শিক্ষা মানবসভ্যতার অগ্রগতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক গঠনে শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। যে জাতি শিক্ষায় যত উন্নত, সে জাতি অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতিতেও তত এগিয়ে। তাই শিক্ষার গুণগত মান একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও শিক্ষা মানুষের আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। পবিত্র কুরআনের প্রথম নাজিলকৃত শব্দ ‘ইকরা’ (পড়ো) মানবজাতিকে জ্ঞানার্জনের প্রতি আহ্বান জানায়। রাসূল সা: বলেছেন, ‘জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ’। ইসলামে জ্ঞানকে কেবল ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; বরং মানবকল্যাণে উপকারী সব ধরনের জ্ঞানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইতিহাসে মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে ইবনে সিনা, আল-ফারাবি, আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে রুশদ ও আল-বিরুনির মতো মনীষীরা চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন ও প্রযুক্তিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন।
কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে সনদ অর্জন, চাকরি লাভ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। ফলে জ্ঞান, দক্ষতা ও নৈতিকতার সমন্বিত বিকাশ অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হচ্ছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের বড় অংশ চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের ঘাটতি সমাজে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে শিক্ষার পরিমাণগত বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ভর্তি হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। পাঠ্যক্রম ও কর্মবাজারের মধ্যে দুর্বল সংযোগ, গবেষণায় সীমিত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির অপর্যাপ্ত ব্যবহার এবং শিল্প খাতের সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বল সমন্বয় সমস্যা আরো জটিল করে তুলেছে।
তাত্ত্বিক শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং জ্ঞানের ভিত্তি গড়ে তোলে। এটি যেকোনো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য। তবে বর্তমান বিশ্বে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। কর্মমুখী শিক্ষা শিক্ষার্থীদের বাস্তবজীবনে প্রয়োগযোগ্য দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে দক্ষ মানবসম্পদই একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানির ‘ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেম’ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। সেখানে শিক্ষার্থীরা একদিকে শ্রেণিকক্ষে তাত্ত্বিক শিক্ষা গ্রহণ করে, অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি প্রশিক্ষণ নেয়। এর ফলে চাকরিতে প্রবেশের আগেই তারা কর্মক্ষেত্রের চাহিদা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করে।
জাপানের শিক্ষাব্যবস্থাও কর্মমুখী শিক্ষার সফল উদাহরণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশটি যে দ্রুত উন্নয়ন অর্জন করেছে, তার অন্যতম কারণ ছিল শৃঙ্খলাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দক্ষতামুখী শিক্ষাব্যবস্থা। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া শিক্ষা ও প্রযুক্তিকে একীভূত করে মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। চীনও কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে ব্যাপক বিনিয়োগ করে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে।
বর্তমান উন্নয়নশীল বিশ্বের বড় সমস্যা হলো শিক্ষিত বেকারত্ব। বাংলাদেশে শিক্ষা ও কর্মবাজারের মধ্যে বিদ্যমান অসামঞ্জস্যের কারণে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানার্জন করলেও বাস্তব দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে।
এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক সমস্যাও সৃষ্টি করছে। বেকারত্ব তরুণদের মধ্যে হতাশা, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি করছে। পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার কারণে অনেকেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। জাতীয় উন্নয়নের জন্যও এটি একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। কারণ রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগে শিক্ষিত হওয়া মানবসম্পদ যদি উৎপাদনশীল কাজে অংশগ্রহণ করতে না পারে, তবে তা অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নৈতিকতা। শিক্ষা কেবল পেশাগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের চরিত্র গঠন, নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশেরও প্রধান ভিত্তি।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন অভূতপূর্ব হলেও নৈতিক সঙ্কটও কম নয়। দুর্নীতি, সহিংসতা, মাদকাসক্তি, সামাজিক অবক্ষয় এবং অসহিষ্ণুতার মতো সমস্যাগুলো ক্রমবর্ধমান। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় নৈতিক শিক্ষা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাঠ্যক্রমে নৈতিক শিক্ষা, নাগরিক দায়িত্ববোধ, মানবিকতা, সহনশীলতা এবং সামাজিক সচেতনতার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট শিক্ষা খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার সম্প্রসারণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ভাবনারই প্রতিফলন।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় কর্মমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই। এ প্রেক্ষাপটে বাজেটে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার উপযোগী দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ববহ।
বাজেটে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং শিক্ষা-শিল্প খাতের সমন্বয়ের যে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা কর্মদক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ শক্তিশালী করা গেলে দেশীয় শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
তবে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিতের পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বাধীনতা ও সহায়তা দিতে হবে।
একই সাথে শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সময়োপযোগী ও কার্যকর করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, পাঠ্যক্রমকে কর্মবাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদা দিতে হবে। তৃতীয়ত, ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থত, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধকে শিক্ষার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের আধিক্য, দক্ষতার ঘাটতি এবং কর্মবাজারের সাথে দুর্বল সংযোগ জাতীয় উন্নয়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষা অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং উৎপাদনশীল মানবসম্পদ গঠনের জন্য অপরিহার্য। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর কিছুটা গুরুত্বারোপ করা হলেও শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্র গঠন, মূল্যবোধ চর্চা এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও কার্যকর উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত। আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে জ্ঞান, দক্ষতা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে কর্মক্ষম, সৃজনশীল, দায়িত্বশীল এবং মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরি হবে। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থাই দেশের টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক মানবিক রাষ্ট্রগঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ গবেষক ও কলামিস্ট



