ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর

তারেক রহমানের চীন সফরকে ভারতের গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহল কেবল রুটিন দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে দেখেনি; একে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্য এবং বাংলাদেশের নতুন ও সাহসী কূটনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। বেইজিংয়ে বাংলাদেশের এই সফল পদচারণা আগামী দিনগুলোতে কেবল ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের গতিপথই নির্ধারণ করবে না, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণ নতুন করে লিখতে বাধ্য করবে- যার ঢেউ ইতোমধ্যেই নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে লাগতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বেইজিং সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে অভূতপূর্ব আলোড়ন তুলেছে। বিশেষ করে ভারতের মূল ধারার গণমাধ্যম ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের টেবিলে এই সফর সবচেয়ে আলোচিত। ভারতের নীতি-নির্ধারক মহল ও সংবাদমাধ্যম এই সফরের প্রতি মুহূর্ত নিবিড়ভাবে অনুসরণ করেছে। তাদের বিশ্লেষণে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গভীরতা, বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত উদ্বেগ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’, ‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’, ‘হিন্দুস্তান টাইমস’, ‘দ্য হিন্দু’, ‘এনডিটিভি’, ‘দ্য প্রিন্ট’, ‘আউটলুক’ এবং ‘ইন্ডিয়া টুডে’- প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের এই প্রথম বড় দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফরকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে দেখছে। ভারতীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফর প্রতীকী এবং কৌশলগত উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে স্বভাবতই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। তিস্তা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও স্পর্শকাতর নদী। ভুটানের পাহাড়ি অঞ্চলে (যেখানে এর নাম ‘নরজিৎ’) উৎপত্তি হয়ে দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির মধ্য দিয়ে গাজলডোবা হয়ে নদীটি বাংলাদেশে ঢুকেছে। লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প।

২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি শেষ হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতায় তা ভেস্তে যায়। ভারতীয় গণমাধ্যম এখন অকপটে স্বীকার করছে, নয়াদিল্লির এই দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত ব্যর্থতার সুযোগই বেইজিং লুফে নিয়েছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা ব্যারাজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং যেকোনো মূল্যে এই প্রকল্প এগিয়ে নেয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

চীনের অর্থ ও কারিগরি সহায়তায় তিস্তায় জলাধার নির্মাণ, খাল খনন এবং সামগ্রিক অববাহিকা উন্নয়নের এই মহাপরিকল্পনা এখন বাস্তবায়নের পথে। ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তায় চীনের সম্পৃক্ততা দিল্লির জন্য কেবল সাধারণ উদ্বেগের কারণ নয়, এটি গভীর কৌশলগত দুশ্চিন্তার বিষয়। ভারতের শঙ্কা, এর ফলে শিলিগুড়ি করিডোর বা ভারতের ‘চিকেনস নেক’ একদম কাছে চীনের পরোক্ষ উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে।

তিস্তার পাশাপাশি ভারতের গণমাধ্যমে আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় ছিল মোংলা বন্দর ও লালমনিরহাট বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার চীনের সহযোগিতায় মোংলা বন্দরের পাশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতীয় কৌশলগত বিশ্লেষকরা এটিকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা বর্ধিত উপস্থিতির অংশ হিসেবে দেখছেন, যা ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। একইভাবে উত্তরবঙ্গে লালমনিরহাট বিমানবন্দরের আধুনিকায়নে চীনের সম্ভাব্য কারিগরি সম্পৃক্ততাকেও ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা গুরুত্বের সাথে দেখছেন।

সফরকালে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। ভারতের মূল ধারার গণমাধ্যম মনে করছে, এই চুক্তিগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চেহারা বদলে দিতে ভূমিকা রাখলেও, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় ভারতের হাত দুর্বল করতে পারে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়েও ভারতীয় মিডিয়ায় কম জল্পনা-কল্পনা হয়নি। বাংলাদেশের সম্ভাব্য চীনা সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় এবং দুই দেশের প্রতিরক্ষা সংলাপ নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। যদিও সফর শেষে কোনো আনুষ্ঠানিক বড় সামরিক চুক্তির ঘোষণা আসেনি, তবুও ভারতীয় গণমাধ্যম বিষয়টি সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করেছে।

তবে ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকদের লেখায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পরিপক্বতার দিকও ফুটে উঠেছে। তাদের মতে, ঢাকা এখন আর কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল না থেকে ‘ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখিতা’ বা Balanced Multi-alignment-এর নীতি অনুসরণ করছে। বাংলাদেশ একদিকে যেমন নিজের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে চীনের সাথে অবকাঠামোগত সম্পর্ক জোরদার করছে, তেমনই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে ভারতের সাথেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বেশির ভাগ দায়িত্বশীল বিশ্লেষণে একটি বিষয়ে ঐকমত্য লক্ষ করা গেছে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের এই নতুন গভীরতা মানেই অবশ্যম্ভাবীভাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবসান বা অবনতি নয়। বরং বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে প্রাধান্য দিচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে, তারেক রহমানের চীন সফরকে ভারতের গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহল কেবল রুটিন দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে দেখেনি; একে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্য এবং বাংলাদেশের নতুন ও সাহসী কূটনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। বেইজিংয়ে বাংলাদেশের এই সফল পদচারণা আগামী দিনগুলোতে কেবল ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের গতিপথই নির্ধারণ করবে না, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণ নতুন করে লিখতে বাধ্য করবে- যার ঢেউ ইতোমধ্যেই নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে লাগতে শুরু করেছে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক