ইসলামে সন্তানের জন্য মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন বাধ্যতামূলক। যত্ন নেয়ার পাশাপাশি তাদের জন্য দোয়া করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারা দুঃখ পান বা ব্যথিত হন এমন কোনো কথা ও কাজে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। একজন মুসলিম মা-বাবার অধিকার, তাদের প্রতি আনুগত্য ও সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের সাথে সাথে প্রতিটি কথায় ও কাজে তাদের প্রতি ইহসান করার ব্যাপারে আদিষ্ট। এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার সরাসরি নির্দেশ- ‘তোমার সৃষ্টিকর্তা তোমাকে আদেশ দিয়েছেন তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করার এবং মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করার। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে উফ্ বলো না, ধমক দিও না, তাদের সাথে সম্মানসূচক আচরণ করো আর দোয়া করো, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে তারা আমাদের শৈশবে লালন-পালন করেছেন।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৩-২৪) অন্যত্র বলেছেন- ‘আমি মানুষকে তার মা-বাবার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে, তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। কাজেই আমার প্রতি ও তোমার মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’ (সূরা লোকমান-১৪)
নবী সা: বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ওপর হারাম করেছেন মা-বাবার অবাধ্য হওয়া।’ (বুখারি ও মুসলিম) তিনি আরো বলেছেন, ‘সময়মতো সালাত আদায় করা, মা-বাবার সাথে উত্তম ব্যবহার করা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় কাজ। মানুষ সাধারণত ভুলেই যায়, মা-বাবার কল্যাণে মহান সৃষ্টিকর্তা তাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এবং জন্মগ্রহণের পর মা-বাবা উভয়ই নিজেদের সব সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে লালন-পালন করেছেন। তার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছেন।’
হিন্দু ধর্মে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন পরম ধর্ম। মহাভারতে বলা হয়েছে, ‘পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম পিতাহি পরম তপঃ।’ বাইবেলে বলা হয়েছে, ‘সন্তানদের প্রধান দায়িত্ব হলো মা-বাবাকে নিঃশর্ত সম্মান করা, তাদের অনুগত থাকা, বৃদ্ধ বয়সে তাদের শারীরিক ও আর্থিক দেখাশোনা করা’। (ইফিসিয় ৬ : ১-৩)
বৌদ্ধ ধর্মে মা-বাবাকে সাক্ষাৎ ব্রহ্মা ও সন্তানের প্রথম গুরু হিসেবে গণ্য করা হয়। বলা হয়েছে, ‘যে সন্তান সজ্ঞানে মা-বাবার সেবা ও দায়িত্ব পালন করবে, সে ইহকালে ও পরকালে পরম সৌভাগ্য লাভ করবে।’ শৈশবে মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রণীত শিশুশিক্ষা বইয়ের পাঠ, ‘পিতা-মাতা গুরুজনে, সেবা করো কায়মনে’, পরবর্তী সময়ে, ‘আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে, আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে’ প্রভৃতি শিশুমনে মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান ও দায়িত্ববোধের বীজ বপন করত। এসবের অনুপস্থিতি আজ দৃষ্টিকটুভাবে দৃশ্যমান। বায়েজিদ বোস্তামি (রহ:)-এর মাতৃভক্তির গল্প একসময় শিশুদের প্রেরণা জুগিয়েছে মা-বাবার প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার। পাঠ্যক্রমে এসব নৈতিক শিক্ষার অনুপস্থিতি এবং সমাজে প্রতারক ও প্রবঞ্চকদের আধিপত্য স্বভাবতই শিশুমনে সৃষ্টি করে আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার বিকাশ। মা-বাবার ঐকান্তিক প্রত্যাশা তাদের শিশুরা ভালো ফলাফল করে উচ্চমার্গে অধিষ্ঠিত হোক। এ জন্য তারা শিশুদের বিরতিহীনভাবে বিভিন্ন বিষয়ে কোচিং করানোতে ব্যস্ত থাকেন। ছেলেমেয়েরা যাতে ভালো মানুষ হতে পারে, এমন শিক্ষার কথা ভাবার সময় তারা পান না। ফলে দেখা যায়, সন্তানরা সমাজে প্রভাব প্রতিপত্তির উচ্চ আসনে পৌঁছালেও বৃদ্ধ অসহায় মা-বাবার স্থান হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। দেশের প্রবীণ নিবাসগুলোতে খোঁজ করলেই এর সত্যতা মিলবে। সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় চিত্রটি ফুটে উঠেছে সম্প্রতি মিরপুরে নিজ ফ্ল্যাটে অসহায়ভাবে এক মায়ের অবহেলিত মৃত্যু ও তার লাশের পচন ধরার ঘটনায়। অথচ এই মায়ের এক ছেলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে, একজন মর্যাদা ও প্রতিপত্তিসম্পন্ন শিক্ষকতায় নিয়োজিত। কন্যা রত্নও নিয়োজিত শিক্ষকতার মহান পেশায়।
এ ধরনের মানুষ গড়ার কারিগর দিয়ে আর যা-ই হোক, নীতিবোধসম্পন্ন দেশপ্রেমে উজ্জীবিত মানবিক জাতি গঠন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নৈতিকতাবিবর্জিত শিক্ষা কিভাবে সামাজিক পচনের সৃষ্টি করে, উল্লিখিত ঘটনা এবং ক্রমবর্ধমান প্রবীণ নিবাস এর সাক্ষ্য। এ ছাড়া সম্পত্তির জন্য পরিবারের মধ্যে হত্যার মতো নির্মম ও অমানবিক ঘটনার বিস্তৃতি লক্ষণীয়। এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের সুকুমারবৃত্তিগুলো।
এ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন জীবনমুখী নৈতিক মানদণ্ডে পরিশীলিত শিক্ষানীতি। আশা করা হয়েছিল, নতুন শিক্ষানীতিতে তার বাস্তবায়ন ঘটবে; কিন্তু সম্প্রতি ঘোষিত শিক্ষানীতির মৌলিক নীতিমালায় এর কোনো উল্লেখ না থাকা সত্যিই দুঃখজনক। এর ফলে নতুন নতুন শিক্ষিত ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরি হতেই থাকবে, সামাজিক অধঃপতন এবং নৈতিক পতন রোধ করা অসম্ভব হবে।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ



