বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

আজকের সরকারি ও বিরোধী দলও জনতাকে আশ্বাস দিয়েছিল পরিবর্তনের। অথচ ক্ষমতার মসনদে বসার পরই দেখা যাচ্ছে, যারাই ক্ষমতায় যাচ্ছেন তারাই রাষ্ট্রকে নিজ সম্পদ ভাবছেন। রাষ্ট্রের সংস্কারের কথা ভাবছেন না। জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে বসে আছেন। সংসদে একে অপরের চরিত্র হননের মহান (?) চেষ্টায় ব্যস্ত জনপ্রতিনিধিরা। এর আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে গত ১৭ বছরের অন্যায়, দুর্নীতি ও তার বিচারের কথা। সব দেখে আজ মনে হচ্ছে- বাংলাদেশে আজ কবির সেই বাণীই সত্য হয়ে উঠেছে, ‘প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, গত ৩ জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ১১৮ কন্যাশিশু ধর্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। (দৈনিক আমার দেশ, ৩ জুন-২০২৬) প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। কারণ সব অপরাধের খবর সংবাদপত্রে আসে না। একই সাথে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অনেক ভুক্তভোগী বিচারপ্রার্থী হন না। বিচার চাইতে গেলে একদিকে থাকে বিচার না পাওয়ার যন্ত্রণা, অন্যদিকে সামাজিক সম্মানহানির ঝুঁকি। যে জন্য রামিসার বাবার ক্ষোভের উচ্চারণ- ‘আমি বিচার চাই না; জানি, বিচার পাবো না।’

বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কোন পর্যায়ে গেলে মানুষের এ ধরনের আর্তচিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে! রাষ্ট্রযন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সুশীল সমাজ এ নিয়ে কতটুকু ভেবেছে, যে শুধু শাস্তি দিলেই এর সমাপ্তি ঘটবে? এর কার্যকারণ নিয়ে কাউকে খুব একটা কথা বলতে শোনা যায় না।

এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তিনি নিজে উদ্যোগী হওয়ায় রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার সম্ভব হয়েছে। বলা হয়েছে, আগামী তিন মাসের মধ্যে রায় বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু তার এ মহতী উদ্যোগ দেশবাসীকে কী বার্তা পৌঁছাল? বার্তাটি সহজ ও সরল। স্বাধীনতার এত বছর পরও বিচারব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাধীনতার মুখ দেখেনি। বিচারকাজ স্বাধীনভাবে এগিয়ে নেয়ার ক্ষমতা বিচার বিভাগ এখনো অর্জন করতে পারেনি বা বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি। এর নিকটতম উদাহরণ, বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ রদ করা। অথচ স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে আজ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী পক্ষ- সবাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার। কিন্তু ক্ষমতায় গেলেই পাশা উল্টে যায়। বিচারব্যবস্থা হয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রীনির্ভর। তিনি চাইলে দ্রুত বিচার সম্ভব, নতুবা কালক্ষেপণ। রামিসার বিচার দ্রুততার সাথে করা সম্ভব হলে গত পাঁচ মাসে ১১৮ ধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার শিকার ১৭ জনের বিচারের আয়োজন কোথায়? কী জন্য বিচার বিলম্বিত হচ্ছে তা দেখার দায়িত্ব কার? তারাও তো রামিসার মতোই কোনো বাবা-মায়ের সন্তান। তাদেরও তো বেঁচে থাকার আকুতি ছিল। ছিল নিরাপদে বেড়ে ওঠার স্বপ্ন। কেন দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হবে? কেন আজও ত্বকি হত্যার বিচার গতি হারিয়ে ফেলবে? কেন ত্বকির মা-বাবার আর্তনাদ রামিসার মা-বাবার আর্তনাদের মতো প্রকৃতিকে বেদনায় নীল করে দেবে?

আমাদের বিচারব্যবস্থার করুণ অবস্থার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সাগর-রুনি হত্যা মামলা। এটি কি কখনো আলোর মুখ দেখবে? সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান কি পাবে তার বাবা-মায়ের নির্মম হত্যার সুবিচার?

মূলত যখন দেশের উন্নয়নের সংজ্ঞা চার লেন, ছয় লেন, আট লেন সড়ক, উড়াল সড়ক অথবা সুউচ্চ টাওয়ার ভবন বা বিলাসবহুল পাঁচতারা হোটেল নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকে, দেশের প্রতিটি নাগরিক, বিশেষ করে অসহায় ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার নিশ্চয়তা থাকে না; সেখানে তথাকথিত ইট-পাথরের উন্নয়ন কতটুকু সামাজিক নৈতিক ও মানবিক উন্নয়নের বাস্তবতা প্রমাণ করে? একটি শিশু যদি নিরাপদে স্কুলে যেতে না পারে, নিতান্ত ঘনিষ্ঠজন, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুরক্ষা না পায়; তবে সেই সমাজের, সেই দেশের উন্নয়ন কতটা বাস্তবমুখী তা ভেবে দেখা দরকার। পরিবারের পরেই একজন শিশুর আশ্রয় এবং ভরসার জায়গা হচ্ছে তার স্কুল ও শিক্ষক। সেখানেও যদি সে নিরাপদ না থাকে তাহলে বলার অপেক্ষা রাখে না, সমাজের পচন ধরেছে। এ সমাজের খোলনলচে পাল্টে ফেলতে হবে। এ জন্য সম্মিলিত জনমানুষ সংগ্রাম করেছে। প্রাণ দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে।

আজকের সরকারি ও বিরোধী দলও জনতাকে আশ্বাস দিয়েছিল পরিবর্তনের। অথচ ক্ষমতার মসনদে বসার পরই দেখা যাচ্ছে, যারাই ক্ষমতায় যাচ্ছেন তারাই রাষ্ট্রকে নিজ সম্পদ ভাবছেন। রাষ্ট্রের সংস্কারের কথা ভাবছেন না। জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে বসে আছেন। সংসদে একে অপরের চরিত্র হননের মহান (?) চেষ্টায় ব্যস্ত জনপ্রতিনিধিরা। এর আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে গত ১৭ বছরের অন্যায়, দুর্নীতি ও তার বিচারের কথা। সব দেখে আজ মনে হচ্ছে- বাংলাদেশে আজ কবির সেই বাণীই সত্য হয়ে উঠেছে, ‘প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]