হরমুজ সঙ্কট ও বাংলাদেশ

হরমুজ প্রণালী এখন পুরোপুরি বন্ধ নয়, আবার পুরোপুরি উন্মুক্তও নয়— এক ধরনের স্থবিরতায় আটকে আছে। ইরান একে কৌশলগত চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ইরানের নতুন নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল কার্যকর হলে শিপিং কোম্পানিগুলোকে আরো সতর্ক করে তুলবে এবং তেলের দাম আরো বাড়তে পারে। কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া এই সঙ্কট শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যস্থতা এবং আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশসহ নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য বিকল্প সরবরাহ রুট ও জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ এখন জরুরি প্রয়োজন। হরমুজ প্রণালীর এই চলমান সঙ্কট শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে

হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল বন্ধ থাকার বিষয়টি বিশ্ব অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতির অন্যতম প্রধান সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত নৌপথে অচলাবস্থা চলছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়ে বহন করা হয়। এই সঙ্কট আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। মার্কিন নৌবাহিনী একদিকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে; অন্যদিকে ইরান এই প্রণালীতে মার্কিন ও পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাঙ্কার এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী ইরান ওমানের সাথে মিলে হরমুজ প্রণালীর বাইরে একটি নতুন ‘নিয়ন্ত্রিত ও নিষিদ্ধ সামুদ্রিক অঞ্চল’ এবং বিকল্প নিরাপদ আন্তর্জাতিক শিপিং করিডোর চালুর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ সীমা থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত এই অঞ্চল বিস্তৃত হবে এবং অনুমতি ছাড়া বা মার্কিন ব্লকেড সমর্থনকারী কোনো জাহাজ এই অঞ্চলে প্রবেশ করলে তেহরান সেগুলোকে বৈরী হিসেবে বিবেচনা করবে। এদিকে সঙ্কট এতটাই তীব্র যে, হরমুজ প্রণালীর চারপাশে আট শতাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়ে আছে এবং আন্তর্জাতিক অনেক শিপিং জায়ান্ট এই রুটে কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে। কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে না চাইলেও, পাল্টাপাল্টি আক্রমণ ও নতুন সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের এই সিদ্ধান্ত হরমুজ সঙ্কটকে আরো দীর্ঘস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্র পথ। এই সরু নৌপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (দিনে প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল) পরিবাহিত হতো। প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ অতিক্রম করত। সেখানে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ। সাম্প্রতিক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান মার্কিন যুদ্ধজাহাজের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং আরো জাহাজে হামলার দাবি করে। ফলে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত সীমিত। কেপলারসহ শিপিং ডেটা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে দৈনিক গড়ে মাত্র ১০টি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালী অতিক্রম করেছে— যা মে মাসের পর সর্বনিম্ন। যুদ্ধ-পূর্ব দৈনিক ১৩০টির বেশি জাহাজের তুলনায় এটি নাটকীয় হ্রাস। যদিও মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট দাবি করেছেন যে, সব মিলিয়ে প্রাক-সঙ্ঘাতকালীন সরবরাহের দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি এখনো প্রবাহিত হচ্ছে (দিনে ৯ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি)। তবে বাস্তবতা পুরোই ভিন্ন।

বাংলাদেশের ওপর প্রভাব
হরমুজ প্রণালী সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে বহুমুখী এবং মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত ছয় মাসের (ফেব্রুয়ারি-আগস্ট ২০২৬) সঙ্ঘাত ও অচলাবস্থার জেরে বাংলাদেশের সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতি ২৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও রেমিট্যান্সের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দেশটিকে বড় ধরনের আর্থিক মাশুল গুনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির বেশির ভাগ সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করে, যা হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালীটি অবরুদ্ধ থাকায় বিকল্প পথে তেল আনতে গিয়ে গত মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারের অতিরিক্ত চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬-৯৭ ডলারে উঠে যাওয়ায় দেশীয় বাজারে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত সচল রাখতে সরকারকে কয়েক হাজার কোটি টাকার বাড়তি ভর্তুকির বোঝা টানতে হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে এলএনজি আসতে না পারায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাস সঙ্কটে ভুগছে।

গ্যাস ও জ্বালানি সঙ্কটের কারণে দেশজুড়ে লোডশেডিং বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে তৈরী পোশাক খাত এবং ভারী শিল্পকারখানার উৎপাদনে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপগামী সমুদ্রপথের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বব্যাপী ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম ও ফ্রেইট চার্জ ৩০০ থেকে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। চট্টগ্রাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যে দেড় হাজার ডলারের কনটেইনার ভাড়া বেড়ে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ডলারে ঠেকেছে। ফলে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালী মূলত বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সার সরবরাহের প্রধান রুট। এই সঙ্কটের কারণে প্রতি টন ইউরিয়া সারের আন্তর্জাতিক দাম ৪০০ ডলার থেকে এক লাফে ৮৫০ ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ফলে দেশের কৃষি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার এবং খাদ্যপণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতি ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান ও কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৬-৫১ শতাংশ আসে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কায় এই বিশাল শ্রমবাজার এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

জ্বালানি সঙ্কটের সমাধান
হরমুজ প্রণালী সঙ্কট ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কট তীব্র হয়েছে। দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট; কিন্তু সরবরাহ প্রায় দুই হাজার ১০০ থেকে দুই হাজার ৭০০-তে নেমে এসেছে। এর ফলে লোডশেডিং, শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া এবং উচ্চ আমদানি ব্যয় দেখা দিয়েছে। সরকার ও বিশেষজ্ঞরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী সমাধানের পথ দেখিয়েছেন। যেমন কাতারের চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ অর্ধেক হয়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কেনা। গ্যাসচালিত প্ল্যান্টের পরিবর্তে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্পের জন্য গ্যাস মুক্ত করা। এতে প্রায় ৫০০-৬০০ এমএমসিএফডি গ্যাস বাঁচানো সম্ভব। সিএনজি স্টেশনগুলোতে নির্ধারিত সময়সূচি, জ্বালানি রেশনিং এবং অদক্ষ প্ল্যান্ট বন্ধ রাখা। ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০টি সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রায় ১৪০ এমএমসিএফডি যোগ করেছে। ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো সঙ্কট সমাধানে কমপক্ষে দুই বছর লাগবে। শুধু এলএনজি আমদানি বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এটি বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়ায়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিক বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন করতে পারবে।

হরমুজ প্রণালী এখন পুরোপুরি বন্ধ নয়, আবার পুরোপুরি উন্মুক্তও নয়— এক ধরনের স্থবিরতায় আটকে আছে। ইরান একে কৌশলগত চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ইরানের নতুন নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল কার্যকর হলে শিপিং কোম্পানিগুলোকে আরো সতর্ক করে তুলবে এবং তেলের দাম আরো বাড়তে পারে।

কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া এই সঙ্কট শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যস্থতা এবং আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশসহ নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য বিকল্প সরবরাহ রুট ও জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ এখন জরুরি প্রয়োজন। হরমুজ প্রণালীর এই চলমান সঙ্কট শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার