একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্যতম শর্ত হলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেয়া। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং সেবাপ্রাপ্তির বৈষম্যের মতো সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসাসেবার প্রধান কেন্দ্র হলেও নানা সঙ্কটের কারণে তাদের সক্ষমতা প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। এর ফলে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজনেও অনেক মানুষকে দূরবর্তী জেলা বা বিভাগীয় শহরের হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ—দেশের প্রায় ৪৯২টি ৫০ শয্যার উপজেলা হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা—স্বাস্থ্যখাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; বরং গ্রামীণ পর্যায়ে চিকিৎসা সেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা অন্তর্ভুক্তি এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ। এছাড়া পাঁচটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার শিশু বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করার কাজ ছয় মাসের মধ্যে উদ্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে পাঁচটি বড় শহরে নারীদের জন্য ১,০০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ কি এই পরিবর্তনের জন্য বাস্তবিকভাবে প্রস্তুত? শুধুমাত্র অবকাঠামো সম্প্রসারণ কি দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য সঙ্কট সমাধান করতে সক্ষম, নাকি এটি কাঠামোগত দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে? উল্লেখ্য, স্বাস্থ্যখাতকে কেবল চিকিৎসা কাঠামো হিসেবে নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমন্বিত রূপ হিসেবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো গ্রামীণ জনগণের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। নীতিগতভাবে প্রতিটি উপজেলায় ৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান বহু সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৯২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যা থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে শয্যা সংখ্যা ও রোগীর চাপের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য বিদ্যমান। অনেক হাসপাতালে এক শয্যায় একাধিক রোগীকে চিকিৎসা নিতে হয়, যা স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। চিকিৎসক সঙ্কট এই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সমস্যা। অনুমোদিত পদ থাকলেও বাস্তবে অনেক হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক উপস্থিত থাকেন না। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব অত্যন্ত প্রকট। ফলে জটিল রোগীদের প্রায়ই জেলা বা বিভাগীয় হাসপাতালে রেফার করা হয়। একই সঙ্গে নার্স, টেকনোলজিস্ট এবং সহায়ক কর্মীর ঘাটতি সেবার মানকে আরো দুর্বল করে।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। অনেক হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি নেই, আবার যেগুলো রয়েছে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ দুর্বল। আইসিইউ, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা অধিকাংশ উপজেলায় কার্যত অনুপস্থিত। ফলে উপজেলা হাসপাতালগুলো কার্যকর দ্বিতীয় স্তরের চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে কেবল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্কট কেবল অবকাঠামোগত নয়; এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং প্রশাসনিক কারণের সমন্বিত ফলাফল। সবচেয়ে বড় সঙ্কট হলো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি। অনেক উপজেলায় সার্জন, গাইনি, শিশু বিশেষজ্ঞ বা অ্যানেসথেসিওলজিস্ট নিয়মিতভাবে পাওয়া যায় না। ফলে মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হয়।
এই ঘাটতির কারণে রোগীদের বড় অংশকে জেলা বা শহরে যেতে হয়, যা তাদের জন্য ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য। পরিবহন, চিকিৎসা এবং সময়—সব মিলিয়ে এটি দরিদ্র পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে, যা দারিদ্র্যের চক্রকে আরও গভীর করে। সরকারি হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ দীর্ঘ অপেক্ষা, সীমিত সময়ের চিকিৎসা এবং মনোযোগের অভাব তৈরি করছে, যা ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। এই শূন্যতা পূরণে বেসরকারি হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের উচ্চ ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ফি আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। ফলে অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হন, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে। এতে দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যায় এবং অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধির পেছনে চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সামাজিক আচরণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং পরিবেশগত কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতার কারণে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি দ্রুত বাড়ছে অসংক্রামক রোগ—যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতা। এর একটি বড় কারণ হলো খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্ট ফুড এবং উচ্চ চর্বি ও চিনিযুক্ত খাদ্যের ব্যবহার বেড়েছে।
একই সঙ্গে ভেজাল ও রাসায়নিকযুক্ত খাদ্য এবং কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাবে পুষ্টিহীনতা ও স্থূলতা—দুই বিপরীত সমস্যা একসঙ্গে বাড়ছে। পরিবেশ দূষণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শহরে বায়ুদূষণ এবং গ্রামে নিরাপদ পানির অভাব, আর্সেনিক ও দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও কিডনি সমস্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমাগত জটিল হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার পরিবর্তন রোগ বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে। শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, দীর্ঘসময় বসে থাকা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক চাপ মানসিক স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা পরোক্ষভাবে শারীরিক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য সচেতনতার ঘাটতি এখনো একটি বড় সমস্যা। অনেক মানুষ প্রাথমিক লক্ষণকে গুরুত্ব না দিয়ে দেরিতে চিকিৎসা নেন, ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে এবং চিকিৎসা আরও ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে এই সামাজিক ও জীবনযাত্রাগত কারণগুলো বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং রোগের প্রকৃতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো অপর্যাপ্ত অর্থনৈতিক বরাদ্দ। স্বাস্থ্যসেবা একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল খাত হলেও এখানে বরাদ্দ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের কাছাকাছি, যা দক্ষিণ এশিয়া এমনকি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায়ও অনেক নিচে। তুলনামূলকভাবে উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ এবং উন্নত দেশগুলোতে ৬ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করা হয়। এই পার্থক্য শুধু সংখ্যাগত নয়; এটি সরাসরি স্বাস্থ্যসেবার মান, অবকাঠামো, চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং জনবল সক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এই সীমিত বাজেটের কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। ফলে অবকাঠামো থাকলেও কার্যকর সেবা প্রদানের সক্ষমতা সীমিত থেকে যায়। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে এই সমস্যা আরো প্রকট। নতুন ভবন বা শয্যা বৃদ্ধি করা হলেও নিয়মিত পরিচালনা ব্যয়, ওষুধ সরবরাহ, ল্যাব সুবিধা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন প্রায়ই পর্যাপ্ত থাকে না। এর ফলে অনেক প্রকল্প শুরু হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে পারে না।
৪৯২টি উপজেলা হাসপাতালকে একযোগে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য প্রয়োজন বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। অর্থনৈতিক সক্ষমতার এই ঘাটতি উপজেলা হাসপাতাল ১০০ শয্যায় উন্নীত করার মতো বৃহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। কারণ এই ধরনের প্রকল্প কেবল নির্মাণ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। নতুন শয্যা চালু করার জন্য অতিরিক্ত ডাক্তার, নার্স, টেকনোলজিস্ট, ওষুধ সরবরাহ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন, যা ধারাবাহিক অর্থায়ন ছাড়া সম্ভব নয়।
এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়ের কাঠামোও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাজেটের বড় অংশ যদি শুধু অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হয় কিন্তু মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সেবার মান বৃদ্ধিতে যথেষ্ট বরাদ্দ না থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, হাসপাতাল নির্মিত হলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় তা পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্যব্যয়ের ওপর জনগণের ব্যক্তিগত খরচের চাপ। সরকারি বরাদ্দ সীমিত থাকায় বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই রোগীদের নিজস্ব অর্থে বহন করতে হয়। ফলে বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৬০–৭০ শতাংশের মতোই জনগণ সরাসরি বহন করে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। তুলনামূলকভাবে উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে করভিত্তিক বা বীমাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে ব্যক্তিগত ব্যয় সাধারণত ১০–৩০ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকে। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম ব্যক্তিগত ব্যয়ের মাধ্যমে উন্নত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারলেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে এই চাপ বেশি। ভারতের ক্ষেত্রেও বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যক্তিগত ব্যয়ের বোঝা উল্লেখযোগ্য।
শুধু ভবন সম্প্রসারণ করলেই স্বাস্থ্যসেবা উন্নত হবে না, যদি সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসক আকৃষ্ট করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপত্তা, আবাসন, প্রণোদনা এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ না থাকলে জনবল সঙ্কট থেকেই যাবে।
যেকোনো বৃহৎ স্বাস্থ্য সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বহু প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সমন্বয়ের অভাব একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীর হয়ে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় দ্রুত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে দুর্নীতি ও অনিয়ম যুক্ত হলে প্রকল্পের কার্যকারিতা আরও কমে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সাধারণভাবে প্রতি ১০,০০০ জনে অন্তত ১০ জন চিকিৎসক এবং প্রতি ১,০০০ জনে প্রায় ৩টি হাসপাতাল শয্যার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে। এই মানদণ্ডের তুলনায় বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলঙ্কা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ভারতের স্বাস্থ্য অবকাঠামো বিস্তৃত হলেও আঞ্চলিক বৈষম্য রয়েছে। পাকিস্তানও একই ধরনের সমস্যায় ভুগছে। অন্যদিকে জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও জাপানের মতো উন্নত দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু চিকিৎসা নির্ভর নয়; বরং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর জোর দেয়া হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে রোগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।
উপজেলা হাসপাতাল ১০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ সফল হলে এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। প্রথমত, গ্রামীণ জনগণের জন্য চিকিৎসা সহজলভ্য হবে এবং শহরের ওপর চাপ কমবে। দ্বিতীয়ত, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। তৃতীয়ত, এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-3) অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ পাবে কেবল তখনই, যখন অবকাঠামোর পাশাপাশি মানবসম্পদ, প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করা হবে।
পরিশেষে বলতে হয়, উপজেলা হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এটি কেবল অবকাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের মূল সমস্যা কেবল শয্যা বা ভবন নয়; এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থাগত সঙ্কট, যেখানে অর্থনীতি, প্রশাসন, মানবসম্পদ এবং নীতি একসঙ্গে কাজ করে। অতএব, এই উদ্যোগ যদি একটি বৃহত্তর স্বাস্থ্য সংস্কারের অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট



