বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- কিভাবে বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফেরা যায়। মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদহার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। অথচ অর্থনীতির মৌলিক সত্য হলো, বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি হয় না, প্রবৃদ্ধি ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না, আর কর্মসংস্থান ছাড়া সামাজিক স্থিতিশীলতাও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অবকাঠামো, রফতানি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে; কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি সেই সাফল্যের সাথে তাল মেলাতে পারেনি। নতুন শিল্প স্থাপনে উদ্যোক্তারা আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক। কারণ, ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়েছে, ঋণের সুদহার উচ্চ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা নিয়ে অনেকের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ফলে অর্থনীতির চাকাকে আরো দ্রুত ঘোরাতে হলে প্রথম কাজ হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।
বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে জনমিতিক সুবিধা একসময় বোঝায় পরিণত হতে পারে। শুধু শিক্ষিত বেকারই নয়, গ্রামীণ অঞ্চলের প্রচ্ছন্ন বেকারত্বও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষির সঙ্কোচন এবং জীবিকার সীমাবদ্ধতায় অনেক মানুষ শহরমুখী হচ্ছেন; কিন্তু শহরের অনানুষ্ঠানিক খাতও আর আগের মতো কর্মসংস্থান দিতে পারছে না। এই বাস্তবতায় শিল্পায়নের বিকল্প নেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমানে এক জটিল ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব পালন করছে। এক দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর মুদ্রানীতি, অন্য দিকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা। উচ্চ সুদহার মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। তাই নীতিনির্ধারকদের এমন পথ খুঁজতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত না হয়।
এ ক্ষেত্রে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রফতানিমুখী উৎপাদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন অত্যন্ত জরুরি। আর্থিক সঙ্কটে থাকা সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু প্রণোদনা ঘোষণা যথেষ্ট নয়; অর্থের যথাযথ ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে না পারলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এখন আর বিলাসিতা নয়; অপরিহার্যতা। খেলাপি ঋণের পাহাড়, দুর্বল সুশাসন এবং কিছু ব্যাংকের আর্থিক সঙ্কট বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদার ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। ঋণ অনুমোদন থেকে শুরু করে পুনরুদ্ধার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নতুন বিনিয়োগের পথ কখনোই পুরোপুরি উন্মুক্ত হবে না।
একই সাথে সরকারের দায়িত্ব হলো বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। করব্যবস্থার সরলীকরণ, ব্যবসায় শুরুর প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, দ্রুত বন্দরসেবা, কার্যকর বিচারব্যবস্থা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা শুধু কর-সুবিধা দেখেন না; তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতাও মূল্যায়ন করেন।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এক দিকে তরুণ জনশক্তি, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার- অন্য দিকে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক দুর্বলতা। এই বাস্তবতায় অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে হলে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগই পারে অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে। বিনিয়োগের গতি ফিরলে শিল্পের চাকা ঘুরবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, রফতানি সম্প্রসারিত হবে এবং রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। তখনই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনীতির পথে আরো দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।
অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কেবল কত অর্থ ব্যয় করা হলো তার ওপর নয়; বরং কোথায়, কিভাবে এবং কতটা দক্ষতার সাথে সেই বিনিয়োগ পরিচালিত হলো তার ওপর। এখন প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত, সুশাসনভিত্তিক সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্রীয় কর্মকৌশল। কারণ বিনিয়োগের গতি ফিরলেই বদলাবে অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



