স্বাস্থ্য খাতে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা

স্বাস্থ্য খাতের সঙ্কটের কারণ শুধু অর্থের অভাব নয়, সবচেয়ে বেশি দায়ী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। উদাহরণ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার অতি কেন্দ্রীয়করণ। এর ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা জেলা হাসপাতালসহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পর্যায়ে কোনো যন্ত্রপাতির ক্রটি চিহ্নিত হলে তার তাৎক্ষণিক স্থানিক সমাধান সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতাসহ বাজেট বরাদ্দ ও নানামুখী সমস্যার কারণে এগুলো মেরামতের অনুমোদন পেতে অনেক সময় পেরিয়ে যায়। তখন আর মেরামতেও কাজ হয় না। যথাযথ জনবল ছাড়া সেবাধর্মী যন্ত্রপাতি ক্রয় দুর্বল ব্যবস্থাপনার আরেকটি দিক। মোটকথা, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত করছে। এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ তদারকি ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয় একান্ত জরুরি।

বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাধিকার তালিকায় রেখেছে। যার বহিঃপ্রকাশ গত ৩ জুন স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের পরিপত্র। অন্যদিকে, সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ১০০ বা ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য মহাপরিচালক। এটি বাস্তবায়িত হলে সাধারণ জনগণের ভোগান্তি কমবে। সময় ও অর্থের সাশ্রয় হবে। সরকারের এই জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সম্প্রতি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণার তথ্য দৈনিক প্রথম আলোর ৩০ জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুরবস্থা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় গবেষণায় তা খতিয়ে দেখা হয়। রেডিও ইমেজিংয়ের সুবিধা জেলা হাসপাতালগুলোতে ৮৫ শতাংশ প্রাপ্যতা থাকলেও বছরব্যাপী সেবা পাওয়া গেছে মাত্র ৩৩ শতাংশ হাসপাতালে। জেলা-উপজেলা ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মিলিয়ে মোট ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত জরিপে দেখা গেছে, বিভিন্ন রোগ নির্ণয় যন্ত্রের ৫২ শতাংশই গত এক বছরে ব্যবহৃত হয়নি। জরুরি ওষুধের মজুদ রয়েছে মেডিক্যাল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ১২ শতাংশ, জেলা হাসপাতালে ২৪ শতাংশ এবং উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২৩ শতাংশ। বিশেষায়িত বিভাগগুলোর অবস্থা অবর্ণনীয়। হৃদরোগের কথাই ধরা যাক। বিগত বছরগুলোয় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বরিশাল, ফরিদপুর, দিনাজপুর এবং অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ক্যাথল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। এসব ল্যাবের জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ঢাকঢোল কম পেটানো হয়নি। অথচ বরিশাল মেডিক্যাল কলেজের ক্যাথল্যাব অচল আজ কয়েক বছর। ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজে ২০১৯ সালে ক্যাথল্যাব স্থাপিত হয়েছে। আজো সেটি পুরোপুরি কাজ শুরু করতে পারেনি। দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজেও একই অবস্থা।

খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দু-একটি বাদে প্রায় সব ক্যাথল্যাবে একই অবস্থা। সপ্তাহ তিনেক আগে আমার এক সহকর্মী দিনাজপুরে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। হৃদরোগীর চিকিৎসায় প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত মূল্যবান। সেখানে একটি বেশ বড় মেডিক্যাল কলেজ থাকলেও তাকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল পাশের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনে। একই অবস্থা আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের। তাকে কিডনি ডায়ালাইসিসের পরামর্শ দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ডায়ালাইসিসের জন্য প্রয়োজন ডায়ালাইসিস ফিস্টুলা তৈরি। ফিস্টুলা তৈরির জন্য তাকে দু’দিন অপেক্ষা করতে হয়। কারণ, রংপুর থেকে ডাক্তার এসে ফিস্টুলা তৈরি করবেন। একটি প্রথম সারির মেডিক্যাল কলেজে এ অবস্থা। অথচ প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডায়ালাইসিসের সুবিধা তৈরি করবেন মর্মে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিছু দিন আগে সংবাদপত্রে খবর হয়েছিল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র অকেজো থাকায় বেশ কিছু দিন সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ডায়ালাইসিস ইউনিট বন্ধ। এমন অবস্থা প্রায় সবখানেই। ক্যাথল্যাব আছে, নেই ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট। ডায়ালাইসিস যন্ত্র আছে— নেই তা চালোনোর জনবল। জনবলের প্রথমেই আসে দক্ষ জনশক্তি, চিকিৎসক। সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্ট। কারণ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা এবং চিকিৎসক নিয়োগ দেয়াই শেষ নয়। দেশের হাসপাতালগুলোতে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের প্রায় ৪০ শতাংশ পদ শূন্য। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৭ শতাংশ। জেলা হাসপাতালে ১২ শতাংশ। মেডিক্যাল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ৩৬ শতাংশ। নার্সের পদেও একই অবস্থা। বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সের অভাব অত্যন্ত প্রকট। বয়স্ক রোগী, ক্যান্সার রোগী, কিডনি প্রতিস্থাপন, হার্টের অপারেশনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সের অভাব পূরণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য অপরিহার্য।

কয়েক দিন আগে ঠাকুরগাঁও জেলা হাসপাতালকে ৬০০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ঘোষণা দেয়া হচ্ছে নতুন নতুন মেডিক্যাল কলেজের। অথচ বর্তমানে যেসব সরকারি মেডিক্যাল কলেজ আছে তার অনেকগুলোরই নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষা-সরঞ্জাম এবং আবাসনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। এসব নামমাত্র হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার মান কী হবে তা অবশ্যই ভাবতে হবে। পর্যাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষা-সরঞ্জাম, ভৌত অবকাঠামো ছাড়া নতুন মেডিক্যাল কলেজগুলো নিছক রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ার হবে। স্বাস্থ্যসেবা যে তিমিরে আছে সেই তিমিরেই রয়ে যাবে। এসব মেডিক্যাল কলেজ থেকে বের হওয়া চিকিৎসকরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন নিঃসন্দেহে। পিপিআরসির গবেষণায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য শুধু বাজেট বরাদ্দ দিয়ে মূল্যায়ন করলে চলবে না; বরং প্রতিষ্ঠানগুলো তার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করতে পারছে কিনা এবং সেই ব্যয় নাগরিকদের জন্য ওষুধ, রোগ নির্ণয় সেবা, সচল যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাসেবায় রূপান্তরিত হচ্ছে কিনা— সেটিই মূল্যায়নের প্রধান শর্ত হওয়া উচিত।

অস্বীকারের উপায় নেই, স্বাস্থ্য খাতের সঙ্কটের কারণ শুধু অর্থের অভাব নয়, সবচেয়ে বেশি দায়ী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। উদাহরণ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার অতি কেন্দ্রীয়করণ। এর ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা জেলা হাসপাতালসহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পর্যায়ে কোনো যন্ত্রপাতির ক্রটি চিহ্নিত হলে তার তাৎক্ষণিক স্থানিক সমাধান সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতাসহ বাজেট বরাদ্দ ও নানামুখী সমস্যার কারণে এগুলো মেরামতের অনুমোদন পেতে অনেক সময় পেরিয়ে যায়। তখন আর মেরামতেও কাজ হয় না। যথাযথ জনবল ছাড়া সেবাধর্মী যন্ত্রপাতি ক্রয় দুর্বল ব্যবস্থাপনার আরেকটি দিক। মোটকথা, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত করছে। এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ তদারকি ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয় একান্ত জরুরি।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]