দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক টিকে থাকার লড়াই

অর্থনীতির আরো রক্তক্ষরণ রোধ করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা অভিজ্ঞতা এবং অনিন্দ্য পেশাদারিত্বকে কঠোরভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সর্বোপরি রাজনৈতিক নেতাদের একটি মৌলিক সত্য বুঝতে হবে, রাজনৈতিক যুদ্ধের অস্থির বালুর ওপর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে তোলা যায় না। অর্থনীতিকে রক্ষা করার জন্য যদি একটি সত্যিকারের এবং ইস্পাতকঠিন রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা না হয় তবে আসন্ন বিপর্যয় কোনো দল, কোনো আদর্শ বা কোনো ব্যক্তিকে রেহাই দেবে না

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতবিক্ষত ও ভঙ্গুর অবস্থার পুনরুদ্ধার এখন আর কেবল কিছু যান্ত্রিক বা কারিগরি সংস্কারের বিষয় নয়। এটি এখন রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের আমূল ও দ্রুত অবসান দাবি করে। তবে যারা রাজনীতিকে সামগ্রিক জাতীয় কল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা দলীয় সঙ্কীর্ণ স্বার্থের চশমায় দেখেন তারা নিঃসন্দেহে এমন প্রস্তাবে পিছপা হবেন। রাজনৈতিক শ্রেণীর একটি বড় অংশ যেকোনো জাতীয় অগ্রগতির আগেই নিজেদের সুযোগ সুবিধা সুরক্ষিত করতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে জিম্মি রাখতে পছন্দ করে। বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরে এমন এক ধরনের রাজনৈতিক কুশীলবদের কারণে ভুগছে যারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক চরম ও দুঃখজনক দূরদৃষ্টিহীনতা দেখিয়ে আসছেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা আছেন তাদের ওপর বর্তমানে যে কী পরিমাণ এবং কতটা চূর্ণবিচূর্ণকারী চাপ রয়েছে তা বুঝতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো এটি যৌথ প্রজ্ঞা এবং বিভিন্ন মতামতের মেলবন্ধনে বিকশিত হয়। এই মৌলিক বিশ্বাসকে ধারণ করেই নীতিনির্ধারকদের বর্তমান অর্থনৈতিক দুর্দশার দিকে সরাসরি তাকাতে হবে। আমরা সমাজ সংস্কৃতি হিসেবে যা উদযাপন করি তা একটি সুস্থ অর্থনৈতিক সংস্কৃতি থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। আধুনিক বিশ্বে অর্থনীতি কোনো পার্টটাইম শখ বা খেয়ালখুশি নয়, মৌলিক বিজ্ঞানের মতোই এটি একটি অপরিহার্য শাখা। যারা সরল বিশ্বাসে মনে করেন নৈতিকতার স্থান কেবলই উপাসনালয়ের মঞ্চে আর অর্থনীতি হলো কেবলই লাভক্ষতির এক নির্মম হিসাব তারা অ্যাডাম স্মিথের নৈতিক দর্শনের সাথে একেবারেই পরিচিত নন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মানুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং এর মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা দরকার। আজ দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাস করা পদ্ধতিগত পচনই এই মূল্যবোধের মারাত্মক অনুপস্থিতির প্রমাণ দিচ্ছে।

আমাদের ব্যাংকিং খাত আজ খেলাপি ঋণের এক আকাশচুম্বী পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে একজন ক্লান্ত পথিকের মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। দমবন্ধ করা এক বোঝার মতো এই মন্দ ঋণগুলো জাতীয় প্রবৃদ্ধির ওপর এক স্থবির পাথর হয়ে বসেছে। আদায়ের কোনো বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা ছাড়াই খাতার পাতায় এই বিষাক্ত সম্পদগুলো লিখে রাখা কেবলই পরিসংখ্যানগত আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়। সাধারণ আমানতকারীদের অর্থের এই নির্লজ্জ অপব্যবহার আর্থিক নীতি ও জবাবদিহিতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী অথচ আমাদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো এখনো নখদন্তহীন বাঘের মতো নিষ্ক্রিয়। এই সঙ্কট রাতারাতি তৈরি হয়নি আর কেবল কলমের এক খোঁচায় এর সমাধানও করা যাবে না। বর্তমান সরকার একটি সুসংহত ও ব্যবসাবান্ধব ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিবর্তে মূলত একটি জ্বলন্ত ঘর উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এখন সময় এসেছে সহানুভূতি এবং চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে খেলাপিদের শ্রেণিবিভাগ করা এবং তাদের প্রকৃত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা যে বুদ্ধিবৃত্তিক সততা আমাদের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় একদমই ছিল না। দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতিগত সংস্কারের পরিবর্তে রাষ্ট্র অর্থঋণ আদালতের মতো কিছু নামকাওয়াস্তে আইনি পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করেছে যার সাফল্য লজ্জাজনকভাবেই সীমিত।

ঠিক কীভাবে এবং কোন শর্তে এই বিপুল ঋণ অনুমোদিত হয়েছিল তার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হওয়া জরুরি। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং পরিচালকেরা দেশের সম্পদ বিলিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে কী ভূমিকা পালন করেছিলেন তা সামনে আনা দরকার। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের নিম্নস্তরের কর্মকর্তাদের অনিয়মের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে, অথচ পর্দার আড়াল থেকে যারা টেলিফোনে নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই ক্ষমতাশালী অভিজাতরা জবাবদিহিতার আওতার বাইরে বহাল তবিয়তে রয়ে গেছেন। এই আর্থিক নৈরাজ্যের মানবিক মূল্য অত্যন্ত চড়া, যা ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে দুঃখজনক মেরুকরণ তৈরি করেছে। এক দিকে আছেন প্রকৃত উদ্যোক্তারা যারা নিজেদের মর্যাদা রক্ষায় চরম ত্যাগ স্বীকার করে ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করেছেন এবং পরবর্তীতে বিনিয়োগের মাঠ থেকে সম্পূর্ণ সরে দাঁড়িয়েছেন অথবা দেশত্যাগ করেছেন। অন্য দিকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব এবং ঋণ বিতরণে বিলম্বের কারণে অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পঙ্গু হয়ে পড়েছে যারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পরিবর্তে চড়া সুদের স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছে। এই কাঠামোগত অসঙ্গতি মারাত্মক পরিশোধের চাপ তৈরি করেছে, যা সম্ভাবনাময় প্রবৃদ্ধির গলা টিপে ধরছে।

ইতোমধ্যে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি বিশেষ গোষ্ঠী, যারা টেবিলের নিচে হাত মেলানোর মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের ঋণ হাতিয়ে নিয়েছে তারা প্রকৃত উৎপাদনশীল শিল্পে বিনিয়োগের খুব একটা তোয়াক্কাই করেনি। সৎ এবং কঠোর পরিশ্রমী উদ্যোক্তাদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে পুঁজি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, অন্য দিকে পুঁজিবাজারকে এমনভাবে প্রভাবিত ও দুর্বল করা হয়েছে যেখানে পুনরুদ্ধার এখন এক দূরবর্তী মরীচিকা বলে মনে হয়। এর স্বাভাবিক ফলাফল হিসেবে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশের শিল্প খাতে পুঁজি খাটানোর ক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন ও শীতল অনিচ্ছা দেখা যাচ্ছে। আজ দেশ এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি, এমনকি যারা অতীতে ঋণ পেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তারা এখন চেষ্টা করলেও কোনো অর্থায়ন পাবেন না। কারণ অধিকাংশ ব্যাংকই তীব্র তারল্য সঙ্কটে ভুগছে। সাধারণ আমানতকারীরা ব্যাংকের কাউন্টার থেকে নিজেদের কষ্টার্জিত টাকা তুলতে পারছেন না। এই স্থবিরতা মূলত একটি তীব্র বিনিয়োগ খরার রূপ নিয়েছে যেখানে প্রবৃদ্ধির দেশীয় ইঞ্জিনটি বিকল হয়ে পড়েছে উদ্যোক্তারা ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে ভয় পাচ্ছেন আর ব্যাংকের কুয়োতে দেয়ার মতো কোনো পানি অবশিষ্ট নেই।

এমন এক বিষাক্ত পরিস্থিতিতে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ এসে অর্থনীতিকে উদ্ধার করবে এমনটা আশা করা নিছক দিবাস্বপ্ন। বিদেশী পুঁজি স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত হিসাবনিকাশ করে চলে এটি কেবল উচ্চ মুনাফার দিকে ধাবিত হয় এবং সাধারণত ৩০ শতাংশ থেকে শতভাগ পর্যন্ত মার্জিন খোঁজে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যেখানে মাত্র ২০ শতাংশ মুনাফা অর্জন করাই এক হিমালয়সম কঠিন কাজ সেখানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ১৪ শতাংশের মতো চড়া ঋণ ব্যয়ের বাজারে ঝুঁকি নেয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

দেশকে এই খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই ফাঁকা বুলি বা বাগাড়ম্বর পরিহার করে জরুরি কাঠামোগত হস্তক্ষেপ করতে হবে। প্রথমত প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে খেলাপি ঋণ সঙ্কট ব্যাপকভাবে মোকাবেলার জন্য একটি নিবেদিত স্বাধীন কমিশন গঠন করতে হবে। অথবা কোনো দলীয় প্রতিহিংসামূলক তদন্তের পরিবর্তে একটি জাতীয় উদ্ধার অভিযান নিশ্চিত করতে সরকারি ও বিরোধী দলের সবচেয়ে তীক্ষè মেধার সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সংসদীয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত অর্থনীতির আরো রক্তক্ষরণ রোধ করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা অভিজ্ঞতা এবং অনিন্দ্য পেশাদারিত্বকে কঠোরভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সর্বোপরি রাজনৈতিক নেতাদের একটি মৌলিক সত্য বুঝতে হবে, রাজনৈতিক যুদ্ধের অস্থির বালুর ওপর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে তোলা যায় না। অর্থনীতিকে রক্ষা করার জন্য যদি একটি সত্যিকারের এবং ইস্পাতকঠিন রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা না হয় তবে আসন্ন বিপর্যয় কোনো দল, কোনো আদর্শ বা কোনো ব্যক্তিকে রেহাই দেবে না।

লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, নিউ নেশন