জুলাইয়ের আত্মত্যাগের প্রতি আমাদের দায়

জুলাই চব্বিশের স্মৃতি উদযাপনের অজুহাতে আমরা পুনরায় ফাঁসির কাষ্ঠ প্রদর্শন করছি এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের বন্দীকরণ ও লাঞ্ছনার রূপক নাটক মঞ্চস্থ করছি। অথচ অহিংস প্রতিরোধ ও নান্দনিক সৃজনশীলতাই ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রধানতম অনুষঙ্গ, যা আজ বিলুপ্ত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে নিপতিত। আমাদের কেবল প্রত্যাশাÑ আসন্ন দিনগুলোর স্মারক কর্মসূচিগুলো সেই বীর শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করবে, যাদের অসামান্য ত্যাগের বিনিময়ে এ ঐতিহাসিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল

২০২৬ সালের ৫ আগস্ট আমরা শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার অবসানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে পদার্পণ করব। জুলাই মাসের শুরু থেকে এ বিপ্লব স্মরণ করতে সারা দেশে বর্ণাঢ্য উৎসব, সম্মেলন ও সেমিনারের আয়োজন করা হচ্ছে। ফ্যাসিবাদের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়া সেই সাহসী ও প্রজ্ঞাবান ছাত্র-জনতাকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করার একটি স্মরণীয় দিন হওয়া উচিত ছিল বার্ষিকীটি। কিন্তু সেই গণ-অভ্যুত্থানের মূল আদর্শ ও দর্শন নিয়ে গভীর ভাবনার বদলে, কিছু উদযাপনে যেন সেই দিনগুলোর সবচেয়ে সহিংস ও নারকীয় মুহূর্তগুলোর পুনরায় মঞ্চস্থ করার অপচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এ উদযাপনগুলো আমাদের আবারো সেই রাজনৈতিক আগ্রাসনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেগুলো একসময় শাহবাগ আন্দোলনের সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল- যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি নিহিত ছিল মূলত শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের অসীম সাহসের মধ্যে। সশস্ত্র পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে, দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আবু সাঈদ সেই সাহসের এক জীবন্ত রূপক হয়ে উঠেছিলেন। আবার ক্লান্ত-শ্রান্ত আন্দোলনকারীদের মধ্যে পানি হাতে ছুটে চলা মীর মুগ্ধ তুলে ধরেছিলেন এ লড়াইয়ের মানবিক মুখটি। তাদের মতো আরো অগণিত তরুণ পুলিশের তৈরি ব্যারিকেড আর তাক করা বন্দুকের সামনে একদম খালি হাতে কিন্তু অকুতোভয় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের এই প্রতিরোধ এত বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল ঠিক এ কারণে যে, তা রাষ্ট্রযন্ত্রের নৃশংসতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছিল; কিন্তু নিজে সেই নৃশংসতার অন্ধ অনুকরণ করেনি। এ নিবন্ধে আমরা বর্ষপূর্তি পালনের কিছু দুর্ভাগ্যজনক দিক পর্যালোচনা করেছি। ব্যাখ্যা করেছি কেন সহিংসতাকে মহিমান্বিত করার এ উৎসবগুলো জুলাইয়ের আসল চেতনা ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়, তা হলো- জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল একটি শান্তিপূর্ণ গণ-আন্দোলন। সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছিল পুলিশ বাহিনী এবং বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ। অন্যদিকে শিক্ষার্থী ও সাধারণ আন্দোলনকারীরা ছিলেন সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখতে তারা স্বেচ্ছায় জীবন ও রক্তের মূল্য দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। আন্দোলনের সময় অসংখ্য মানুষের নিহত ও আহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা তাদের সেই অসাধারণ সংযম ও আত্মত্যাগের সবচেয়ে নির্মম সাক্ষ্য বহন করে।

