ভূরাজনৈতিক চক্করে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ এক অদৃশ্য ভূরাজনৈতিক দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছে। ভারত, চীন, রাশিয়া, জাপান ও পশ্চিমা বিশ্ব- সবারই নিজ নিজ কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে এই বদ্বীপকে ঘিরে। এক দিকে পরাশক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বা ‘সফট ব্যালেন্সিং’ বজায় রাখা, অন্য দিকে প্রতিবেশী ভারতের বেআইনি পদক্ষেপ পুশইন ঠেকানো, মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার রক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিশ্ববাজারের জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলা করা- সবগুলো বিষয় একই সুতোয় গাঁথা। এই বহুমুখী ও জটিল ভূরাজনৈতিক চক্কর থেকে দেশকে নিরাপদে বের করে আনতে হলে অত্যন্ত দূরদর্শী, বিচক্ষণ ও আপসহীন কূটনৈতিক কৌশলের কোনো বিকল্প নেই।

একুশ শতকের এই পর্যায়ে এসে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি এক নজিরবিহীন এবং জটিল বাঁক বদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যবস্থা এখন কোনো একক পরাশক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই। বহুমুখী বা মাল্টিপোলার রূপ ধারণ করেছে। এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ এক কঠিন ভূরাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে। পরাশক্তিগুলোর মনোযোগ আকর্ষণের দিকে রয়েছে ঢাকা। চলতি মাসেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এমন কিছু যুগপৎ ঘটনা ঘটছে, যা দেশের ইতিহাসে বিরল। রাশিয়া, চীন, জাপান, ভারত, তুরস্ক থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য- সব ফ্রন্টে একসাথে সামাল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ কিভাবে নিজের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে পরাশক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্য বজায় রাখবে তা মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে।

কূটনৈতিক এই সমীকরণের সবচেয়ে জটিল ও স্পর্শকাতর অধ্যায়টি রচিত হচ্ছে নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সাথে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় সফরটি ছিল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে। এটি ছিল মূলত প্রতিবেশীর সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়ার এবং পারস্পরিক আস্থার ভিতকে আরো মজবুত করার একটি ইতিবাচক বার্তা। সেই সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই সীমান্তে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কনস্যুলার চুক্তিকে সম্পূর্ণ অমান্য করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ জোরপূর্বক বাংলাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করার এক বেআইনি তৎপরতা শুরু করে। এ কারণে সীমান্তে শত শত মানুষ অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন।

বাংলাদেশ এবার আর নীরব দর্শকের ভূমিকায় নেই। আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে ঢাকা ইতোমধ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছে। নয়াদিল্লিকে ডজনখানেক আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই সাথে ২৬টি জেলার সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির টহল ও নজরদারি কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে নয়াদিল্লিতে চলমান বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের শীর্ষ সম্মেলনেও পুশইন আলোচনার টেবিলে রেখেছে। বন্ধুত্বের বার্তার পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষায় ঢাকা সজাগ।

ঢাকা নিজেদের কৌশলগত বিকল্পগুলো খোলা রাখতে পূর্ব দিকের পরাশক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক ঝালিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান রাশিয়া সফর করেছেন। পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য এক বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পের সফল সমাপ্তি, সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় এবং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার নিয়ে মস্কোয় গভীর আলোচনা চলছে। রাশিয়াকে পাশে রাখা মানে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি শক্ত খুঁটি নিশ্চিত করা, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি।

অন্য দিকে এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি চীনের দিকেও বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে ঢাকা। খুব শিগগিরই বেইজিং সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব। তার এই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য হলো চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রস্তুত করা। প্রধানমন্ত্রীর এই বেইজিং সফর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য এক গেমচেঞ্জার হতে পারে। চীনা বিনিয়োগ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং ব্রিকসে (BRICS) বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তিতে চীনের পূর্ণ সমর্থন আদায় করা এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ভারত যখন সীমান্তে চাপ সৃষ্টি করছে, তখন চীনের সাথে এই উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সখ্য ঢাকার জন্য এক বিরাট স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে।

পূর্বমুখী কূটনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্র হিসেবে চীনের দিকে এখন গভীর মনোযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ। চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য বেইজিং সফরকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এই সফরের মধ্য দিয়ে বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার কৌশলগত অংশীদারিত্ব এক নতুন ধাপে প্রবেশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকসে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে চীনের জোরালো সমর্থন আদায় করাও এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বকে এই বার্তাই দিচ্ছে, নিজেদের জাতীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নে ঢাকা যেকোনো একক বলয়ের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। এই ভারসাম্য রক্ষার কূটনীতিই বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

কেবল চীন বা রাশিয়াই নয়, বাংলাদেশ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজেদের কৌশলগত অংশীদারদের বহুমুখী করার নীতি গ্রহণ করেছে। এর একটি বড় প্রমাণ হলো পূর্ব এশিয়ার আরেক প্রযুক্তিগত পরাশক্তি জাপান। দীর্ঘ আলোচনা ও প্রতিযোগিতার পর শেষ পর্যন্ত ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত ও অত্যাধুনিক ‘থার্ড টার্মিনাল’ বা তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার চূড়ান্ত কাজ পেতে যাচ্ছে জাপান। এটি নিছক কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি নয়; বরং এটি একটি গভীর ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। অ্যাভিয়েশন খাতে জাপানের মতো একটি বিশ্বস্ত ও স্বচ্ছ দেশের অন্তর্ভুক্তি যেমন দেশের সেবার মানকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাবে, তেমনি এটি পরোক্ষভাবে এই অঞ্চলে চীনের একচেটিয়া আধিপত্যকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করবে।

এর পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী তুরস্কের সাথেও বাংলাদেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি ঢাকা সফর করে গেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই সফরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ড্রোন প্রযুক্তি, সামরিক হার্ডওয়্যার এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফোরামে, বিশেষ করে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে তুরস্ক নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন দিচ্ছে।

বাংলাদেশ এক অদৃশ্য ভূরাজনৈতিক দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছে। ভারত, চীন, রাশিয়া, জাপান ও পশ্চিমা বিশ্ব- সবারই নিজ নিজ কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে এই বদ্বীপকে ঘিরে। এক দিকে পরাশক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বা ‘সফট ব্যালেন্সিং’ বজায় রাখা, অন্য দিকে প্রতিবেশী ভারতের বেআইনি পদক্ষেপ পুশইন ঠেকানো, মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার রক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিশ্ববাজারের জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলা করা- সবগুলো বিষয় একই সুতোয় গাঁথা। এই বহুমুখী ও জটিল ভূরাজনৈতিক চক্কর থেকে দেশকে নিরাপদে বের করে আনতে হলে অত্যন্ত দূরদর্শী, বিচক্ষণ ও আপসহীন কূটনৈতিক কৌশলের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]