চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের জন্য যে অপার সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে; নানা কারণে তা অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেকে হতাশা ব্যক্ত করে বলছেন, এমন একটি সুযোগ হাতছাড়া হলে আগামী দিনে দেশের আর্থ-রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত শুধু একটি ঘটনার নাম নয়; সেগুলো হয়ে ওঠে একটি প্রজন্মের চেতনা, একটি জাতির রাজনৈতিক অভিযাত্রার বাঁকবদল। চব্বিশের জুলাই গণ-আন্দোলন তেমনি এক অধ্যায়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন অল্প সময়ের ব্যবধানে রূপ নেয় বৃহত্তর গণ-আন্দোলনে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ দেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা এবং নাগরিক সমাজের আলোচনায় নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য— তরুণদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততায় নতুন মাত্রা। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি নিয়ে তরুণদের এক ধরনের অনীহা বা হতাশার যে ধারণা প্রচলিত ছিল, জুলাই তা ভেঙে দিয়েছে। রাজনীতি যে শুধু দলীয় কর্মসূচি নয়; বরং নাগরিক অধিকার, জবাবদিহি ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নেও গভীরভাবে সম্পর্কিত; কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণিপেশার মানুষ তা নতুন করে উপলব্ধি করতে পারছেন। জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পাওয়া— জবাবদিহির প্রশ্ন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, প্রশাসনিক সংস্কার, নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা শুরু হয়েছে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে। রাষ্ট্র কেমন হবে এবং নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কী হওয়া উচিত— এসব প্রশ্ন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই আন্দোলন সফল করতে অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। প্রায় দেড় হাজার মানুষের প্রাণহানি, ২৫ হাজারের বেশি আহত, অপূরণীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি, এসব ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। তাই জুলাইকে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভাষায় নয়, মানবিক বেদনার ভাষাতেও স্মরণ করতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের মূল্যায়ন নিয়ে গত দুই বছর ধরে রাজনৈতিক আলোচনা জারি আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। কোনো পক্ষ এটিকে গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে দেখবে। কেউ রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের অধ্যায় হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন। কেউবা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আলাপ তুলবেন।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় তর্ক-বিতর্ক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বিতর্ক যখন ইতিহাসকে অস্বীকার করে, ঝামেলা বাধে তখন। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, ইতিহাস আলোচনা যেন রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট না হয়। কারণ, ইতিহাসের পর্যালোচনায় নির্মোহ থাকা অপরিহার্য। যদিও সঠিক ইতিহাস লিখতে সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের ইতিহাস নির্মাণের যে অভিজ্ঞতা তাতে দেখা যায়, যে যার সুবিধামতো ঐতিহাসিক বয়ান দাঁড় করাতে চেয়েছেন। এটি আসলে ইতিহাসের মোড়কে ন্যারেটিভ তৈরি ছাড়া কিছু নয়। চব্বিশের জুলাই নিয়েও এ প্রবণতা অনেকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য পতিত আওয়ামী লীগ জুলাই আন্দোলনের তাৎপর্য অস্বীকার করবেই। কিন্তু জুলাই ধারণকারী রাজনৈতিক দলের কোনো কোনো নেতা-নেত্রী এই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করবেন— এটি বিস্ময়কর।
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এখন পর্যন্ত যে সব ঐতিহাসিক মুহূর্ত হাজির হয়েছে, তার মধ্যে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বা জুলাই আন্দোলন (অনেকে একে বর্ষা বিপ্লবও বলে থাকেন) নিঃসন্দেহে অন্যতম মাইলফলক। কিন্তু বছর দুয়েক যেতে না যেতে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার খুদকুঁড়ো খাওয়া মতলববাজরা জুলাই আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হলেন অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন। তিনি জুলাই নিয়ে ফেসবুকে #জুলাইCDI হ্যাশট্যাগ দিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লিখেন, প্রথমে ভেবেছিলেন এটি শুধু জুলাই মাসের একটি ট্রেন্ড, পরে দেখেছেন সারা বছরই অনেকে এটি ব্যবহার করেন। এরপর তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, মন খারাপ থাকলেও, মন ভালো থাকলেও, আড্ডায় বা রাগের সময়ও নাকি #জুলাইCDI লেখা যায়। পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, ‘আজ যেহেতু পয়লা জুলাই, তাই আমিও লিখলাম #জুলাইCDI’। পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। অবশ্য পড়ে শাওন তার পোস্টটি মুছে দিয়েছেন।
