যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক স্তরের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়াই দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয়। শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে শুধু পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করে জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা করা যায় না।
সমস্যার কারণ একক নয়। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার চেয়ে আয়-রোজগার করা জরুরি মনে করতে বাধ্য হয়। কেউ পরিবারকে সহায়তা করতে কাজে যোগ দেয়। অনেক ছাত্রী বাল্যবিয়ে, পারিবারিক চাপ বা সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে না পেরে পিছিয়ে যায়। আবার অনেকের জন্য কলেজে নিয়মিত ক্লাস, শিক্ষক সহায়তা, কাউন্সেলিং বা আর্থিক সহায়তা— কোনোটিই কার্যকরভাবে থাকে না।
আরো একটি কঠিন সত্য হলো, শিক্ষা ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও একজন শিক্ষার্থীর বই, নোট, যাতায়াত, পরীক্ষার ফি, পোশাক এবং অন্যান্য খরচ বহন করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন। ফলে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা ক্রমান্বয়ে শিক্ষার ধারা থেকে সরে যায়। এই সরে যাওয়ার খবর পরিবার জানে, কলেজ জানে, সহপাঠীরা জানে; কিন্তু শিক্ষা প্রশাসন তা জানতে পারে পরীক্ষায় অনুপস্থিতির তালিকা হাতে পাওয়ার পর।
কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। যখন বাংলাদেশ দক্ষ জনশক্তি, কর্মমুখী শিক্ষা ও শিল্পভিত্তিক মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা বলছে, সেই সময়ে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরীক্ষার ফরম পূরণ করছে না। এটি শুধু শিক্ষা খাতের সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার, শিল্পায়ন এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতার সাথেও সরাসরি যুক্ত। কারিগরি শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থী হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি পরীক্ষার ক্ষতি নয়; এটি দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হওয়ার পূর্বাভাস।
এখানে কলেজগুলোর দায়ও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একজন শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির পর দুই বছর ধরে নিয়মিত ক্লাস করছে কি না, পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে কি না, আর্থিক সমস্যায় আছে কি না, বিয়ে হয়েছে কি না, কর্মে যুক্ত হয়েছে কি না— এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম পর্যবেক্ষণ থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু ভর্তি, ফি, ফরম পূরণ এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকে। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আগাম সঙ্কেত শনাক্ত করার কোনো ব্যবস্থাই নেই।
শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও এখানে স্পষ্ট। পরীক্ষা শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, সিসিটিভি মনিটরিং, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা এসব প্রয়োজনীয়। কিন্তু এতেই শিক্ষাব্যবস্থার সফলতা প্রমাণ হয় না। যদি লাখ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগেই হারিয়ে যায়, তাহলে কেন্দ্রের শৃঙ্খলা যতই ভালো হোক, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
এখন প্রয়োজন এইচএসসি শিক্ষার্থী ধরে রাখা নিয়ে একটি জাতীয় নিরীক্ষা। এই নিরীক্ষায় এসএসসি পাসের পর একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি, কলেজে নিয়মিত উপস্থিতি, দ্বাদশ শ্রেণীতে উত্তরণ, ফরম পূরণ এবং চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ— প্রতিটি ধাপ আলাদাভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। বোর্ডভিত্তিক, জেলা-উপজেলাভিত্তিক এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হলে বোঝা যাবে কোথায় শিক্ষার্থী বেশি হারিয়ে যাচ্ছে এবং কোন প্রতিষ্ঠান বা অঞ্চলে ঝরে পড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
এই অনুসন্ধান কেবল কাগুজে প্রতিবেদন হবে না। অনুপস্থিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে কারণভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে, অসুস্থতা, কর্মসংস্থান, স্থানান্তর, প্রস্তুতির অভাব, যাতায়াত সমস্যা, প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা— প্রতিটি কারণ আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই হবে না; করণীয়ও নির্ধারণ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য কলেজভিত্তিক কাউন্সেলিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক সহায়তা জোরদার করতে হবে। যেসব ছাত্রী বাল্যবিয়ে বা পারিবারিক চাপে পড়াশোনা ছাড়ছে, তাদের জন্য স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। যারা কাজে ঢুকে গেছে, তাদের জন্য পুনঃভর্তি, উন্মুক্ত শিক্ষা বা দক্ষতাভিত্তিক বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে। শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে যেন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া না হয়।
সবচেয়ে জরুরি হলো, শিক্ষার্থী ধরে রাখার লক্ষ্যে একটি স্থায়ী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কোনো শিক্ষার্থী তিন মাস ক্লাসে অনিয়মিত থাকলে, ধারাবাহিক পরীক্ষায় অংশ না নিলে, ফি পরিশোধে অক্ষম হলে বা কলেজের সাথে যোগাযোগ হারালে তাকে চিহ্নিত করতে হবে। কলেজ, শিক্ষা বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত তথ্যপ্রবাহ থাকলে শিক্ষার্থী হারিয়ে যাওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব।
তবে এই সঙ্কট শুধু উপস্থিতি বা ফরম পূরণের সমস্যা নয়; এটি শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলে। শিক্ষা যদি কেবল সনদ উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়; কিন্তু নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, বিবেক, সত্য-মিথ্যা ও ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা তৈরি করতে না পারে, তাহলে সমাজের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থা শুধু পরীক্ষার্থী তৈরি করে না; নাগরিক তৈরি করে। সেই নাগরিকের মধ্যে সততা, ন্যায়বোধ, দায়িত্বশীলতা, সহনশীলতা এবং অন্যের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা না থাকলে উন্নয়ন টেকসই হয় না। আর্থিক দুর্নীতি, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অন্যের প্রতি অবিচার এবং ক্ষমতার দাপট তখন সমাজকে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে পথ থেকে সরিয়ে অপরাধপ্রবণতা ও নৈতিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
সুতরাং এইচএসসিতে অনুপস্থিতির এই চিত্রকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক ঘটনা হিসেবে দেখা যাবে না। এটি শিক্ষার্থী ধরে রাখার ব্যর্থতা, দারিদ্র্যের চাপ, সামাজিক নিরাপত্তার দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির ঘাটতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার সম্মিলিত সঙ্কেত। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আজকের খালি পরীক্ষার বেঞ্চ আগামী দিনের অদক্ষ কর্মশক্তি, হতাশ যুবসমাজ এবং দুর্বল জাতীয় সক্ষমতায় পরিণত হবে।
আমরা কি কেবল পরীক্ষার্থীর সংখ্যা গুনব, নাকি হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার জাতীয় দায়িত্ব নেবো?
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য


