ধানের ব্যবহার সীমিতকরণ ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন

ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি যেমন জরুরি, তেমনি ধানের ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে সীমিত করে বিকল্প ও পুষ্টিকর খাদ্যের দিকে জনগণকে উৎসাহিত করাও সময়ের দাবি। খাদ্যাভ্যাসে এ পরিবর্তন শুধু একটি কৃষি নীতি নয়; এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

‘Rice is the staple food of the Bengali’- এক সময় বাক্যটি ছিল বাস্তবতার প্রতিফলন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধান ও ভাত বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতি, কৃষি অর্থনীতি এবং সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে এসে এই বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমির সঙ্কোচন, পানির সঙ্কট এবং খাদ্যনিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ আমাদের বাধ্য করছে ধাননির্ভর খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে।

সম্প্রতি রাজধানীর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাকশন ফর সাস্টেইনেবল অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে কৃষি গবেষকরা যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তারা দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেলেও ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা শুধু ধানের ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের বড় অংশ বর্তমানে বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বোরো চাষের জন্য ভূগর্ভস্থ বিপুল পানি প্রয়োজন হয়। জলবায়ু পরিবর্তনে অনেক এলাকায় পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, যা ধান উৎপাদনে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ খরা এবং আকস্মিক বন্যাও কৃষিকে ঝুঁকিতে ফেলছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়Ñ আবাদযোগ্য জমির দ্রুত হ্রাস। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন শত শত একর কৃষিজমি আবাসন, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামো নির্মাণে হারিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া, জৈব পদার্থের ঘাটতি এবং রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার কৃষির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

এমন বাস্তবতায় আমাদের কৃষি ও খাদ্যনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি। আমরা যেমন রফতানি বাণিজ্যে বহুমুখীকরণের কথা বলি, তেমনি খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যাভ্যাসেও বহুমুখীকরণ প্রয়োজন। শুধু ধান ও ভাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, শাকসবজি, ফলমূল এবং বিভিন্ন পুষ্টিকর শস্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে।

বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে খাদ্যবৈচিত্র্যকে খাদ্যনিরাপত্তার মূল কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছে। আফ্রিকার বহু দেশে মিলেট ও সরগাম, দক্ষিণ আমেরিকায় কুইনোয়া এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ভুট্টা ও ডালজাতীয় খাদ্যকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও একসময় কাউন, চীনা, জোয়ার, বাজরা ও বিভিন্ন স্থানীয় শস্যের প্রচলন ছিল। আধুনিক খাদ্যব্যবস্থায় এসব শস্য ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেগুলোকে নতুন করে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে।

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো পুষ্টি নিরাপত্তা। বাংলাদেশের অনেক মানুষ এখনো অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা এবং বিভিন্ন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতিতে ভোগছেন। শুধু ভাতনির্ভর খাদ্যতালিকা শরীরের সব ধরনের পুষ্টিচাহিদা পূরণ করতে পারে না। ডাল, মাছ, ডিম, দুধ, শাকসবজি এবং ফলমূলের ব্যবহার বাড়ালে একদিকে যেমন পুষ্টি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে ধানের ওপর চাপও কমবে।

তবে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন কোনো সহজ কাজ নয়। এটি শুধু কৃষি উৎপাদনের বিষয় নয়; বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথেও সম্পর্কিত। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জনসচেতনতা কর্মসূচি, স্কুলপর্যায়ে পুষ্টিশিক্ষা, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা এবং বিকল্প খাদ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। একই সঙ্গে গবেষণায় আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসল উন্নয়ন, পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং টেকসই কৃষিপদ্ধতির প্রসার এখন সময়ের দাবি। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখনো বাড়ছে। অন্যদিকে কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ সীমিত। তাই ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের শুধু উৎপাদন বাড়ানোর কথা ভাবলে চলবে না; বরং কী উৎপাদন করছি, কী খাচ্ছি এবং কিভাবে খাচ্ছি-এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

ধান বাংলাদেশের কৃষির মেরুদণ্ড ছিল, এখনো আছে। তবে বাস্তবতা হলো, আগামী দিনের বাংলাদেশকে শুধু ধাননির্ভর খাদ্যব্যবস্থার ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। খাদ্যবৈচিত্র্য, পুষ্টিনিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং সচেতন খাদ্যাভ্যাস-এ চারটি বিষয় ঘিরে ভবিষ্যতের কৃষিকৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

অতএব, ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি যেমন জরুরি, তেমনি ধানের ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে সীমিত করে বিকল্প ও পুষ্টিকর খাদ্যের দিকে জনগণকে উৎসাহিত করাও সময়ের দাবি। খাদ্যাভ্যাসে এ পরিবর্তন শুধু একটি কৃষি নীতি নয়; এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক