এ আগুন নেভার নয়

পথে পথে দেয়ালের গায়ের প্রাফিতিগুলো একসময় মুছে যাবে নিশ্চয়ই; কিন্তু অধিকার আদায়ের অমোচনীয় দলিল হিসেবে এগুলো অনাগত দিনে পথ দেখাবে, সাহস জোগাবে, অধিকার আদায়ের নতুন কোনো লড়াইয়ে। জুলাই বিপ্লবের মৌলিক চেতনা কোটা নয়- মেধা, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির পুরস্কার হিসেবে নয়- মেধার ভিত্তিতে গড়ে উঠবে প্রশাসন, বৈষম্যহীন-সুবিচারের অধিষ্ঠান হবে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে। আজ ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতির কূটকচালে ক্রমেই ম্রিয়মাণ জুলাইকে ভুলবে না বাংলাদেশ। জুলাইয়ের অন্তর্নিহিত শিক্ষা বুকে নিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ তার ঈপ্সিত বৈষম্যহীন দেশ গড়ার চেতনায়

জুলাই বিপ্লবে দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার। বৈষম্যহীন, আইনের শাসনের, মেধানির্ভর সুশাসনের। একজন হতদরিদ্র এবং বিত্তশালীর মর্যাদা আইনের দৃষ্টিতে একই থাকবে। দেশের মালিক হবে জনগণ। দেশে নতুন করে কোনো পারিবারিক রাজনীতির উত্তরাধিকার সৃষ্টি হবে না। দুর্নীতির অস্তিত্ব থাকবে না। মাস্তানদের কোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকবে না- থাকবে না চাঁদাবাজি ও লাগামহীন ক্ষমতার দাপট। জুলাই বিপ্লবে ৫৩৭ জন আজ দৃষ্টিহীন, পঙ্গু হাজারেরও বেশি, শহীদ হন এক হাজার ৪০০ জন।

সর্বদলীয় মতামতের ভিত্তিতে রচিত জুলাই ঘোষণা, গণভোটে বিজয়ী গণরায় সরকার অমান্য করছে। সংসদের প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রসংস্কারের শপথ নিতে অস্বীকৃতি এর প্রথম প্রকাশ। অথচ প্রধানমন্ত্রী নিজেই জনতার সামনে ঘোষণা করেছিলেন, জুলাই ঘোষণাপত্রের প্রতিটি শব্দের বাস্তবায়ন করা হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, জনবল নিয়োগে মেধার প্রাধান্য থাকবে। অথচ ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, অ্যাটর্নি এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ও নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলন, জুলাই শহীদ, জুলাই ঘোষণা এবং গণভোটের গণরায় শুধু উপেক্ষাই করা হয়নি; খুব ঠাণ্ডা মাথায় প্রতারণা করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েক দিন আগে চমৎকার একটি কথা বলেছেন, ‘পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করবে না, তারা হবে জনগণের বন্ধু।’ এর বিপরীতটাই আমরা এনসিপির গাড়িবহরে হামলার সময় প্রত্যক্ষ করলাম। স্বারষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার দিনেই পুলিশ এই হামলায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে দেখিয়ে দিয়েছে, তারা দলের অনুগত।

জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে আসছে একটার পর একটা ঘটনার বেদনাদায়ক ছবি। জুলাইযোদ্ধাদের জন্য সরকারি সহযোগিতার ঘোষণা ও প্রয়াস এখনো আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার ঘেরাটোপে বন্দী। আহত, পঙ্গু ও অসহায় জুলাইযোদ্ধাদের পুনর্বাসন স্বাভাবিকভাবেই প্রাধিকারের ভিত্তিতে হওয়ার কথা। খবরের কাগজের পাতা ওল্টালে চোখে পড়ে জুলাইযোদ্ধাদের আর্তি। ১৮ বছরের টগবগে তরুণ সারা শরীরে শ’খানেক গুলি বয়ে বেড়ানোর অসহনীয় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। এসব আহত ও পুঙ্গত্ববরণকারী মানুষের আর্তচিৎকার সচিবালয় নামক দেয়ালের আড়ালে বসে থাকা কর্তাদের কাছে পৌঁছায় না। ব্যবস্থা নেই অসহায় পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত সরকারি সহযোগিতার। যারা পঙ্গুত্ববরণ করেছেন তাদের পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ভুলে যাওয়ার কথা নয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে টেলিফোনে পুলিশ সদস্যের অসহায় আর্তি- ‘একজনকে মারতে কয়টা গুলি লাগে স্যার? আমার সোনার টুকরো ছেলেটিকে গুলিতে ঝাঁজরা করে ফেলেছে স্যার।’ এখনো কানে বাজে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ভিডিও দেখিয়ে পুলিশ কর্মকর্তার উক্তি, স্যার গুলি খেয়ে একটা মরে, অন্যরা তার জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে যায়, পালায় না। মুগ্ধর কণ্ঠস্বর এখনো কানে বাজে- ‘পানি লাগবে, পানি লাগবে ভাই’। সময়ের সাহসী চেতনার মূর্ত প্রতীক শহীদ আবু সাঈদের মুত্যুর মুখোমুখি বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর সেই দৃশ্য কি কেউ স্মৃতির অ্যালবাম থেকে মুছে ফেলতে পারবেন?

পথে পথে দেয়ালের গায়ের প্রাফিতিগুলো একসময় মুছে যাবে নিশ্চয়ই; কিন্তু অধিকার আদায়ের অমোচনীয় দলিল হিসেবে এগুলো অনাগত দিনে পথ দেখাবে, সাহস জোগাবে, অধিকার আদায়ের নতুন কোনো লড়াইয়ে। জুলাই বিপ্লবের মৌলিক চেতনা কোটা নয়- মেধা, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির পুরস্কার হিসেবে নয়- মেধার ভিত্তিতে গড়ে উঠবে প্রশাসন, বৈষম্যহীন-সুবিচারের অধিষ্ঠান হবে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে। আজ ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতির কূটকচালে ক্রমেই ম্রিয়মাণ জুলাইকে ভুলবে না বাংলাদেশ। জুলাইয়ের অন্তর্নিহিত শিক্ষা বুকে নিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ তার ঈপ্সিত বৈষম্যহীন দেশ গড়ার চেতনায়।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]