কুরআনের আয়াত দিয়ে কূটনীতি

শোককে শক্তিতে পরিণত করার একটি কথা বেশ প্রচলিত আছে। এর বাস্তবতা কিন্তু সেভাবে দেখা যায় না। আলী খামেনিকে হারানোর যে শোক সেটি যে একটি শক্তি হয়ে ফিরে এসেছে, এই নজিরবিহীন জানাজার অনুষ্ঠান তারই প্রমাণ

দুর্বলতাকে কিভাবে শক্তিতে রূপান্তর করতে হয় ইরান তা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে। পরমাণুু বোমা নেই, উন্নত যুদ্ধবিমান নেই, নেই যুদ্ধজাহাজ, তারপরও যুদ্ধবাজ দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে একসাথে নাকানি-চুবানি খাইয়ে ছেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া এবারের যুদ্ধের প্রতিটি ধাপে ইরান নিজেদের দুর্বল অবস্থানকে বিজয়ের হাতিয়ার বানিয়েছে। হত্যার শিকার তাদের সর্বোচ্চ নেতাকেও কূটনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের কাজে লাগিয়েছে। আলী খামেনির নামাজে জানাজার শোক অনুষ্ঠানে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, তা দিয়ে বৈশ্বিক প্রভাব বাড়িয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে পবিত্র কুরআনের বাণীর কৌশলী ব্যবহার। আমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে কুরআনের ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে পাঠ করে শোনানো হয়। আয়াত নির্বাচনের বিষয়টি ছিল বিস্ময়কর তাৎপর্যপূর্ণ। তিলাওয়াত করে অতিথিদের এমন কথাই শুনিয়েছে, তারা যা বলার— অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও দশকের পর দশক ইরান ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোকে তা বলতে পারেনি।

সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তুরস্ক ও সৌদি আরবের প্রতনিধিদের শোনানো কুরআনের আয়াত। মুসলিম দেশের পরিচয় নিয়ে ইরান যখন জায়নবাদী ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতায় একেবারে কোণঠাসা তখন এসব দেশের অনেক কিছুই করার ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মুসলিম দেশ বিপদের সময় ইরানকে কোনো সাহায্য করেনি। কেউ কেউ সরাসরি শত্রুতা করেছে। কেউ আড়ালে থেকে ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার কাজে আমেরিকা-ইসরাইল অক্ষের সাথে একযোগে কাজ করেছে। ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রগুলো সরাসরি শত্রুতায় লিপ্ত হলেও কিছু বলা যায়নি। জানাজার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে সে কথাগুলোই যেন ইরান বলার সুযোগ নিলো। আয়াত দিয়ে যা বলা হলো, এমন কথা— তা কোনোভাবে সরাসরি বলা যেত না। ইরান যেন তার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অব্যক্ত দুঃখ-বেদনা এর মাধ্যমে প্রকাশ করল। তাদের জানিয়ে দিলো— কোন দায়িত্বটি তারা পালন করেনি। এখন তাদের কি করণীয়।

আলী খামেনির কফিনের সামনে শ্রদ্ধা জানাতে আসা তুরস্কের প্রতিনিধিদের শুনানো হয়েছে সূরা নিসার ৯৫ নম্বর আয়াত। ওই আয়াতে বলা হয়েছে— ‘বিশ্বাসীদের মধ্যে সমান নয়, যারা সম্পদ ও জানপ্রাণ নিয়ে যুদ্ধ করে আর যারা বিনা কারণে (সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও) ঘরে বসে থাকে। ময়দানে যারা যুদ্ধ করেছে তাদের উচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন আল্লাহ।’ তুরস্ক সামরিক শক্তিতে বিশ্বের প্রথম সারির একটি দেশ। সামরিক সক্ষমতা ইউরোপের ব্রিটেন ফ্রান্সের সমান। ন্যাটোর শক্তিশালী সদস্যরাষ্ট্র। দেশটির সমরশিল্প বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি বিশ্বের একেবারে শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অর্থনৈতিকভাবেও তুরস্ক ইউরোপের দেশগুলোর সমপর্যায়ের। কূটনীতি দূতিয়ালি এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতেও তাদের ভালো প্রভাব রয়েছে। এই বিপুল শক্তি ও প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের আক্রান্ত মুসলিমদের সাহায্যে কোনো কাজে আসেনি। নির্যাতিত-নিপীড়িত এবং অস্তিত্ব হারানোর মুখোমুখি সম্প্রদায় তুরস্কের কাছ থেকে সাহায্য পায়নি। তাদের খুব কাছেই গণহত্যা চালিয়ে গাজাকে ইসরাইলিরা এক বিরান ভূমি বানিয়েছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা তারা গ্রহণ করেনি; উপরন্তু তাদের সাথে ইসরাইলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত আছে। ঐতিহ্যবাহী ওসমানি সালতানাতের উত্তরাধিকারী তুরস্ক। গোটা মুসলিম বিশ্বের নেতা ছিল তারা। সূরা নিসার এই আয়াত দিয়ে তুরস্ককে যেন সেই কথাগুলো স্মরণ করিয়ে দিলো ইরান।

মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ইরান-সৌদি আরবের মধ্যে বিরোধ। পরিস্থিতি অনেক সময় এতটাই অবনতি হয়েছে, শত্রুতায় গড়িয়েছে। ইরান যখন তার অস্তিত্ব রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টায় লিপ্ত, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সৌদি আরবের বন্ধুত্ব হয়েছে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে— দেশটির সামরিক প্রস্তুতি ইরানকে সামনে রেখে সাজানো। ইরানকে কোণঠাসা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সমর্থন নিয়েছে। শোক অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছে সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ এল খেরেজির নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল। তাদের প্রতিনিধির সামনে আবৃত্তি করা হয়েছে সূরা আল ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত। তাতে বলা হয়েছে— ‘নিঃসন্দেহে তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে যুদ্ধরত বিবদমান দুটো দলের মধ্যে। একদল যুদ্ধ করছে আল্লাহর পথে, অপর দলটি কাফের...। আর আল্লাহ শক্তিশালী করেন তার সাহায্য দিয়ে যাকে (যে দলকে) তিনি চান। অবশ্যই এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য।’ এবারের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বাসী পক্ষটি হচ্ছে ইরান। তারা জয় পেয়েছে। এ আয়াতটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী দেশটির বিবেচনাবোধ জাগাতে চেয়েছে। বিশ্বাসী ও কাফের বিবদমান দুই দলের মধ্যে যুদ্ধের সময় কোন দলের দিকে সমর্থন থাকা উচিত সেই বার্তা এখানে পরিষ্কার।

আফগানিস্তানের সাথে ইরানের কিছু মিল রয়েছে। যুদ্ধে উভয় দেশ বিভিন্ন মাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজয়ের স্বাদ দিয়েছে। তাদের প্রতিনিধিদলকে শোনানো হয় সূরা ফাতাহ-এর প্রথম থেকে। যেখানে বলা হয়েছে— ‘অবশ্যই আমরা আপনাকে এক সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।’ একটানা ২০ বছর আফগানিস্তানের ওপর এক অন্যায্য যুদ্ধ চাপিয়ে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। শেষ পর্যন্ত কোনোরকমে পাততাড়ি গুটিয়ে সেখান থেকে তারা সরে আসে। আফগানিস্তানকে যেই তালেবান মুক্ত করার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ, হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছিল সেই তালেবান তাদের তাড়িয়ে তার সরে আসার পর দেশটির ক্ষমতা গ্রহণ করে।

কুরআনের আয়াত নির্বাচনে ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাবনা ছিল নিপুণ। আগত শত শত অতিথির সামনে যেই আয়াত তারা শুনিয়েছে তা সংশ্লিষ্টদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ও গভীর অর্থবহ। বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা বিপুল রক্ত ঝরিয়ে দেশ থেকে এক ফ্যাসিস্টকে তাড়িয়েছে, সেটিও তাদের নজর এড়ায়নি। বাংলাদেশ থেকে আগত জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিনিধিদলটিকে শুনানো হয় শহীদদের নিয়ে সূরা আল ইমরানের অসাধারণ সেই ১৬৯-৭০ আয়াত। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ যোদ্ধা, ইয়েমেনের হুতিসহ পুরো অঞ্চলে অধিকারহীন নিপীড়িতদের পক্ষে ইরান তার সামান্য সামর্থ্য নিয়ে লড়াই করছে। তাদের এই সহযোদ্ধাদের প্রতি কুরআন থেকে বাছাই করে সেই প্রেরণাদায়ক আয়াতগুলো বাছাই করে একে একে শোনানো হয়েছে।

শোককে শক্তিতে পরিণত করার একটি কথা বেশ প্রচলিত আছে। এর বাস্তবতা কিন্তু সেভাবে দেখা যায় না। আলী খামেনিকে হারানোর যে শোক সেটি যে একটি শক্তি হয়ে ফিরে এসেছে, এই নজিরবিহীন জানাজার অনুষ্ঠান তারই প্রমাণ। ইরানের শক্তির উৎস নিয়েও বিভিন্ন আলাপ আছে। কেউ বলছে দেশটির মোজাইক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কেউ বলছে হরমুজ, আর কেউ বলছে অনমনীয় নেতৃত্ব— আরো অনেক কিছু। কিন্তু তাদের মূল শক্তিটি যে বিশ্বাসের সেটিই প্রমাণ হলো। তারা কুরআনকে এমন এক সময় নিজেদের চালিকা হিসেবে সামনে রেখেছে, যখন মুসলিমদের মধ্যে কুরআনের কার্যকর কোনো ব্যবহার নেই। কুরআনকে সর্বোচ্চ মূল্য দেয়ার ফলে ইরানিদের জয় ত্বরান্বিত হচ্ছে— বিষয়টি এখন পরিষ্কার।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]