জুলাই নিয়ে শাওনের অন্তর্জালা না হয় বোঝা যায়। কিন্তু সরকারদলীয় সংরক্ষিত মহিলা কোটার সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনির একটি মন্তব্যের মাজেজা বোধের অগম্য। এমপি মনির বক্তব্য এমনকি তার নিজ দলের ছাত্র সংগঠন-ছাত্রদল সভাপতি ‘ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান’ করেছেন।
সম্প্রতি একটি টেলিভিশন টকশোতে অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি জুলাই আন্দোলনে স্নাইপার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, অনেক কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারেন না। কারণ, সেসব বললে অনেকের অস্বস্তি হবে। আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে কারা ছিলেন, তা কেউ জানেন না।
তিনি দাবি করেন, আন্দোলনে অংশ নেয়া ব্যক্তিরা একে অপরকে চিনতেন না। অনেকে বুঝতে পারেননি, তাদের পাশের মানুষটি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। তার ভাষ্য— গুলির কোনো শব্দ শোনা যায়নি; এটি ছিল স্নাইপারের গুলি। এ সময় ফ্যাসিবাদের দোসর সঞ্চালক সোমা ইসলাম জানতে চান, তাহলে এটি কি কোনো পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র ছিল? জবাবে নিলুফার চৌধুরী বলেন, পরিকল্পনা অবশ্যই ছিল। তবে এটি ষড়যন্ত্র ছিল কি না, তা তিনি বলতে পারবেন না। স্মরণযোগ্য, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ধূর্ত শিয়ালের মতো সোমা ইসলাম গা-ঢাকা দিয়েছিলেন। সময়-সুযোগ বুঝে আবার প্রকাশ্যে এসেছেন। আওয়ামী লীগের পক্ষে বয়ান তৈরি করতে সোমাকে সহযোগিতা করলেন নিলুফার চৌধুরী মনি। অথচ তিনি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের একজন সুবিধাভোগী।
ইতিহাসের প্রতিটি বড় আন্দোলনের মতো জুলাইয়ের প্রকৃত মূল্যায়নও সময়ই করবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চব্বিশের জুলাই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দীর্ঘদিন আলোচিত হবে। প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে।
এসব বিবেচনায় নিয়ে আমাদের মনে হয়েছে, সংসদ সদস্য মনি কথা বলতে বেশ পছন্দ করেন। বেশি কথা বলা সবসময় খারাপ না। পরিস্থিতি, সময় ও বিষয় বিবেচনা না করে অতিরিক্ত কথা বললেই বিপদে পড়তে হয়। নিলুফার মনির হয়েছে সেই দশা। বেশি কথা বলতে গিয়ে বেফাঁস কথা বলে ফেলেছেন। এতে নিজের এবং দশের অনিষ্ট হতে পারে, সে চিন্তা তার মাথায় ছিল কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এই খেয়াল করতে না পারাটা কী ইচ্ছাকৃত?
লক্ষণীয়, মনি তার বক্তব্যে আওয়ামী লীগের বয়ান তুলে ধরেছেন হোক তা অনিচ্ছায়। পতিত আওয়ামী লীগ জুলাই আন্দোলনকে বিতর্কিত করতে কয়েক ধরনের বর্ণনা (ন্যারেটিভ) তুলে ধরে। আন্দোলনকে স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থান না বলে ঠাণ্ডামাথার ষড়যন্ত্র, বিদেশী প্রভাব বা সংগঠিত সহিংসতার ফল হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টা করে। জুলাই আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান, চব্বিশের ঘটনাপ্রবাহকে ‘গণ-অভ্যুত্থান’ হিসেবে যে বর্ণনা দেয়া হয়, তা রাজনৈতিকভাবে নির্মিত। দলটি দাবি করে— সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা এবং আইনশৃঙ্খলার ভাঙনের দিকগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। তাদের বিরুদ্ধে আনা বহু অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
জুলাই নিয়ে বিএনপি নেত্রী নিলুফার চৌধুরী মনির ‘ডিজাইন’ প্রসঙ্গ আওয়ামী বয়ানের সমার্থক। অবশ্য বেকায়দায় পড়ে পরে তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্য প্রসঙ্গচ্যুতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু অনেকের স্মরণে আছে, এই নিলুফার মনি অন্য আরেকটি টকশোতে বলেছিলেন, জাকাত নেয়ার চেয়ে চাঁদাবাজি ভালো।
তবে চব্বিশের জুলাই আন্দোলন নিয়ে যে যত কথাই বলুন না কেন, ইতিহাসের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার শিক্ষায়। যদি জুলাই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ আরো শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি অধিক শ্রদ্ধাশীল ও যত্নশীল হয়ে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তাহলে চব্বিশের জুলাই অধ্যায়ের তাৎপর্য আরো গভীরতা পাবে। এটি কেউ মুছে দিতে পারবে না।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



