যেকোনো ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের পর একটি নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হলে সেই বিপ্লবের অর্জন, ব্যর্থতা, স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে সমাজে বহুমুখী রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের সূচনা হয়। একটি সফল বিপ্লব কেবল স্বৈরাচারের পতনের মধ্য দিয়েই তার চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে না; বিপ্লব-পরবর্তী সমাজে ক্ষমতার নতুন সমীকরণ, শহীদদের স্মৃতির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্র মেরামতের কাঠামোগত উদ্যোগগুলোর মধ্য দিয়ে তার আসল চরিত্র উন্মোচিত হয়।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পর আজকের বাংলাদেশে আমরা ঠিক এমনই এক জটিল দ্বন্দ্বের চিত্র দেখতে পাই। এক দিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিজেদের ত্যাগের মহিমা তুলে ধরার প্রতিযোগিতা চলছে। অন্য দিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হচ্ছে। বাকস্বাধীনতার সীমানা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। রাষ্ট্র সংস্কারের ধীরগতিতেও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। এই বহুমুখী টানাপড়েনের আড়ালে জুলাইয়ের প্রকৃত স্পিরিট বা চেতনা কতটুকু সংরক্ষিত হচ্ছে, সেটা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বিপ্লবের ইতিহাস ও স্মৃতির সংরক্ষণ নিয়ে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য আর্কিওলজি অব নলেজ’-এ দেখিয়েছেন, সমাজ ও রাজনীতির ময়দানে চূড়ান্ত ক্ষমতার চাবিকাঠি শেষ পর্যন্ত তার হাতে থাকে, যার হাতে নথিপত্র বা আর্কাইভ থাকে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের যে বিপুল আত্মত্যাগ, তা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিবিড় পর্যালোচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির মতো বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রে নিজেদের শহীদ ও আহতদের যথাযথভাবে দলিলায়ন বা ডকুমেন্টেশনের চরম ঘাটতি আছে।
জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদলের কর্মী ওয়াসিম আকরামের মতো তরুণরা শহীদ হলেও খোদ নিজ দলের ওয়েবসাইট বা নথিপত্রে তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি বা তাদের আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অনীহা ও উদাসীনতা লক্ষণীয়।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম বলেছেন, যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠন যখন তাদের শহীদদের বা ত্যাগী কর্মীদের সম্মানজনকভাবে প্রদর্শন করে, তখন তা দলের বর্তমান কর্মীদের মধ্যে পবিত্র সংহতি ও আনুগত্যের জন্ম দেয়। বিএনপি যেখানে তাদের নিজেদের শহীদদের যথাযথভাবে আর্কাইভে জায়গা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির সফল হচ্ছে। ছাত্রদলের শহীদ ওয়াসিমকে যখন শিবিরের ওয়েবসাইটে ‘প্রেরণার বাতিঘর’ হিসেবে জায়গা দেয়া হয়, তখন বোঝা যায় এই লড়াইয়ে কারা এগিয়ে থাকছে। বিখ্যাত চিন্তাবিদ জাক দেরিদা তার ‘আর্কাইভ ফিভার’ তত্ত্বে প্রমাণ করেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহশালা কেবল অতীত রাখার জায়গা নয়; বরং ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল কেন্দ্র।
রাজনৈতিক দলগুলোর এই আর্কাইভাল রাজনীতি প্রমাণ করে, মানুষের রক্ত বা আত্মত্যাগকে শুধু মুখের কথায় সম্মান জানালে চলে না, তাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নতিভুক্ত না করলে তা অচিরেই ক্ষমতার পালাবদলে হারিয়ে যায়। অথবা অন্য কারো রাজনৈতিক পুঁজি বা ঢাল হিসেবে ব্যবহার হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
সম্প্রতি বিএনপি-দলীয় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি টেলিভিশন টকশোতে মন্তব্য করেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে সুনির্দিষ্ট একটি ‘ডিজাইন’ বা নকশা ছিল এবং এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী অনেকেই একে অপরকে চিনত না, তারা কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে রাজপথে নেমেছিল। একজন জনপ্রতিনিধির মুখ থেকে এ ধরনের বক্তব্য কেবল বিস্ময়করই নয়; বরং এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণের অন্তর্নিহিত শক্তিকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করার শামিল। যখন কোনো ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানকে কেবল একটি পূর্বপরিকল্পিত ‘ডিজাইন’ বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মোড়কে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়, তখন মূলত সেই আন্দোলনে আত্মদানকারী হাজারো সাধারণ ছাত্র-জনতার নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম ও শোষণের বিরুদ্ধে তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে অস্বীকার করা হয়। যদিও তিনি এটি তার ব্যক্তিগত মতামত বলে দাবি করেছেন।
যেকোনো বিপ্লবেই কৌশলগত কিছু উপাদান থাকতে পারে; কিন্তু জুলাইয়ের রাজপথে যে লাখো মানুষ বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে, স্নাইপারের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছে, তা কোনো ছকে বাঁধা ডিজাইনের ফল ছিল না। তা ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার এক স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ। জনপ্রতিনিধিদের এ ধরনের মন্তব্য প্রমাণ করে, প্রচলিত ধারার রাজনীতিবিদদের সাথে সাধারণ ছাত্র-জনতার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব এখনো পুরোপুরি ঘোচেনি।
সমাজের বিভাজন এবং তোষামোদি মানসিকতার অবসান ঘটিয়ে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের তাগিদ এখন জোরালোভাবে সামনে চলে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটেই বর্তমান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্টভাবেই বলেছেন, জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিতর্কের অবসান হওয়া উচিত। এই বিতর্ক রাজপথে নয়; জাতীয় সংসদে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে। দীর্ঘ ১৬ বছরের অপশাসন, গুম, খুন ও লুণ্ঠনের যে গভীর ক্ষত জাতির বুকে তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যে তোষামোদির সংস্কৃতি শেকড় গেড়ে বসেছে, তা উৎপাটন করতে মানসিক বিপ্লবের প্রয়োজন।
জুলাই আন্দোলন যে নতুন রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের চরমভাবে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। এই দায়বদ্ধতা থেকেই জুলাই সনদের মতো ঐতিহাসিক দলিলগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি, যাতে ভবিষ্যতের কোনো শাসক আর কখনো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণের ওপর ফ্যাসিবাদী শাসন চাপিয়ে দিতে না পারে এবং সহিংসতা ও রক্তপাতের পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়।
এত সব বিতর্ক, অপূর্ণতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার পরও যখন প্রশ্ন ওঠেÑ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কি আসলেই ব্যর্থ হয়েছে? আসলে যেকোনো বিপ্লবের পর লাভক্ষতির হিসাব মেলাতে বসলে কিছু নৈরাশ্যবাদী মানুষ সবসময়ই এর ব্যর্থতার দিকটি বড় করে দেখতে চান। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এই জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক অর্জন হলো শেখ হাসিনার মতো এক ভয়ঙ্কর ও নির্মম দুঃশাসনের চূড়ান্ত অবসান। যে দেশে একসময় ‘মায়ের ডাক’-এর অনুষ্ঠানে গুম হওয়া সন্তানের পিতার আহাজারি আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলত, যে দেশে কেবল একটি কবরের সন্ধান পাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষ স্রষ্টার কাছে ফরিয়াদ করত, সেই দেশে আজ আর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম হচ্ছে না। জুলাই বিপ্লব যদি না আসত, তবে আয়নাঘরের মতো বিভীষিকাময় নির্যাতন কেন্দ্রগুলোর বীভৎস রূপ হয়তো উন্মোচিত হতো না। ব্যাংক লুটপাট, মেগা প্রকল্পের নামে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, দিনের ভোট রাতে করার প্রহসন এবং মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যে নির্মম ঠাট্টা-তামাশা চলত, জুলাইয়ের উত্তাল রাজপথ সেই অনাচারের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল।
অনেকে হয়তো যুক্তি দেখাবেন, এগুলো কেবল শাসনব্যবস্থার কিছু বাহ্যিক পরিবর্তন, রাষ্ট্রের কাঠামোগত বা শাসনতান্ত্রিক কোনো গভীর পরিবর্তন এখনো আসেনি। এটি অনেকাংশে সত্য যে, শাসনতান্ত্রিক পূর্ণাঙ্গ সংস্কার, নারী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকারের আইনি সুরক্ষা, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার মতো মব জাস্টিস সংস্কৃতির অবসান কিংবা নাগরিক হয়রানি পুরোপুরি দূর করতে আমরা এখনো কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছতে পারিনি। শেখ হাসিনা যে মালিকানার রাজনীতি আর বিভাজনের রাজনীতি একযুগ ধরে সমাজে প্রোথিত করেছিলেন, তার রেশ এখনো সমাজে থেকে গেছে। কিন্তু এই অপূর্ণতাগুলোর কারণে জুলাইয়ের বিশাল অর্জনগুলো কোনোভাবেই ম্লান হয়ে যায় না। জুলাই এসেছিল বলেই আজ দেশে নির্বিচার গণহত্যার বিচারের জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাজ করতে পারছে। গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেছে এবং জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার মিশনের অফিস খোলার মতো অকল্পনীয় ঘটনা বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
শতভাগ ত্রুটিমুক্ত বা নিখুঁত সমাজ রাতারাতি গড়ে ওঠে না। ভাষা আন্দোলন কিংবা মহান মুক্তিযুদ্ধের পরও আমাদের অনেক অপূর্ণতা ছিল, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই আজো চলমান। ঠিক একইভাবে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলমান প্রক্রিয়া। এর কিছু দাবি অর্জন হয়েছে, কিছু সংস্কার চলমান। বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন এখনো অধরা। কিন্তু জুলুম, শোষণ ও চরম বৈষম্যের যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ শেখ হাসিনা সরকার দাঁড় করিয়েছিল, তার অবসান ঘটানোই জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। এখন দল-মত নির্বিশেষে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই কেবল শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করা সম্ভব।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintuanowar.com