দ্বিতীয়ত, জুলাই বিপ্লবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্দোলনের সেই অনন্য সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক মেজাজ। শিক্ষার্থীরা তাদের দিকে ছুড়ে দেয়া গালি ও কটূক্তিগুলোকে আন্দোলনের শাণিত হাতিয়ারে রূপান্তর করেছিলেন। শেখ হাসিনা যখন বিক্ষোভকারীদের ‘রাজাকার’ বলে অপমান করার অপচেষ্টা করলেন, তখন তারা সেই ঐতিহাসিক স্লোগানে জবাব দিলেন- ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার! কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!’ আর ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার!’ এর মাধ্যমে ছাত্ররা শাসকের অপমানজনক তিরস্কারকে উল্টে তাদের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। একইসাথে শব্দটির অপপ্রয়োগকে সেই স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার জন্যই এক চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়ে পরিণত করেছিলেন।

সম্প্রতি ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও এই সৃজনশীল প্রতিবাদের এক চমৎকার প্রতিফলন দেখা গেছে। ভারতের প্রধান বিচারপতি যখন বেকার তরুণদের একাংশকে ‘তেলাপোকা’র সাথে তুলনা করেন, তখন সেই অবমাননাকর মন্তব্য মুহূর্তে ক্ষোভের সঞ্চার করে। কিন্তু তরুণরা অপমানকে নীরবে মেনে নেননি; বরং সেটিকে ব্যঙ্গের শিল্পে রূপান্তরিত করে গড়ে তোলেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-একটি প্রতীকী প্রতিবাদ, যার অস্তিত্ব ক্ষমতার অবজ্ঞাকে বিদ্রুপে পরিণত করেছিল। ঘটনাটি প্রমাণ করে, দুই বছর আগে বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীরা যে সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধের নতুন ভাষা নির্মাণ করেছিলেন, তার প্রভাব সীমান্ত অতিক্রম করে উপমহাদেশের অন্য তরুণদের কাছেও পৌঁছেছে। তাদের সংগ্রাম শুধু মিছিলের পদধ্বনিতে নয়; ভাষার শাণিত ব্যবহার, রসবোধ, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ এবং প্রতীকের সৃজনশীল প্রয়োগের মধ্য দিয়েও কর্তৃত্ববাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ ব্রিটিশ আমলের সেই পুরনো কথাটিকে যেন নতুন শক্তিতে স্মরণ করিয়ে দেয়- ‘বাংলা আজ যা ভাবে, বাকি ভারত তা ভাবে কাল’।

এখন আসা যাক, চলতি বছর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মরণে আয়োজিত কিছু কর্মসূচি কিভাবে পরিচালিত হয়েছে, সে প্রসঙ্গে। ২০২৬ সালের ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ‘লীগ ধর ম্যারাথন’ নামে একটি কর্মসূচির আয়োজন করেন, আক্ষরিক অর্থে এটি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সদস্যদের পাকড়াও করার এক ম্যারাথন কর্মসূচিকে নির্দেশ করে। এতে অংশগ্রহণকারীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সদস্যদের অনুকরণে পোশাক পরা তিন ব্যক্তিকে ধাওয়া করেন; তাদের মাথায় ছিল মোটরসাইকেলের হেলমেটও। ধাওয়ার সময় অংশগ্রহণকারীরা বোতল ও খালি হাতে তাদের আঘাত করার অভিনয় করেন। পরে ওই তিনজন কথিত ‘ছাত্রলীগ সদস্যকে’ আটক করার পর তাদের হাত পেছনে রেখে রাস্তায় প্রদর্শন করা হয়। পুরো আয়োজনটি ছিল বিশৃঙ্খল, অপমানজনক এবং সহিংসতার অনুকরণে ভরপুর। যদিও বাস্তবে সহিংসতা সংঘটিত হয়নি, তবু এই আয়োজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধাওয়া করা, মারধর করা, আটক করা এবং জনসমক্ষে অপমান করাকে এক ধরনের বিনোদন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কোনো গভীর ও চিন্তাশীল স্মরণ ছিল না; বরং এটি ছিল জনতার বিচারের (মব) সংস্কৃতিকে নাটকীয়ভাবে উদযাপন করার এক প্রদর্শনী।

তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয় তিন দিনব্যাপী একটি প্রদর্শনী। এটি নিঃসন্দেহে ছিল একটি চমৎকার আয়োজন, যেখানে শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে নির্মিত রসাত্মক কার্টুন স্থান পেয়েছিল। প্রদর্শনীটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য- শিল্পবোধ, সৃজনশীলতা ও তীক্ষè রসবোধের অসাধারণ প্রকাশ ঘটিয়েছিল। তবে এর একটি প্রদর্শনী ছিল গভীরভাবে উদ্বেগজনক। সেটি ছিল ফাঁসির মঞ্চে ঝুলন্ত শেখ হাসিনার একটি প্রতিকৃতি। আমাদের কাছে এটি শাহবাগ আন্দোলনের সেই সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দিতে এবং মৃত্যুদণ্ডের দাবিকে এক ধরনের জনসম্মুখের বিনোদনে পরিণত করতে অনুরূপ প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার শাসনকাল বা তৎকালীন অপরাধের দায় সম্পর্কে মূল্যায়ন ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, তবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের উৎসবে কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ফাঁসির কাষ্ঠে প্রদর্শন করার এই রাজনীতি কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

দুর্ভাগ্যবশত, এ দু’টি ঘটনার কোনোটির সাথে জুলাইয়ের মূল চেতনার ন্যূনতম সম্পর্ক ছিল না। বিপ্লবের সেই শান্তিপূর্ণ, সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধের মহিমাকে স্মরণে রাখার বদলে, তারা এ বর্ষপূর্তিতে নিয়ে এসেছেন সহিংসতা, লাঞ্ছনা আর প্রতিশোধের অন্ধ উন্মাদনা। ঘটনা দু’টি জুলাই বিপ্লবের চেয়ে শাহবাগের সেই উগ্র ‘মব’ বা গণজমায়েতের সাথে বেশি মিলে যায়। শাহবাগের সেই সমাবেশেও বাঁশ-কাঠের অস্থায়ী ফাঁসির মঞ্চ বানিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে অভিযুক্ত বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের কুশপুত্তলিকা ঝুলানো হয়েছিল। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ যখন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে, ঠিক তখনই শাহবাগ আন্দোলনের সূচনা হয়। একদল লোক ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কটি দখল করে বসে। একইসাথে সেই সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করার দাবি তোলে। ‘ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই’ স্লোগান তখন কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের কণ্ঠে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল কোমলমতি শিশুদের মুখেও। যেসব রাজনীতিবিদের নাম পর্যন্ত ওই শিশুরা কোনোদিন শোনেনি, রাজনীতির স্বার্থে তাদের ফাঁসি চাওয়ার মতো ভয়াবহ চর্চায় ব্যবহার করা হয়েছিল এ নিষ্পাপ মুখগুলো। সেখানে মূলত বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর বিষয়টিকে ‘দেশপ্রেমের’ চাদরে আবৃত করা হয়েছিল।

জুলাই চব্বিশের স্মৃতি উদযাপনের অজুহাতে আমরা পুনরায় ফাঁসির কাষ্ঠ প্রদর্শন করছি এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের বন্দীকরণ ও লাঞ্ছনার রূপক নাটক মঞ্চস্থ করছি। অথচ অহিংস প্রতিরোধ ও নান্দনিক সৃজনশীলতাই ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রধানতম অনুষঙ্গ, যা আজ বিলুপ্ত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে নিপতিত। আমাদের কেবল প্রত্যাশা- আসন্ন দিনগুলোর স্মারক কর্মসূচিগুলো সেই বীর শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করবে, যাদের অসামান্য ত্যাগের বিনিময়ে এ ঐতিহাসিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি