বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত, সেই শিক্ষাটা নেয়া যেতে পারে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা থেকে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজনৈতিক বৈধতা দিতে পারে; কিন্তু শাসনক্ষমতার যোগ্যতা প্রমাণ করে না। জন-আস্থার জন্য দরকার ন্যায়, দক্ষতা, সততা, অন্তর্ভুক্তি ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা। বাংলাদেশের সংবিধান ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, একই সাথে সব ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদা, অধিকার ও বৈষম্যহীনতার অবস্থানও নিয়েছে। তাই ইসলামী রাজনীতির সাংবিধানিক ও সামাজিক ক্ষেত্র আছে।
পাকিস্তান দেখায়, রাষ্ট্র ইসলামী হলেও ইসলামী দল ক্ষমতার মালিক নাও হতে পারে। তুরস্ক দেখায়, ইসলামী রাজনীতি ক্ষমতায় যেতে পারে। কিন্তু অর্থনীতি, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য দুর্বল হলে জনগণ বিকল্প খোঁজে। মিসর দেখায়, নির্বাচন জেতাই যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রযন্ত্র, সংখ্যালঘু, নারী সমাজ, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থাও জরুরি। সৌদি আরব দেখায়, ইসলাম রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস হতে পারে। কিন্তু জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের নিশ্চয়তা দেয় না।
বাংলাদেশের জনগণেরও শিক্ষা আছে। জনগণকে দলীয় আবেগ বা ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, কঠিন প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতে হবে : কে দুর্নীতি কমাবে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন করবে, নারী ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, যুবকদের কাজ দেবে, অর্থনীতি চালাবে, শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক করবে, পুলিশ-প্রশাসনকে দলীয় হাতিয়ার বানাবে না এবং ইসলামের নামে বিভাজন নয়— ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে?
বাংলাদেশে ইসলামী রাজনৈতিক শক্তির প্রথম কাজ হলো ধর্মীয় পরিচয়কে শাসন-যোগ্যতার বিশ্বাসযোগ্যতায় রূপ দেয়া। শুধু ‘আমরা ইসলামী’ বললে হবে না; দেখাতে হবে আমরা সৎ, দক্ষ, আধুনিক, অর্থনীতি বুঝি, প্রশাসন চালাতে পারি, বিশ্বব্যবস্থার সাথে চলতে পারি এবং ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রকে দলের অধীন নয়, আইনের অধীন রাখব।
এ জন্য ইসলামকে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ধর্মীয় কর্তৃত্ব রক্ষার ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। ইসলামকে মানুষের ন্যায়, নিরাপত্তা, রিজিক, মর্যাদা, অধিকার ও জবাবদিহির নৈতিক কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করতে হবে। জনগণের কাছে ইসলাম মানে ভয় নয় আস্থা; নিয়ন্ত্রণ নয় সেবা; বিভাজন নয় ন্যায়; আধিপত্য নয় আমানতদারি।
নবী করিম সা:-এর রাষ্ট্রনৈতিক শিক্ষা ছিল দুর্বলকে রক্ষা, চুক্তিরক্ষা, বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, প্রতিবেশীর অধিকার নিশ্চিত করা এবং শাসনকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিমূলক আমানত হিসেবে দেখা। তাই বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে— এটি জনগণকে ধর্মীয় আনুগত্যে বাধ্য করতে চায়, নাকি জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে চায়।
দ্বিতীয় কাজ হলো মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় ইতিহাসের প্রশ্নে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা। ইসলামী রাজনৈতিক শক্তির কাজ হলো মুক্তিযুদ্ধ, ইসলামী নৈতিকতা এবং বাংলার সংস্কৃতি-ঐতিহ্যকে মুখোমুখি দাঁড় করানো নয়; এগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য, সহাবস্থান ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রদর্শন নির্মাণ করা।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তাকে নতুন দিক, নতুন রাজনৈতিক দর্শন এবং জনগণ-কেন্দ্রিক রাষ্ট্রদর্শনের নতুন অঙ্গীকারের সামনে দাঁড় করিয়েছে। এটি দেখিয়েছে, জনগণ আর শুধু শাসিত হতে চায় না; তারা ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত মালিক হতে চায়। এই অভ্যুত্থানের মূল শিক্ষা হলো— রাষ্ট্র কোনো দল, গোষ্ঠী বা ক্ষমতাকেন্দ্রের সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের আমানত। তাই বিচার, অধিকার, নিরাপত্তা, সুযোগ ও মর্যাদায় কোনো নাগরিকের প্রতি কোনো কারণ বা অজুহাতে বৈষম্যমূলক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, নেতৃত্ব, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যায্য অংশীদারত্বকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ যেমন জনগণের সার্বভৌমত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, তেমনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সেই সার্বভৌমত্বকে ন্যায়, জবাবদিহি, গণতন্ত্র, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং যুবশক্তির নতুন ভাষায় পুনরায় সামনে এনেছে।
তৃতীয় কাজ হলো ক্যাডার রাজনীতির শক্তি ও ঝুঁকি সম্পর্কে সৎ মূল্যায়ন। মতাদর্শভিত্তিক ক্যাডার রাজনীতির বাস্তব শক্তি আছে : এটি সংগঠনকে শৃঙ্খলা, ত্যাগ, আদর্শিক দৃঢ়তা, দ্রুত সমাবেশক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব দেয়। ইসলামী, মাওবাদী, লেনিনবাদী বা অন্য যেকোনো মতাদর্শভিত্তিক সংগঠনে ক্যাডার কাঠামো আন্দোলনকে টেকসই শক্তি দিতে পারে।
কিন্তু এই শক্তির মধ্যেই বড় ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে। আদর্শিক শৃঙ্খলা অনেকসময় মুক্ত চিন্তা, ভিন্নমত, গণতান্ত্রিক বিতর্ক এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে সঙ্কুচিত করে। ক্যাডার রাজনীতি একক কেন্দ্রীয় নির্দেশভিত্তিক কাঠামোতে পরিণত হলে দলের কেন্দ্রীয় কমান্ডই সত্য, নীতি ও সিদ্ধান্তের একমাত্র উৎস হয়ে দাঁড়ায়; ভিন্নমত তখন গণতান্ত্রিক মতপার্থক্য নয়, আনুগত্যহীনতা বা আদর্শচ্যুতি হিসেবে দেখা হয়।
এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। গণতন্ত্র দাঁড়ায় জনগণের সার্বভৌমত্ব, মতের বহুত্ব, জবাবদিহি, নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং স্বাধীন নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর; আর কঠোর ক্যাডার রাজনীতি দাঁড়ায় আনুগত্য, আদর্শিক একরূপতা ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের ওপর। ফলে দল শক্তিশালী হতে পারে; কিন্তু জনগণ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
ক্যাডারভিত্তিক দল জনগণকে সেবা, শৃঙ্খলা বা দ্রুত সিদ্ধান্তের সুফল দিতে পারে; কিন্তু যদি তার বিনিময়ে জনগণের স্বাধীন মত, রাজনৈতিক পছন্দ, সমালোচনার অধিকার এবং ক্ষমতার ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব সঙ্কুচিত হয়, তাহলে জনগণ নিজেকে ক্ষমতায়িত নয় নিয়ন্ত্রিত মনে করে। সুতরাং ক্যাডার রাজনীতির আসল পরীক্ষা হলো— এটি কি জনগণকে সংগঠিত করে, নাকি জনগণের ওপর দাঁড়িয়ে দলকে শক্তিশালী করে? গণতান্ত্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে হলে ক্যাডার রাজনীতিকে কেন্দ্রীয় আনুগত্যের বদলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুযোগ, নীতি-স্বচ্ছতা, জনজবাবদিহি এবং স্বাধীন সমালোচনার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থ কাজ হলো নারী ও যুব সমাজকে আস্থা দেয়া। বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী এবং রাজনীতির ভবিষ্যৎ তরুণদের হাতে। ইসলামী রাজনীতি যদি নারীকে নিয়ন্ত্রণের বিষয় এবং যুবসমাজকে শুধু মিছিলের শক্তি হিসেবে দেখে, তাহলে সে ভবিষ্যৎ হারাবে। তাই নারী নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা-সহায়তা, প্রযুক্তি, খেলাধুলা, নেতৃত্ব ও সামাজিক মর্যাদায় বাস্তব কর্মসূচি দিতে হবে।
পঞ্চম কাজ সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তাকে ইসলামী ন্যায়ের পরীক্ষায় পরিণত করা। একটি মুসলিমপ্রধান দেশে সংখ্যালঘু নাগরিকের জীবন, সম্পদ, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিরাপদ না হলে ইসলামী রাজনীতির নৈতিক দাবি দুর্বল হয়ে যায়।
ষষ্ঠ কাজ হলো আবেগের বদলে পূর্ণ অর্থনৈতিক নকশা দেয়া। বাংলাদেশের মানুষ এখন মূল্যস্ফীতি, চাকরি, ব্যবসা, কৃষি, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। তাই ইসলামী রাজনৈতিক শক্তিকে শুধু নৈতিক স্লোগান নয়; জাকাত-ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা, সুদমুক্ত অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, ডিজিটাল করব্যবস্থা, দুর্নীতিমুক্ত সরকারি ক্রয়, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব কর্মসূচি দিতে হবে।
সপ্তম কাজ আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বোঝা। বাংলাদেশকে একই সাথে ভারত, চীন, পশ্চিমা বিশ্ব, মুসলিম বিশ্ব, রোহিঙ্গা সঙ্কট, বাণিজ্য, জলবায়ু, সমুদ্রনীতি ও শ্রমবাজার সামলাতে হয়। তাই ইসলামী রাজনৈতিক শক্তি যদি শুধু অভ্যন্তরীণ ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকে, রাষ্ট্র পরিচালনার আস্থা পাবে না; তাকে নীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থের বাস্তব ভাষায় কথা বলতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সঠিক মডেল পাকিস্তানের চাপ-রাজনীতি নয়, তুরস্কের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা নয়, মিসরের নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় ইসলাম নয়, সৌদি আরবের রাজতান্ত্রিক ইসলামও নয়। বাংলাদেশের জন্য দরকার এমন ইসলামী রাজনীতি, যা গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মুক্তিযুদ্ধ-সম্মানিত, সংবিধানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী।
এই রাজনীতির মূল হওয়া উচিত পাঁচটি স্তম্ভ : তাওহিদের নৈতিকতা— ক্ষমতার ওপরে আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বোধ; শূরা ও গণতন্ত্র— জনগণের অংশগ্রহণ, পরামর্শ ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা পরিবর্তন; আদল বা ন্যায়বিচার— বিচার, প্রশাসন, বাজার ও রাষ্ট্রে ন্যায্যতা; আমানতদারি— দুর্নীতিমুক্ত ক্ষমতা, স্বচ্ছ অর্থনীতি ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব; রহমত ও নাগরিক মর্যাদা— নারী, সংখ্যালঘু, দরিদ্র, শ্রমিক, তরুণ ও ভিন্নমতের নিরাপত্তা।
বাংলাদেশের ইসলামী রাজনৈতিক শক্তিকে বুঝতে হবে : মানুষ মুসলিম বলে ইসলামী দলকে ভোট দেবে এই ধারণা ভুল। মানুষ তখনই ভোট দেবে, যখন তারা বিশ্বাস করবে ইসলামী দল ক্ষমতায় গেলে দেশ নিরাপদ, অর্থনীতি স্থিতিশীল, অধিকার সুরক্ষিত, দুর্নীতি কম এবং ভবিষ্যৎ ভালো হবে।
বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ বিচারব্যবস্থার ন্যায়ে, বাজারের দামে, যুবকের চাকরিতে, নারীর নিরাপত্তায়, সংখ্যালঘুর আস্থায়, কৃষকের আয়ে এবং রাষ্ট্রের সততায় নির্ধারিত হবে।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য।



