দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসকগোষ্ঠীর ঔদ্ধত্য এবং তার বিপরীতে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে চব্বিশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান, তার পরবর্তী রূপান্তরকালীন অস্থির সময় এবং ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে যে নতুন শাসনতান্ত্রিক বাস্তবতার উদ্ভব হয়েছে, তা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় জটিল, সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ। আজ রাষ্ট্রক্ষমতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি; কিন্তু ক্ষমতার এই নতুন বিন্যাসের সমান্তরালে দেশের রাজনীতি, প্রশাসন এবং সীমান্ত ঘিরে এক বহুমাত্রিক ক্রান্তিকালীন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এক দিকে পতিত স্বৈরাচারী শক্তির উঁকিঝুঁকি, অন্য দিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বৈরী আচরণ এবং সীমান্তে জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টাÑ সবমিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এক গভীর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরীক্ষার মুখোমুখি।
দৈনিক আমার দেশ ও নয়া দিগন্তের পাতায় বিগত দেড় দশক ধরে যে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ব্যবচ্ছেদ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, আজ নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার যুগেও সেই অপশক্তির পুনর্বাসনের মরিয়া তৎপরতা এবং একই সাথে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের নগ্ন থাবা কিভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে, তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
গত কয়েক সপ্তাহে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি অত্যন্ত কৌশলী প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। নোয়াখালী, কুমিল্লা, শরীয়তপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম কিংবা দাউদকান্দির মতো বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ করেই জনমানবহীন ভোরের আলোয় কিংবা সন্ধ্যার অন্ধকারে হঠাৎ কিছু মানুষ জড়ো হচ্ছে। নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ কিংবা সাবেক সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের ব্যানারে পরিচালিত এই ‘ঝটিকা মিছিল’গুলোর প্রধান অনুষঙ্গ কোনো গণদাবি নয়। স্লোগান দেয়া হচ্ছে, কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই দ্রুত সরে পড়ছে। একে বলা যায়, দৃশ্যমান থাকার রাজনীতি। সামাজিক মাধ্যমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মনস্তাত্ত্বিক খেলা।
আওয়ামী লীগ খুব ভালো করেই উপলব্ধি করে যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতিও অবশিষ্ট নেই। এই ঝটিকা মিছিলগুলো মূলত হতাশ ও দিকভ্রান্ত কর্মীদের মানসিক সান্ত্বনা দেয়ার কৌশল, পাশাপাশি দেশের বর্তমান প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা। কিন্তু বাস্তবতার জমিন অনেক কঠিন। জনসমর্থনহীন এই ভার্চুয়াল বীরত্ব দিয়ে গণমানুষের অর্জিত নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা নস্যাৎ করা সম্ভব নয়।
পতিত স্বৈরাচারী শক্তি অন্ধ। তারা মনে করে অপপ্রচার, ভয় এবং বিভ্রান্তির সংস্কৃতি দিয়ে মানুষের স্মৃতি মুছে ফেলা যায়; কিন্তু মানুষ আজ আর এত সরল নয়। দীর্ঘ দেড় দশকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গোপন বন্দিশালার বিভীষিকা, ব্যাংক লুটপাট, উন্নয়নের নামে নজিরবিহীন দুর্নীতি এবং চব্বিশের জুলাই-আগস্টে শত শত তরুণের বুকে গুলি চালানোর রক্তাক্ত ইতিহাস জনগণ ভুলে যায়নি। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর কিংবা দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয়ে যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং ছিল দীর্ঘদিনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ।
মানুষ এখন ভোট, ভাতের অধিকার এবং সর্বোপরি একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মর্যাদাপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চায়। যে রাজনৈতিক শক্তি নিজের নাগরিকদের ওপর দমন-পীড়ন চালায় তাদের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানো এত সহজ নয়।
বর্তমান যুগে তথ্যযুদ্ধ রাজনীতির অন্যতম প্রধান অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। অতীতে বেতনভুক অনলাইন কর্মী কিংবা নিয়ন্ত্রিত প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করে যেভাবে জনমতকে নিজেদের অনুকূলে নেয়া হতো, এখন আর তা অত সহজ নয়। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন তথ্য যাচাই করতে শিখেছে। আওয়ামী লীগের অনলাইন শাখা কিংবা তাদের বিদেশভিত্তিক প্রচারকরা বিভিন্ন সময়ে কৃত্রিম সঙ্কট বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করলেও দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও তরুণ প্রজন্ম তার উপযুক্ত জবাব দিচ্ছে। গুজব ছড়িয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বদলে দেয়ার সময় শেষ। ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম ঝড় আর বাস্তবতার ঝড় এক নয়, এই সত্য যত দ্রুত তারা উপলব্ধি করবে, ততই তাদের জন্য মঙ্গল।
সামনে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনকে ঘিরে নতুন হিসাব-নিকাশও তৃণমূল রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। কেন্দ্রীয়ভাবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ কিংবা কোণঠাসা হলেও তাদের একটি অংশ মনে করছে, স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত প্রভাব, পারিবারিক নেটওয়ার্ক এবং অর্থবিত্ত ব্যবহার করে তারা আবার প্রভাব বিস্তার করতে পারবে; কিন্তু রাজনীতিতে বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনআস্থা হারিয়ে গেলে শুধু অর্থ কিংবা পেশিশক্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে টেকা যায় না। তৃণমূলের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা দেখছে, বিপদের দিনে কারা পাশে ছিল এবং কারা লুটপাট ও দমন-পীড়নের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ফলে স্থানীয় নির্বাচনের সমীকরণও স্বৈরাচারের পক্ষে যাবে না, যদি প্রশাসন নিরপেক্ষ ও দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখতে পারে।
অভ্যন্তরীণ এই টানাপড়েনের সাথে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনীতি ও সীমান্ত সঙ্কট। দেশের অভ্যন্তরে পতিত শক্তির ভার্চুয়াল তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠিক তখনই সীমান্তে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা এখন আর গোপন বিষয় নয়। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই প্রবণতা আরো বেড়েছে। বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে বহু সীমান্তে এই পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করেছে এবং সরকারও কৌশলগতভাবে এর কঠোর জবাব দিচ্ছে।
কিন্তু এখানে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এই অনুপ্রবেশ চেষ্টার সময়জ্ঞান। বাংলাদেশের যেকোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দিল্লির সাউথ ব্লকে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। তারা বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে অভ্যস্ত। ১৫ বছর ধরে নির্দিষ্ট দলের স্বৈরাচারী শাসনকে অন্ধ সমর্থন দেয়ার পর, যখন সেই তাসের ঘর ভেঙে পড়েছে এবং বাংলাদেশ নতুন গণতান্ত্রিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, তখন থেকেই এ দেশের নতুন ব্যবস্থাকে ব্যর্থ কিংবা অস্থিতিশীল প্রমাণের একটি সুগভীর আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক চক্রান্ত দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
সীমান্তে এই পুশইনের চেষ্টা মূলত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক সক্ষমতার ওপর একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ। এক দিকে বিএসএফের গুলিতে নিরীহ বাংলাদেশী নাগরিক প্রাণ হারাচ্ছে, অন্য দিকে সীমান্ত অস্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে। এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
তবে বিগত শাসনামলের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে বর্তমান সরকারের অবস্থান অনেক বেশি স্পষ্ট ও দৃঢ়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় নীতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন অবস্থান ঘোষণা করেছেন। নীতিনির্ধারণী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, সীমান্তে কোনো ধরনের আগ্রাসন কিংবা একতরফা আচরণ মেনে নেয়া হবে না।
একই সাথে কূটনৈতিক টেবিলেও বাংলাদেশ এখন আর নীরব থাকার নীতিতে বিশ্বাসী নয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এই ইস্যুতে ভারতের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক পত্রবিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের তীব্র আপত্তির কথা দিল্লিকে অবহিত করেছেন। চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও আইনগত যাচাই ছাড়া সীমান্তে কোনো মানুষকে একতরফাভাবে ঠেলে দেয়া যাবে না। শামা ওবায়েদ বলেছেন, ‘ভারত আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী; কিন্তু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখতে হবে।’
বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে জনমনে সংশয় না থাকলেও প্রশাসনের ভেতরে এখনো বিগত স্বৈরাচারী ব্যবস্থার কিছু গভীর শিকড় রয়ে গেছে, যা অস্বীকারের সুযোগ নেই। নিষিদ্ধ সংগঠনের ব্যানারে প্রকাশ্য মিছিলের ঘটনায় যখন আইনশৃঙ্খলাবাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয় না, তখন সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করছিল? কেন আগাম তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হলো না?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে অগ্নিপরীক্ষা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে নোয়াখালীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে।
সরকারকে দ্রুত প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরে সক্রিয় বিদ্বেষী উপাদান কিংবা গোপন চক্র চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেই রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার সম্পন্ন হয় না; বরং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক বিকৃতি দূর করতে সময়, দক্ষতা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে মনে রাখতে হবে, শুধু শক্তি প্রয়োগ কিংবা পুলিশ-বিজিবি দিয়ে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক স্বস্তি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বোপরি সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। প্রশাসন যদি নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি বজায় রাখতে পারে, তবে উসকানিমূলক রাজনীতি এবং চোরাগোপ্তা ষড়যন্ত্রের পথ এমনিতেই সঙ্কুচিত হয়ে আসবে।
ভয়ের রাজত্ব অতিক্রম করে আমরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, সেই পথ নিঃসন্দেহে দীর্ঘ, কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ; কিন্তু প্রতিহিংসা নয় জবাবদিহি; বিভাজন নয় জাতীয় স্বার্থ; ক্ষমতার দম্ভ নয় গণমানুষের অধিকার; এটাই হোক আমাদের ভবিষ্যৎ পথচলার মূলমন্ত্র।
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



