ইমাম জুয়াইনি, ইমাম গাজ্জালি ও আবু ইসহাক শাতিবি রহ: দেখান, শরিয়াহর লক্ষ্য মানবজীবনে দ্বীন, জীবন, বুদ্ধি, ইজ্জত, বংশ ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ শরিয়াহর প্রাণ নিহিত আছে তার উদ্দেশ্যে, কেবল তার বাহ্যিক রূপে নয়। এর ফলে ইসলামী আইনকে ইতিহাসের পরিবর্তিত বাস্তবতার সাথে সংযুক্ত করার শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মিত হয়।
পরবর্তীতে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি রহ: এই চিন্তার আরো বিস্তৃতি ঘটান। তিনি শরিয়াহ, ইতিহাস, সমাজ ও মানব-প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্ক অনুসন্ধান করে দেখান, ইসলামের বিধানগুলোর হিকমাহ বুঝতে হলে সমাজের গঠন, সভ্যতার বিকাশ এবং মানুষের বাস্তব অবস্থার প্রতিও দৃষ্টিপাত করতে হবে। তার হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ মূলত এই উপলব্ধিরই এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে শরিয়াহকে মানবসমাজের বাস্তব কল্যাণের সাথে সম্পর্কিত এক জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
মুসলিমরা যখন পারস্য, রোম, ভারত বা গ্রিক জ্ঞানের মুখোমুখি হয়েছেন, তখন তারা অন্ধ অনুকরণ করেনি; আবার অন্ধ প্রত্যাখ্যানও করেনি। তারা গ্রহণ, সমালোচনা, পরিশোধন ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে নতুন সভ্যতাগত সংশ্লেষ তৈরি করেছেন। আজ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো তুরাসকে পুনরায় জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে আবিষ্কার করা। অন্য দিকে আত্মবিসর্জনমূলক আধুনিকতাবাদ মুসলিম উম্মাহের প্রধান হুমকি।
আধুনিকতা মুসলিম সমাজের কাছে কেবল নতুন জ্ঞান বা নতুন প্রযুক্তি হিসেবে উপস্থিত হয়নি; বরং মুসলিম উম্মাহর ওপর চাপাতে চেয়েছে পরাজিত সভ্যতার আত্মসংশয়। এখানেই মুসলিম বিশ্বে আধুনিকতার সঙ্কটের গভীরতম সূত্র নিহিত। কারণ কোনো সভ্যতা যখন অন্য একটি আধিপত্যশীল সভ্যতার মুখোমুখি হয়, তখন সে সাধারণত দু’টি মৌলিক প্রশ্নের সম্মুখীন হয় : প্রথমত, ‘আমরা কেন পিছিয়ে পড়লাম?’ এবং দ্বিতীয়ত, ‘আমরা কীভাবে পুনরুত্থান ঘটাব?’ গত কয়েক শতাব্দী ধরে মুসলিম চিন্তার বড় একটি অংশ মূলত এই দুই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই আবর্তিত। কিন্তু সমস্যা হলো, এই অনুসন্ধান প্রায়ই জ্ঞানতাত্ত্বিক ভারসাম্য হারিয়েছে।
মুসলিম পরিচয়কে আধুনিকতার সাথে খাপখাওয়ানোর প্রচেষ্টায় অনেক সময় ইসলামের নিজস্ব জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো, নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অস্তিত্ববোধকে দুর্বল করা হয়। এই ব্যাখ্যায় ইসলাম আর একটি স্বাধীন সভ্যতাগত সত্তা হিসেবে হাজির থাকে না; বরং আধুনিকতার ভাষায় নিজেকে ন্যায্যতা দেয়ার একটি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নেমে আসে।
অন্য দিকে জড় ঐতিহ্যবাদ এখানে আত্মবিশ্লেষণের ক্ষমতা হারায়। জড় ঐতিহ্যবাদ অতীতকে বিশ্লেষণ করতে ভয় পায়; বিচ্ছিন্ন আধুনিকতাবাদ বর্তমানকে প্রশ্ন করতে ভয় পায়। ফলে এক দিকে জন্ম নেয় স্মৃতির কারাগার, অন্য দিকে পরিচয়ের শূন্যতা। একদল অতীতের বন্দী, আরেক দল বর্তমানের বন্দী। অথচ কোনো সভ্যতা বন্দিত্বের মধ্য দিয়ে পুনর্জাগরণ অর্জন করতে পারে না।
এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী তাজদিদ বা নবায়নের ধারণাটি অসাধারণ গুরুত্ব লাভ করে। মুজাদ্দিদ এমন কেউ নন যিনি দ্বীনকে পরিবর্তন করেন; বরং মুজাদ্দিদ দ্বীনের প্রাণশক্তি পুনরুদ্ধার করেন এবং নতুন যুগের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নতুন ভাষায় চিরন্তন সত্য প্রকাশ করেন।
ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস মূলত এই সৃজনশীল নবায়নের ইতিহাস। যথাযথ গ্রহণ-বর্জন, সমালোচনা, পরিশোধন ও পুনর্গঠনের ক্ষমতা ইসলামী সভ্যতার অন্যতম শক্তি।
এই প্রেক্ষাপটে সঙ্কটের সমাধানকে একটি সুসংহত সভ্যতাগত কর্মপরিকল্পনা হিসেবে গ্রহণ করা দরকার। নিম্নে কয়েকটি মৌলিক সমাধানভাবনা হাজির করছি।
১. মুসলিম সমাজকে প্রথমে উপলব্ধি করতে হবে যে, তুরাসের প্রকৃত মূল্য কেবল তার তাবির বা পাঠে সীমিত নয়; বরং সেটি নিহিত তার চিন্তাপদ্ধতি, ইজতিহাদি মনোভাব, সমালোচনামূলক অনুসন্ধান এবং জ্ঞান-উৎপাদনের সক্ষমতায়। পূর্বসূরিদের মতামত মুখস্থ করাটাই উত্তরাধিকার বহনের জন্য যথেষ্ট নয়; বরং তারা কিভাবে চিন্তা করেছেন, কিভাবে বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করেছেন এবং কিভাবে ওহির আলোকে নতুন সমস্যার সমাধান করেছেন, সেই পদ্ধতিগত শক্তিকে পুনরুদ্ধার করাই প্রকৃত উত্তরাধিকার গ্রহণ।
২. মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণের জন্য তিনটি স্তরের সম্পর্ক স্পষ্ট করতে হবে- ক. ওহির চিরন্তন সত্য; খ. আলেমদের ইজতিহাদি ব্যাখ্যা এবং গ. নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রয়োগ। কুরআন ও সুন্নাহ অপরিবর্তনীয়; কিন্তু মানবীয় ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তনশীল হতে পারে। এই বোধ ছাড়া নবায়ন সম্ভব নয় এবং ঐতিহ্যকেও সঠিকভাবে বোঝা যাবে না।
৩. তাজদিদকে ধর্মীয় সংস্কার বা নৈতিক আহ্বানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা, জ্ঞান, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা, প্রযুক্তি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনের একটি সমন্বিত সভ্যতাগত কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নবায়নের অর্থ নতুন আবিষ্কার নয়; বরং নতুন বাস্তবতায় চিরন্তন ইসলামী নীতির কার্যকর রূপ দেয়া।
৪. আধুনিকতাকে অন্ধভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান- উভয় পথই ভুল। আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসনিক দক্ষতা, গবেষণা-পদ্ধতি ও উদ্ভাবনী শক্তিকে আত্তীকরণ করতে হবে; কিন্তু তার অন্তর্নিহিত দর্শন, মূল্যবোধ ও ক্ষমতার কাঠামোকেও সমালোচনামূলকভাবে মোকাবেলা করতে হবে।
৫. শরিয়াহর উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি ছাড়া সমকালীন সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। দ্বীন, জীবন, বুদ্ধি, বংশ, ইজ্জত ও সম্পদের সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও রাজনৈতিক নীতি গড়ে তুলতে হবে।
৬. মুসলিম সমাজের শিক্ষাকাঠামোকে বিভাজন থেকে উদ্ধার করতে হবে। এক দিকে থাকবে ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব, কুরআন, সুন্নাহ, ফিকহ ও সভ্যতাগত ইতিহাসের গভীর অধ্যয়ন; অন্য দিকে থাকবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান ও সমকালীন জ্ঞানের উৎকর্ষ। এই দুই ধারার সমন্বয় ছাড়া স্বাধীন চিন্তাশক্তিসম্পন্ন নেতৃত্ব গড়ে উঠবে না।
৭. সমসাময়িক জটিল প্রশ্নগুলো, যেমন- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি, পরিবেশ, বিশ্বায়ন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বিষয়ে সমষ্টিগত ইজতিহাদের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তিগত মতামতের পরিবর্তে গবেষণাভিত্তিক, আন্তঃবিষয়ক এবং উম্মাহব্যাপী চিন্তাকেন্দ্র প্রয়োজন।
৮. মুসলিম সমাজের সংশ্লিষ্ট অংশকে পরাজিত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আত্মবিশ্বাস অহঙ্কার নয়। আত্মবিশ্বাস হলো নিজের ঐতিহ্য, মূল্যবোধ এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির প্রতি সচেতন আস্থা। মুসলিম উম্মাহকে বুঝতে হবে, তারা কেবল অতীতের উত্তরাধিকারী নয়, ভবিষ্যতের নির্মাতাও।
৯. অনুবাদ, ব্যাখ্যা বা পুনরাবৃত্তি যেমন প্রাসঙ্গিক, তেমনি জরুরি হলো নতুন গবেষণা, নতুন তত্ত্ব, নতুন পদ্ধতি এবং নতুন সভ্যতাগত রূপকল্প নির্মাণ। ইতিহাসে মুসলিম সভ্যতা জ্ঞানের ভোক্তাই নয়, উৎপাদকও ছিল। পুনর্জাগরণের জন্য সেই উৎপাদনক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
১০. মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণ মানে সব ছেড়ে অতীতে চলে যাওয়া নয়, আবার আত্মবিস্মৃত আধুনিকতায় নিমজ্জনও নয়; বরং পুনর্জাগরণের জন্য প্রয়োজন স্বাধীন সভ্যতাগত অবস্থান থেকে বিশ্বকে নতুনভাবে পাঠ ও নির্মাণের ক্ষমতা অর্জন। অতএব, ওহির দিশায় ঐতিহ্য ও ভবিষ্যতের মধ্যে সৃজনশীল সেতুবন্ধন নির্মাণের বিকল্প নেই। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? মুসলিম সমাজের প্রকৃত সঙ্কট তুরাস বনাম আধুনিকতার কোনো একটি নির্বাচনের সওয়াল নয়, সওয়ালটি হচ্ছে একটি স্বাধীন, আত্মসচেতন ও সৃজনশীল সভ্যতাগত অবস্থান কিভাবে নির্মাণ করব? এই সঙ্কটের সমাধান নিহিত আছে এমন এক নবায়িত বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযাত্রায়, যেখানে তুরাস হবে জীবন্ত উত্তরাধিকার, তাজদিদ হবে অব্যাহত সৃজনশীল প্রক্রিয়া, আধুনিকতা হবে সমালোচনামূলক সংলাপের ক্ষেত্র এবং ওহি হবে সমগ্র যাত্রার চূড়ান্ত নৈতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক দিকনির্দেশনা। এর মধ্য দিয়ে মুসলিম উম্মাহ গতিহীন বন্দিত্ব বনাম গতির অন্ধ অনুকরণের সঙ্কট অতিক্রম করে ভবিষ্যতের দিকে আত্মবিশ্বাসের সাথে অগ্রসর হতে পারবে।
লেখক : কবি, গবেষক



