পৃথিবীর উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশগুলোতে রাজধানী শহরের জনসংখ্যা সীমিত রাখার প্রয়াসে এর আশপাশে বড় শিল্প-কারখানা স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয় না। রাজধানী শহর হয়ে পাশের বা দূরবর্তী শহরে যেতে হলে নগরীর ভেতর দিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পার্শ্বপথের (বাইপাস) ব্যবস্থা করা হয়। চার পাশে উপশহর গড়ে তোলা হয়, যাতে রাজধানীতে কর্মজীবী মানুষজন স্বল্প সময়ে কর্মস্থলে আসা-যাওয়া করতে পারেন। রাজধানীর কেন্দ্রস্থল থেকে কর্মজীবী ও শহরে বসবাসরত মানুষজন যেন দ্রুত বিমানবন্দর, রেল স্টেশন, বাস স্টেশন ও নৌ বন্দরে পৌঁছাতে পারেন; তা বিবেচনায় নিয়ে বিরতিহীন ট্রেন ও বাসের ব্যবস্থা করা হয়। সচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য ট্যাক্সি ক্যাবে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। এসব ট্যাক্সি ক্যাব টোলযুক্ত সড়কে চলাচলে এগুলোতে যানবাহনের চাপ অপেক্ষাকৃত কম থাকে। শহরের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেতে বিরতিহীন ও বিরতি দিয়ে উভয় ধরনের বাস ও ট্রেনের ব্যবস্থা থাকে। শহরে চলাচলকারী যানবাহনের গতি যাতে শ্লথ না হয় বিষয়টি মাথায় রেখে ইউ টার্নের পরিবর্তে ইউ লুপ, ওভার ও আন্ডার পাসের ব্যবস্থা করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শহরের কেন্দ্রস্থলের পরিবর্তে প্রান্তে গড়ে তোলা হয়। সড়ক পথে যানবাহনের চাপ কমাতে বিদ্যালয়পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে বিদ্যালয়ের বাসে আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা ও কারিগরি মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বউদ্যোগে গণপরিবহনে আসা-যাওয়া করেন। এসব পর্যায়ের আবাসিক শিক্ষার্থীরা সচরাচর ছুটির দিন ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে যান না। দেশের সাধারণ মানুষকে তাদের বিভিন্নধর্মী সমস্যা সমাধানে যেন কোনো দফতরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসতে না হয়; সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। এসব বিষয় মাথায় রেখে রাজধানী শহরের নগর পরিকল্পনায় সেখানে বসবাস ও চলাফেরা উভয়ই স্বস্তিদায়ক হয়।
উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশের রাজধানী শহরে বসবাসরত নাগরিকরা যেন স্বস্তিতে চলাফেরা করতে পারেন তা নিশ্চিত করতে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে শহরের বর্জ্য নির্ধারিত সময়ে অপসারণ করা হয়। বর্জ্য অপরসারণকালীন শহরের নাগরিকরা যেন কোনো ধরনের অস্বস্তিতে না পড়েন, তা চিন্তায় রেখে কাজটি শেষ রাতের দিকে সম্পন্ন করা হয়। তা ছাড়া এসব দেশে যানবাহনে বর্জ্য পরিবহনকালে তা থেকে উৎকট গন্ধ নির্গত হয় না এবং বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধযুক্ত পানি নির্গত হয়ে সড়কে না পড়ে; সে দিকে খেয়াল রাখা হয়। অনেক উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে জৈব বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে ও সার প্রস্তুতে ব্যবহৃত হয়। অজৈব বর্জ্য রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা হয়।
সমৃদ্ধ দেশের রাজধানী শহরের যে কোনো নির্মাণ স্থল হতে মাটি অপসারণের আবশ্যকতা দেখা দিলে তা কাভার্ড ভ্যানে অপসারণ করা হয়। অপসারণ স্থল হতে কাভার্ড ভ্যানটি শহরের সড়কে ওঠার আগে এটির চাকা পানি দিয়ে এমনভাবে পরিষ্কার করা হয়; যাতে চাকার সাথে লেগে থাকা কাদা বা মাটিতে সড়ক কর্দমাক্ত বা ধূলায়িত না হয়। এসব দেশে কার্ভার্ড ভ্যানে মাটি পরিবহনকালীন কখনো ভ্যান থেকে মাটির খণ্ড পড়ে সড়ক কর্দমাক্ত বা ধুলায়িত হয় না।
উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশের নর্দমা ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এমনভাবে করা হয়, যাতে বেশি বৃষ্টিতে নর্দমা বা পয়ঃনিষ্কাশনের পথ উপচে পানি সড়ক দিয়ে প্রবাহিত না হয়।
উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের রাজধানী শহর ঢাকায় যারা বাস করছেন, তাদের বসবাস ও যাতায়াত মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ। ঢাকার আয়তনের তুলনায় এখানে যত মানুষ বাস করেন; সে হিসেবে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহর। এখানে বসবাসরত মানুষজনের বেশির ভাগ নাগরিক সুবিধা হতে বঞ্চিত। শহরে চলাচলরত যানবাহনের গড় গতিবেগ ঘণ্টায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার। পৃথিবীর কোনো দেশের রাজধানী শহরে যানবাহনের এত নিম্ন গড় গতিবেগ নেই।
ঢাকায় যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক উভয় ধরনের যানবাহন চলাচল করে। কিছু সড়কে অযান্ত্রিক যান চলাচল নিষিদ্ধ হলেও যান্ত্রিক যানবাহনের সংখ্যা সড়কের আয়তনের তুলনায় বেশি হওয়ায় নগরীর চতুর্মুখী মোড় অতিক্রম করতে হলে প্রতিটিতে এসব যানবাহনকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষমাণ থাকতে হয়। যেকোনো কর্মদিবসে ঢাকা শহরের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে অথবা কেন্দ্রস্থল থেকে বিমানবন্দর, রেল স্টেশন, বাস স্টেশন বা নৌ বন্দরে যেতে দীর্ঘ সময় লাগে।
ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শহরের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এমনকি আবাসিক এলাকাতেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বিত্তবান পরিবারের শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করে। এ কারণে বিদ্যালয়গুলো খোলা থাকলে বিভিন্ন সড়কে যানবাহনের অতিরিক্ত উপস্থিতিতে চলাচলে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে সম্পন্ন করা হয়। এ জন্য যেকোনো ছোট কাজ সম্পন্ন করতেও একজন ব্যক্তির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উপরস্থ কর্মকর্তার দ্বারস্থ হতে হয়। বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন দফতর বিভাগীয় শহরে স্থানান্তর করা হলে দেশের নানা প্রান্ত থেকে জনমানুষ তাদের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে রাজধানীমুখী হওয়ার প্রবণতা আর দেখা দেবে না।
আমাদের সুপ্রিম কোর্ট ও তদনিম্নস্থ আদালত হাইকোর্ট ঢাকায় অবস্থিত। একদা বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে হাইকোর্টের ছয়টি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হলে সাধারণ জনমানুষ এর সুফল পেতে শুরু করেছিল। সরকারের এ পদক্ষেপটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জনমানুষের রাজধানী শহরে আসার প্রবণতা কমিয়েছিল; কিন্তু কিছু আইনজীবীর আপত্তির কারণে সরকারের জনমুখী কার্যক্রমটি এগোতে পারেনি, যা জনমানুষের ভোগান্তি বৃদ্ধির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।
আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভিভিআইপি মর্যাদাধারী বিবেচনায় সড়কপথে রাজধানী শহরের অভ্যন্তরে চলাচলের সময় অন্য সব যানবাহনের চলাচল রোধ করা হয়। এতে যানজটের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে। এর রেশ গভীর রাত পর্র্যন্ত অব্যাহত থাকে। রাজধানী শহরে বসবাসরত মানুষজনের চলাচল সহনীয় করতে হলে এ দুই পদধারীর চলাচল বিষয়ে বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবা একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
অতি সম্প্রতি রাজধানীর যানজট নিরসনে একাধিক সমন্বিত উড়াল সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। আশা করা হয়েছিল এগুলো চালুর পর ঢাকার যানজট সহনীয় মাত্রায় আসবে; কিন্তু পরিকল্পনায় ত্রুটি থাকায় এই উড়াল সেতুগুলো কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। যানবাহন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ব্যয়বহুল উড়াল সেতুর পরিবর্তে বিভিন্ন সড়কে ইউলুপ ও চতুর্মুখী মোড়গুলোতে ওভার ও আন্ডার পাস নির্মাণ করা হলে তা বেশি ফলপ্রসূ হতো।
ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খুব নাজুক। শহরের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ফেলার নির্ধারিত স্থান থাকলেও এগুলো উন্ম্ক্ত থাকায় এবং প্রতিদিন ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বর্জ্য জমা হওয়ায় তা নির্ধারিত স্থান ছাড়িয়ে সড়কে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলায় এর আশপাশের স্থান সবসময় দুর্গন্ধকবলিত থাকে। পরিবহনে পর্যাপ্ত কাভার্ড ভ্যান না থাকায় খোলা ট্রাকে দিনের বেলায় বর্জ্য পরিবহন করতে দেখা যায়। খোলা ট্রাকে পরিবহনের সময় অতিরিক্ত বর্জ্য বোঝাইয়ে ট্রাকটি চলার সময় সড়কের ওপর বর্জ্য ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি পড়ে জনমানুষের চলাচলে মারাত্মক অস্বস্তির সৃষ্টি করে। দেশে জৈব ও অজৈব বর্জ্য পৃথক করার যেমন ব্যবস্থা নেই, অনুরূপ জৈব বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনের পরিকল্পনা সম্প্রতি নেয়া হলেও এখনো কার্যকর হয়নি।
আমাদের বিভিন্ন নির্মাণস্থল থেকে খোলা ট্রাকে মাটি পরিবহনকালীন এগুলো সড়কের ওপর পড়ে পথ কর্দমাক্ত ও ধূলায়িত করে। এ ব্যাপারে নগর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় শহরের যেকোনো সড়ক সংস্কার-পরবর্তী তা পুনঃসংস্কারের পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যায়।
দেশে শহরের সড়কের পাশের নর্দমা ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় টানা দু’তিন ঘণ্টা বৃষ্টি হলে নর্দমা ও পয়ঃনিষ্কাশনের পথ উপচে চলাচলের সড়ক দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে নগরবাসী এ সমস্যায় অস্বস্তির সম্মুখীন হলেও এটি নিরসনে কার্যকর ও ফলপ্রসূ উদ্যোগের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচক (গ্লোবাল লাইভ অ্যাবিলিটি ইনডেক্স) অনুযায়ী, ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের বসবাস অযোগ্য ১৭৩টি শহরের তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে। যেসব উপসর্গ ঢাকার যানবাহনের গতিবেগ শ্লথ এবং বসবাস অসহনীয় তা নিরসন করা না হলে সে দিন আর খুব দূরে নয় যে, বিশ্বের বসবাস অযোগ্য শহর হিসেবে ঢাকার অবস্থান এক নম্বরে উন্নীত হবে, যা কোনোভাবে দেশের সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশিত নয়। তাই ঢাকাকে বসবাস উপযোগী করতে হলে এখানে বসবাসরত অধিবাসীর চলাফেরা যেন স্বস্তিদায়ক হয় তার পথ সরকার পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের খুঁজে বের করতে হবে।
লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক



