ডলার বনাম ব্রিকস : মেরুকরণ ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বাংলাদেশের টাকার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সীমিত এবং অধিকাংশ বৈদেশিক ঋণ ও আমদানি দায় এখনো ডলারনির্ভর। ফলে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া বিকল্প মুদ্রাব্যবস্থায় দ্রুত অগ্রসর হলে মুদ্রা বিনিময় ঝুঁকি ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় জটিলতা বাড়তে পারে

বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন ডলারকেন্দ্রিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আর্থিক লেনদেনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে চীন, রাশিয়া, ভারতসহ উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকস (BRICS) অর্থনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ডলারের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের বিপরীতে বিকল্প আর্থিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ এখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।

মার্কিন ডলারের উত্থানের ইতিহাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক পরিস্থিতির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনের মাধ্যমে একটি নতুন আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে ডলারকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা দেয়া হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি, প্রধান শিল্পশক্তি এবং সোনার বিপুল মজুদের অধিকারী। ফলে ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অন্যান্য দেশের মুদ্রা ডলারের সাথে সংযুক্ত করা হয়।

১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডলারের সাথে সোনার সরাসরি বিনিময়ব্যবস্থা বাতিল করলে ডলার একটি ফিয়াট কারেন্সিতে পরিণত হয়। অর্থাৎ, এর মূল্য আর সোনার ওপর নয়; যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক আস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অনেকের আশঙ্কা ছিল, এতে ডলারের গ্রহণযোগ্যতা কমবে; কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি ডলারের অবস্থান আরো সুসংহত করে।

এই অবস্থানের অন্যতম ভিত্তি ছিল পেট্রোডলার ব্যবস্থা। সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের কৌশলগত সমঝোতার ফলে আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারে পরিচালিত হতে থাকে। যেহেতু প্রায় সব দেশকেই তেল আমদানি করতে হয়, তাই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলার রাখা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এর ফলে ডলারের বৈশ্বিক চাহিদা স্থায়ী হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সহজে ঋণ গ্রহণ, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের বিশেষ সুবিধা অর্জন করে। ফলে ডলার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তির অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়। তবে সমালোচকদের মতে, আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় এই আর্থিক ক্ষমতাকে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে।

২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর আরোপিত আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এই বিতর্ক আরো তীব্র করে। রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং বৈদেশিক সম্পদের একটি অংশ স্থগিত করার ঘটনা অনেক দেশের কাছে সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় অনেক দেশ ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর উপায় খুঁজতে শুরু করে, যার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে ব্রিকস।

Doller

ব্রিকসের যাত্রা শুরু হয়েছিল উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের সাথে পরে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সাম্প্রতিক সময়ে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ায় এর পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, ভারত দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানিশক্তি এবং ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা নিজ নিজ অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ায় ব্রিকস উন্নয়নশীল বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ব্রিকসের অন্যতম লক্ষ্য আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে কোনো একক দেশের মুদ্রা বা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমে। এ লক্ষ্যেই স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং নতুন আর্থিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। এ ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া সবচেয়ে সক্রিয়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতায় রাশিয়া ডলার ও ইউরোনির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে, আর চীন বিভিন্ন দেশের সাথে ইউয়ানে লেনদেন সম্প্রসারণে কাজ করছে। ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক রেখে রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের সাথে বিকল্প বাণিজ্য ব্যবস্থার সুযোগ সম্প্রসারণ করছে।

তবে ব্রিকসের উত্থান মানেই ডলারের অবসান, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। একটি আন্তর্জাতিক মুদ্রার শক্তি কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন গভীর আর্থিক বাজার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা। এসব ক্ষেত্রে ডলার এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। যদিও ব্রিকস দেশগুলো অভিন্ন মুদ্রা বা বিকল্প আর্থিক কাঠামোর ধারণা নিয়ে আলোচনা করছে। এখনো ডলারের বিকল্প হিসেবে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈশ্বিক মুদ্রা চালু হয়নি। তবে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) ব্যবহারের উদ্যোগ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

তবে একটি বিকল্প বৈশ্বিক মুদ্রা প্রতিষ্ঠা জটিল বিষয়। ইউরোর ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছিল। ব্রিকসের ক্ষেত্রেও সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত স্বার্থে এখনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে। তবে ডি-ডলারাইজেশনের প্রক্রিয়াকে অপ্রাসঙ্গিক বলার সুযোগ নেই। অনেক দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঝুঁকি কমাতে একাধিক মুদ্রার ব্যবহার বাড়াতে চায়। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু দেশ তেল ও অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। চীন-সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠতা, রাশিয়া-চীনের জ্বালানি বাণিজ্য এবং বিভিন্ন দেশের দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা ব্যবহারের উদ্যোগ সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, পেট্রোডলার ব্যবস্থা দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক তেল বাজার, আর্থিক বাজার ও পণ্য বাণিজ্যের বড় অংশ এখনো ডলারনির্ভর। ফলে আকস্মিক পরিবর্তনের পরিবর্তে বিশ্ব ধীরে ধীরে বহুমুদ্রাভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থান। বাংলাদেশের অর্থনীতি একদিকে পশ্চিমা বাজার ও আর্থিক ব্যবস্থার সাথে গভীরভাবে যুক্ত, অন্য দিকে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির ওপরও অনেকটা নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরী পোশাক খাত, যার বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এসব বাজারে লেনদেন প্রধানত ডলার ও ইউরোভিত্তিক হওয়ায় ডলারকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য আমদানিতে চীন ও ভারতের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা গভীর। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল নিতে হবে। বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি গভীরভাবে আন্তঃসম্পর্কিত। কোনো এক পক্ষের সাথে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনই অন্য পক্ষকে উপেক্ষা করাও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। তবে ব্রিকস বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো বিশ্বের বড় বাজার ও বিনিয়োগের উৎস। বিশেষ করে চীন, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশের বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ছাড়া ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শর্তের ওপর নির্ভরশীল। অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি হলে বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়তে পারে। ভবিষ্যতে স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কিছুটা কমতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মুদ্রার স্থিতিশীলতা এবং বাণিজ্যের ভারসাম্য সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা দরকার।

অন্য দিকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকিও কম নয়। ব্রিকস ও পশ্চিমা অর্থনৈতিক বলয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হলে বাংলাদেশের মতো রফতানিনির্ভর অর্থনীতি কৌশলগত চাপের মুখে পড়তে পারে। এ ছাড়া বৈশ্বিক মুদ্রা অস্থিরতা বা ডলার ও বিকল্প মুদ্রাভিত্তিক ব্যবস্থার প্রতিযোগিতা বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ব্যয়, বিনিময় হার ও বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বাংলাদেশের টাকার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সীমিত এবং অধিকাংশ বৈদেশিক ঋণ ও আমদানি দায় এখনো ডলারনির্ভর। ফলে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া বিকল্প মুদ্রাব্যবস্থায় দ্রুত অগ্রসর হলে মুদ্রা বিনিময় ঝুঁকি ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় জটিলতা বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের প্রধান করণীয় হলো, নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো। তাই তৈরী পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, জাহাজ নির্মাণ ও উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যে রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সাথে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]